সেইসব মুহূর্তে মজনুর কথা ভেবে মন যখন নূরজাহানের ভরে গেছে আশ্চর্য এক ভাললাগায় তখনই হয়তো দবির বলছে, তয় বিয়া যে মাইয়ার দিতে চাও, মাইয়া তো সংসার কইরা খাইতে পারবো না। সংসারের কাম কাইজ হিগাও মাইয়ারে। রান বাড়ন হিগাও।
তারপর থেকে চঞ্চল মেয়েটিকে সংসারের কাজে ঢুকিয়েছে হামিদা। রান্নাবাড়া করায়, এটা ওটা করায়। আজ যেমন দিয়েছে নিজের শাড়ির পাড় সিলাই করতে। নূরজাহানও কেমন ধীরস্থির ভঙ্গিতে কাজগুলি করে। নিজের অজান্তেই যেন জীবনটা সে মেনে নিয়েছে।
এখন কি পরিকে দেখে পলকের জন্যে হলেও নিজেদের মেয়েটির কথা মনে পড়ল দবির-হামিদার? পরি যেভাবে একা একা চলে এসেছে এই বাড়িতে একদিন নূরজাহানও এইভাবেই চলে যেত তাদের বাড়িতে। একটি মাত্র ঘটনা সেই জীবন বদলে দিয়েছে। মেয়ের। নিজের রাগ জিদ মুহূর্তের ভুলে যে জীবনটা সে হারিয়ে ফেলল সেই স্বাধীন সুখের জীবন এই জীবনে আর কখনও ফিরে পাবে না।
হুঁকা নামিয়ে পরিকে দবির বলল, বাইত থিকা আইলা মা?
পরি কথা বলবার আগেই হামিদা বলল, তয় কইথিকা আইবো?
অন্যকোনও বাইত্তেও যাইতে পারে! ওহেন থিকাও আইতে পারে।
পরি ম্লান গলায় বলল, না বাইত থিকা আইছি।
হামিদা এগিয়ে এসে পরির মাথায় হাত দিল। তরে আমি ম্যালাদিন বাদে দেকলাম মা। তুই তো ডাঙ্গর অইয়া গেছচ।
দবির বলল, আমার কাছে অত ডাঙ্গর লাগে না। আমি তো দুই-চাইর দিন পর পরঐ দেহি। তুমি দেহো না দেইক্কা তোমার চোক্কে বেশি ডাঙ্গর লাগে।
মা-বাবার কথা শুনে, পরির কথা শুনে শাড়ির পাড় সিলাই করতে করতেই মুখ বাড়িয়ে বাইরের দিকে তাকাল নূরজাহান। পরিকে দেখে খুশি হল না বেজার, বোঝা গেল না। আবার নিজের কাজে মন দিল।
তখনই যেন পরির মুখের বিষণ্ণতাটা দেখতে পেল দবির। বলল, কী গো মা, কী অইছে, মোকহান এমুন হুগনা ক্যা?
হামিদাও বলল কথাটা। হ। মুকহান বহুত হুগনা। কী অইছে রে পরি?
