কুট্টি তখন খাটালে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। এখন গিয়ে বড়বুজানকে সব বলতে হবে। তার আগেই আলফু বলল, তোমার লগে কথার কাম আছে।
কুট্টি ঘুরে দাঁড়াল। কন।
অহন না, পরে কমুনে। তুমি আগে বড়বুজানের লগে কথা কইয়াহো।
পলকের জন্য আলফুর মুখের দিকে তাকাল কুট্টি তারপর খাটালের দিকে পা বাড়াল। আইচ্ছা।
বুকের ভেতর কুট্টির আশ্চর্য এক উত্তেজনা খেলা করছে তখন। আলফু কি এমন কোনও কথা বলবে যে কথা শুনে গভীর আনন্দে ভরে যাবে তার বুক! যে কথা শুনে মন আর শরীরে বয়ে যাবে অচেনা শিহরন। যে কথা শুনে জেগে আর ঘুমিয়ে অপূর্ব সব স্বপ্ন দেখবে কুট্টি!
.
পরিকে দেখে দবির-হামিদা দুইজনেই অবাক।
শেষ কবে এই বাড়িতে এসেছিল মেয়েটি দুইজনের কারওই সে কথা মনে পড়ল না। যখনই এসে থাক, নিশ্চয় ছনুবুড়ি মরার আগে। তখন আজকের তুলনায় অনেকখানি ছোট সে।
আজ বড়সড় লাগছে পরিকে।
লম্বা ঝুলের ছিটকাপড়ের জামা পরা। হাঁটু বরাবর নেমেছে জামা। অনেকখানি পথ হেঁটে আসার ফলে মুখে গলায় ঘাম চিকচিক করছে। চোতমাস এল কি এল না, নাকি দুই-চারদিন এখনও বাকি আছে, হলে হবে কী, বেজায় গরম সকালবেলা থেকেই পড়তে শুরু করেছে দেশগ্রামে। রোদ ওঠে বাঘের মতো। খোলামেলা জায়গায় বেরুলেই খাবলা মেরে ধরে।
পরিকেও ধরেছিল। ফলে মুখ রোদে পুড়ে ম্লান হয়েছে। এমনিতেই চোখেমুখে ছিল বিষণ্ণতা, গভীর মনখারাপের ছায়া, তার উপর রোদ ঘাম, আচমকা বড় হয়ে ওঠা পরিকে কাহিল দেখাচ্ছিল। দবির-হামিদা দুইজনেই তা খেয়াল করল।
দবির বসেছিল ঘরের ছেমায়। হাতে হুঁকা। গুড়গুড় করে তামাক টানছিল। হামিদা ছিল রান্নাচালার ওদিকে। উঠানের কোণ থেকে খড়নাড়া নিয়ে রাখছিল চুলারপারে। খানিকবাদেই রান্না চড়াবে। নূরজাহান বসে আছে ঘরের ভেতর, চৌকির উপর। বসে নিজের শাড়ির ছিঁড়ে যাওয়া পাড় সুইসুতায় মেরামত করছে। কোনও দিকেই খেয়াল নাই তার। মান্নান মাওলানার মুখে ছাপ ছিটিয়ে দেওয়ার পর, মজনুদের ঘর থেকে, মরনির ডানার আড়াল থেকে সেই যে সেইরাতে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল দবির-হামিদা তারপর একমুহূর্তের জন্যেও মেয়েকে আর চোখের আড়াল করেনি কখনও। এক মুহূর্তের জন্য বাড়ির সীমানার বাইরে যেতে দেয়নি। পাখির মতো স্বাধীন মেয়েটি আচমকাই বন্দি হয়ে গেছে খাঁচায়।
