জ্বর আসার রাত থেকে, সেই যে কুট্টি এসে কপালে হাত দিয়েছিল, তারপর গামছা ভিজিয়ে বড়বুজান যাতে টের না পান এমন নিঃশব্দে রাতভর পানিপট্টি দিয়েছিল আলফুর কপালে, পাঁচটা দিন ধরে জ্বর উঠলেই পানিপট্টি, মাথায় বদনার পর বদনা পানি, শিশুর মতো মুখ মুছিয়ে, জোর করে খাওয়াইয়াদাওয়াইয়া এমন একটা অবস্থা কুট্টি তৈরি করেছে, যেন আলফু আর আলফু না, আলফু যেন ছোট্ট শিশু, কুট্টি যা বলছে তাই করছে, যেভাবে চালাচ্ছে সেইভাবেই চলছে।
এজন্যই কুট্টির দিকে তাকিয়ে কথাটা এখন আলফু বলল। যদি কুট্টি বলে তা হলে কাজটা করবে, কুট্টি না বললে করবে না।
কুট্টি না করল।
আলফুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কাম নাই। এই শইল লইয়া দুইবার নাইলে আবার জ্বর আইবো। কাইল রাইত্রে জ্বর ছাড়ছে। রইদের মইদ্যে এতাহানি হাইট্টা গেলে শইল বহুত খারাপ লাগবো।
আলফু কথা বলল না। বলল বাদলা। হ। আপনের যাওনের কাম নাই কাকা। আপনে বাইত্তে থাকেন। আমরা বেবাকতে গেলে জানাজার মাইনষের টান পড়বো না।
বাদলার কথার ভঙ্গিতে হেসে ফেলল কুট্টি। তুই দেহি বড় অইয়া গেছচ রে বাদলা? কথাবার্তা হুইন্না তরে তর বাপ মতলার থিকাও বড় লাগতাছে।
শুনে বাদলাও হাসল। আমি তো বড় অইয়া গেছি। দশ-পোনরো দিনের মইদ্যে আমারে মোসলমানি করাইয়া দিবো।
চইত মাসে কেঐর মোসলমানি করায়নি? মোসলমানি করান লাগে শীতের দিন শেষ অইয়া আহনের লগে লগে। ফাল্গুন মাসে। ওই দিনে করাইলে ঘাওডা তাড়াতাড়ি হুগায়। গরমের দিনে করাইলে ঘাও হুগাইতে দেরি অয়।
অউক গা। মায় কইছিল আর বচ্ছর শীতের দিনে করাইবো। আমি কইছি, না, গরমের দিন অউক আর যাই অউক, এই বচ্ছরঐ করায় দেও। আমি ডাঙ্গর অইয়া গেছি।
এসময় আবার ডাকল বড়বুজান। কী লো কুট্টি, আইলি না? কইলি না আমারে কেডা মরছে?
কুট্টি আগের ভঙ্গিতে আবার মুখ ফিরাল পিছনদিকে। অহনও বেক কথা হুনি নাই। হুইন্নাইতাছি।
তারপর বাদলার দিকে তাকাল। অহন পরির বইনডার কথা ক তো! মাইয়াডা মরলো কেমতে?
অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে পা ধরে এসেছে বাদলার। কাঠের সিঁড়িতে বসল সে। বসে মুখটা ঘুরিয়ে রাখল কুট্টির দিকে। আউজকা সাতদিন অইতো খুকির। আউজকা বিয়াইন্না রাইতে মরলো।
অইছিলো কী?
নাইডা পইচ্চা গেছিলো।
কচ কী?
হ। কাইল হারাদিন কানছে। রাইত্রে খালি খিচ উটছে। বিয়াইন্না রাইত্রে মইরা গেছে।
তুই গেছিলি ঐ বাইত্তে?
গেছিলাম।
দাফোন দোফোন করছে?
বাদলা ঠোঁট উলটে বলল, ধুরো। আজিজ গাওয়ালরে আপনে চিনেন না? সাতদিনের মরা মাইয়ার লেইগা হেয় খরচা করবো নি? দুনিয়ার কিরপিন মানুষ।
কথাটা শুনে কুট্টি আলফু দু’জনেই চমকাল। কুট্টি কথা বলবার আগেই আলফু বলল, তয় করবো কী? মাডি দিবো না? মাড়ি দিতে অইলে কাফোন লাগবো, জানাজা লাগবো।
বাদলা হাসল। এই খরচার কথাঐত্তো আমি কইলাম।
কুট্টি অধৈর্যের গলায় বলল, তয় মাইয়ার লাচটা করবো কী?