পরি উদাস গলায় বলল, আমার একহান বইন অইছিল সাতদিন আগে। আইজ বিয়াইন্না রাইতে মইরা গেছে।
দবির-হামিদা দুইজনে প্রায় একসঙ্গে বলল, ইন্নালিল্লা….।
পরি বলল, আলার মা দাদিও তো মরছে কাইল সন্ধ্যায়।
একসঙ্গে দুইটা মৃত্যুর কথা শুনে দবির-হামিদা দু’জনেই হকচকাইয়া গেল। হুঁকাটা পিড়ার লগে ঢেলান দিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল দবির। কী কলি, ধরণী খালায় মইরা গেছে? হায় হায় আমার নূরজাহান জন্মাইছিল তার হাতে।
দুইজন মানুষের মৃত্যুর কথা শুনে হাতের কাজ ফেলে নূরজাহান বেরিয়ে এল ঘর থেকে। পলকের জন্য সেই আগের নূরজাহান হয়ে গেল সে। ইচ্ছা হল কাউকে কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়েই চক পাথালে দৌড় দেয়। সোজা চলে যায় পুরানবাড়ি। ধরণীদাদির মুখোন শেষবারের মতো একবার দেখে আসে। তারপর যায় আজিজ গাওয়ালের বাড়ি। সাতদিন বয়সে মরে যাওয়া মেয়েটি কেমন হয়েছিল দেখতে, দেখে আসে।
ঘর থেকে বেরিয়েই বাবা-মায়ের মুখ দেখে সে টের পেল দুইপায়ে তার শিকল বাঁধা। বাড়ির সীমানার চারপাশ জুড়ে যেন তৈরি হয়ে আছে লোহার খাঁচার চারপাশ জুড়ে যেমন থাকে জানলার শিকের মতো সরু সরু শিক তেমন অজস্র শিক। এই বাড়িটিই যেন হয়ে গেছে এক অদৃশ্য লোহার খাঁচা। এই খাঁচা ভেঙে বের হবার সাধ্য নূরজাহানের নাই।
পলকেই আগের নূরজাহান ফিরে এল বর্তমানে। পরির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, আয় পরি, ঘরে আয়। তর কাছ থিকা হুনুম নে বেবাক কথা।
নূরজাহানের লগে ঘরে ঢুকল পরি। চৌকিতে বসল।
উঠানে তখন দবিরগাছি হামিদাকে বলছে, ধরণী খালারে শেষ দেহাড়া দেইখা আইতে অয় না?
হামিদা বলল, হ।
তয় গেলে তো মাডি না দিয়া আইতে পারুম না।
আইবা। অসুবিদা কী?
দিনডা কাবার অইয়া যাইবো?
যাউক।
এইমিহি যে ইট্টু কাম আছিলো!
কী কাম? শীতের দিন গেছে গা, রসের কারবার তো অহন নাই।
রসের কাম না থাউক অন্যকাম আছে না? খেতখোলার কাম!
হামিদা তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, যেডু খেত তার আবার কাম? এক দেড়কানি খেত আবার খেত অইলো নি?
আমার লেইগা ওডুঐ অনেক। ইরি বুনছি। ধানও ভাল অইছে। অহন ইট্টু ফাসফোঁস (সারটার) দিলে বচ্ছরের খাওন অইয়াও বেশি। মনে করছিলাম আইজ থিকা খেতে নামুম।
গলার স্বর বদলে আন্তরিক হল হামিদা। কাইল থিকা নাইম্মো। আইজ যাও ধরণী খালারে গোর দিয়া আহো। আহনের সময় পরিগো বাইত অইয়াও। মাইয়াডা মরছে, অগো ইট্টু বুজ দিয়াইও।
আইচ্ছা।
আগের দিন থাকলে আমিও যাইতাম তোমার লগে। নূরজাহানরে রাইক্কা যাইতাম বাইত্তে।
না হেইডা পারতা না।
ক্যা?
আমগো দুইজনের আগে নূরজাহানঐ যাইতো গা। অরে তুমি বিচড়াইয়াঐ পাইতা না।
হ ঠিকঐ কইছো। বাইত্তে থাকন লাগতো আমার। তুমি যাইতা একমিহি দা তোমার মাইয়ায় যাইতো আরেক মিহি দা।
দবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দিনগুনি বইলা গেল! কী দিন কী অইয়া গেল? ক্যান যে এমুন কামডা করলো মাইয়ায়?
একটু থেমে বলল, আইচ্ছা আরেক কাম করলে অয় না? পরি আর নূরজাহান থাউক বাইত্তে আমরা দুইজনে যাই।
না।
ক্যা?
পয়লা কথা, তোমার মাইয়ার মতিগতি বুজা যায় না। কুনসুম কী করবো কেঐ বুজতে পারবো না। তারবাদে তোমার আশকারায় মাইয়াডা গাছে উইট্টা গেছিলো। গাছ থিকা একবার পড়ছে, ভাল একহান আছাড় খাইছে। আমি চাই না আবার গাছে উড়ুক, আবার পড়ুক, আবার আছাড় খাউক। বছরহানির মইদ্যে বিয়া দিয়া জামাইবাড়ি না পান তরি এই মাইয়ারে আমি পলকের লেইগাও চোক্কের আঐল করুম না। আমার যাওনের কাম নাই। আমি বাইত্তেঐ থাকুম। তুমি যাও।