প্রথম ক’দিন বাড়িতে বসে থাকতে খুবই কষ্ট হয়েছে নূরজাহানের। যখন তখন ইচ্ছা করেছে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। হাজামবাড়ি মিয়াবাড়ি মেন্দাবাড়ি হালদারবাড়ি আর নয়তো খোলামাঠ সড়কপার, কোথাও না কোথাও ছুটে যেতে ইচ্ছা করেছে। মা-বাবা যেতে দেয়নি। অসহায় নূরজাহান তখন বন্দিপাখির মতো ছটফট করেছে, কান্নাকাটি করেছে। আদরে শাসনে, রাগে সোহাগে মা-বাবা দুইজনেই তাকে বুঝিয়েছে, যে কাণ্ড সে করেছে, আল্লাহপাকের রহমত ছিল বলে সেই কাণ্ডের পরও তার কিছু হয়নি, সে এখনও ভাল আছে, বেঁচে আছে। মান্নান মাওলানা যদি তাকে মাফ না করতেন তা হলে কেউ বাঁচাতে পারত না নূরজাহানকে। কাক চিলে শকুনে শেয়ালে যেমন করে ছিঁড়ে খায় সড়কখোলায় ফেলে রাখা গোরু বরকির মৃতদেহ, জীবন্ত নূরজাহানকেও তেমন করে ছিঁড়ে খেত মান্নান মাওলানার লোকজন। দূরের লোকজনের দরকারই হত না, মাওলানা সাহেবের ছেলে আতাহার আর তার ইয়ারদোস্তরাই যথেষ্ট ছিল।
এসব কথাই মেয়েকে বুঝিয়েছে দবির। তুই পোলাপান মানুষ দেইক্কা, নাদান মাইয়া দেইক্কা, কিছু না বুইজ্জা আকামডা কইরা হালাইছিলি, এর লেইগা হুজুরে তরে মাপ করছে। আতাহাররে কইছে তর য্যান কোনও ক্ষতি না করে। তয় মনের মইদ্যে কইলাম রাগহান তাগো রইয়া গেছে। তুই যুদি আবার আগের লাহান চকে মাডে যাচ, সড়ক নাইলে এইবাড়ি ওইবাড়ি, আর হেই ফাঁকে যুদি আতাহরগো চোক্কে পইড়া যাচ, মাইনষের রাগের কথা কওন যায় না, একবার তুই বাচ্ছচ, আর কইলাম বাঁচবি না।
হামিদা ভয় দেখিয়েছে অন্যভাবে। তুই ডাঙ্গর মাইয়া, আতাহাররা যুদি তরে ধইরা লইয়া একরাইত কোনওহানে আটকাইয়া রাখে আর দল বাইন্দা আকাম কুকাম করে, তয় তুই বাঁচবি না। তয় তুই মইরা যাবি। আর যুদি বাইচ্চা থাকচও তর পেটপোট অইয়া যাইবো। বচ্ছর ঘোরনের আগে পোলাপান অইবো। আবিয়াত মাইয়াগো পোলাপান অইলে কী অয় জানচ! মাইনষে গু উড়াইয়া দিবো মোকে। শরমে মোক দেহান যাইবো না কেঐরে। তরে। লইয়া দেশগেরাম ছাইড়া যাওন লাগবো। তুইঐ অহন ঠিক কর, কোনডা করবি। আমার কথা হুনবি না নিজের লাহান চলবি?
নূরজাহান কথা বলেনি।
কাজ করে ফেলার পর ভয়ে আতঙ্কে মরে যেতে বসেছিল সে। মরনি তাকে বাঁচিয়েছে। মায়ের কথা শুনে সেই ভয় আতঙ্ক যেন নতুন করে ফিরে এসেছিল নূরজাহানের বুকে। মুখে বলেনি কিছুই কিন্তু ভিতরে ভিতরে মেনে নিয়েছে মা-বাবার কথা, বন্দিজীবন।
সেদিনের পর থেকে নূরজাহানের বিয়াশাদির প্যাচালও কখনও কখনও পাড়ে দবির হামিদা। সেইসব কথা টুকটাক কানে আসে নূরজাহানের। লজ্জায় লাল হয়।
কার লগে বিয়া হবে নূরজাহানের? কে হবে নূরজাহানের জামাই? কোন গ্রামে বাড়ি? দেখতে কেমন?
এসব ভাবতে ভাবতে কেন যে একজন মানুষের মুখ ভেসে ওঠে নূরজাহানের চোখে। ঢাকায় থাকে মানুষটি। খলিফাগিরি করে। মান্নান মাওলানার চোখ থেকে, আতাহারদের থাবা থেকে সেদিন যে মানুষটি বাঁচিয়েছিল নূরজাহানকে, বোনের ছেলে হয়েও মানুষটি আসলে তারই ছেলে। মজনু। মজনু খলিফা।