নিজের ডানহাত লম্বা করে, বাঁহাতে কনুই ধরে শিশুটির দেহের মাপ বুঝতে চাইল। বাদলা। আমার হাতের একহাত লাম্বা অইবো মাইয়াডা। আমি আহনের সমায় দেকলাম গাওয়ালের বউ উ উ কইরা ইট্টু কানলো আর গাওয়ালে কেঁতা কাপড়ের মইদ্যে প্যাচাইয়া মাইয়ার লাচ কুলে লইয়া বিড়ি টানতে টানতে চকের মিহি নাইম্মা গেলো।
কচ কী?
হ। লিশ্চই (নিশ্চয়) বিলের বাড়ির ঐমিহি গিয়া, গোরস্থান বরাবইর জঙ্গল মঙ্গলে কেঁতা কাপড় সুদ্দা হালাইয়া দিবো।
কুট্টি হায়আপশোসের গলায় বলল, আহা রে হিয়াল খাডাসে খাইবো লাচটা।
আলফু বলল, যেই বাপে পোলাপানের লাচও দাফোন করতে চাইবো না হেই রকম বাপের পোলাপান জন্ম দেওনের কাম কী?
কুট্টি কথা বলল না, আলফুর দিকে তাকিয়ে রইল।
একপলক কুট্টিকে দেখে অন্যদিকে তাকিয়ে বসে রইল আলফু।
আজ সকাল থেকেই কুট্টি খেয়াল করছে জ্বর থেকে ওঠার পর আগের সেই গম্ভীর মানুষটা যেন আর নাই। প্রয়োজন ছাড়া একটিও কথা না বলা মানুষটা যেন আর নাই। আজ যেভাবে টুকটাক কথা বলছে, আজকের আগে কখনও মানুষটার এরকম কথাবার্তা শোনেনি কুট্টি।
তা হলে কি কুট্টি যেমন বদলেছে আলফুও তেমন করে বদলাচ্ছে?
বাদলা বলল, কুট্টিখালা, আপনেরা কি নাস্তাপানি খাইয়া হালাইছেন নি?
কুট্টি চমকাল। হ। ক্যা রে?
আমি অহনতরি কিছু খাই নাই।
কুট্টি ব্যস্ত হল। আগে কবি না।
তারপর বারান্দার পশ্চিম দিককার কোণে গিয়ে জের থেকে পরিমাণ মতো মুড়ি নিঃশব্দে আঁচলে নিয়ে বাদলার সামনে এল। গলা নিচু করে বলল, লুঙ্গি পাত।
বাদলা লুঙ্গি পাতল, আঁচলের মুড়িটা ঢেলে দিয়ে কুট্টি বলল, মিডাই দিতে পারলাম না।
একমুঠ মুড়ি মুখে দিয়ে বাদলা বলল, ক্যা, মিডাই নাই?
আছে। তয় আছে বড়বুজানের পালঙের তলে। ওহেন থিকা অহন বাইর করন যাইবো না। তুই তো জানচঐ বুজানরা বহুত কিরপিন। তরে মুড়ি দিছি, আবার মিডাও দিছি, উদিস পাইলে খাইয়া হালাইবো আমারে।
বুজছি। তয় খালি উরুম খাইতেও সাদ লাগে।
কুট্টি সরল, হাসিমাখা স্নেহের গলায় বলল, যা অহন খাইতে খাইতে বাইত যা।
বাদলা উঠল। হ যাইতাছি। বাইত্তে গিয়া ম্যালা কাম। নাইয়া ধুইয়া পানজামি ফিন্দা পুরানবাড়ি যামু।
পানজামি আছেনি?
আছে একহান। আর বচ্ছর রোজার ইদে দেলরা বুজি কিন্না দিছিলো।
লুঙ্গির কেঁচড় উঁচু করে ধরে, কেঁচড় থেকে মুড়ি নিয়ে মুখে দিতে দিতে আমরুজতলার ওদিক দিয়ে মিয়াবাড়ি থেকে নেমে গেল বাদলা।
