তবু কোনওরকমে যেন তালগাছটার তলায় এসে দাঁড়াল সে। আতুর লুলা শিশুর মতো লেছড়ে পেছড়ে বসে পড়ল গাছতলায়। কোমরের তলা থেকে অসাড় ভাবটি তখন ঠেলে উঠছে উপর দিকে। পেট, পেটের পরে বুক গলা মুখ আস্তে ধীরে অসাড় হয়ে আসে। শরীরের ভিতর লুকিয়ে থাকা হাজার লক্ষবাতির সবগুলো যেন এক এক করে নিভে আসছে, নিভে আসছে। তালগাছে হেলান দিয়ে তবু মাথার ওপরকার ডালে ডগায়, নারীগর্ভের মতো বাসার মুখে ভিতরে বসা বাবুই পাখিদের কিচিরমিচির শব্দটা সে শুনতে পায়। চোখের অনেক ভিতর থেকে ধীরে কমে আসা আলোয় দেখতে পায় পুকুরের দক্ষিণ দিককার উঁচু পার ধরে হেঁটে আসছে ছোটখাটো পবিত্র চেহারার একজন মানুষ। মাথায় টুপি, মুখে সুন্দর চাপদাড়ি আর আশ্চর্য স্নিগ্ধতা। ধীরে, অতিধীরে পুকুরপার ঘুরে তালগাছটির দিকে এগিয়ে আসে সেই মানুষ।
বাবুই পাখিরা তখনও ডাকছিল।
.
ও কুট্টি, কার লগে কথা কচ? কেডা মরছে, আ?
উত্তর দিককার বারান্দার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে কুট্টি। তার মুখোমুখি উঠানে দাঁড়ানো বাদলা। বাদলার পরনে লাল সবুজের ডোরাকাটা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি। দুইটা পুরানা, ধুলা ময়লায় মলিন কিন্তু ছেঁড়া না।
আজই প্রথম বাদলাকে লুঙ্গি গেঞ্জি পরা দেখল কুট্টি। রাবির ওইটুকু ছেলে লুঙ্গি পরার ফলে আচানক বড় হয়ে গেছে। দুইটা মৃত্যুসংবাদ কুট্টিকে দিল একেবারে বড়দের কায়দায়।
আলফু বসে আছে রান্নাঘরের ছেমায়। গায়ে খাকি রঙের পুরানা চাদর। পাঁচদিন জ্বরে ভুগে উঠেছে। এমনিতে পাঁচ-সাতদিনে একবার মুখ কামানোর স্বভাব। জ্বর আসার তিন-চারদিন আগে কামিয়েছিল। ফলে মুখে এখন আট-নয়দিনের দাড়ি মোচ। তীব্র জ্বরে মুখ এমনিতেই শুকিয়েছে, তার উপর এমন দাড়ি মোচ, মুখোন আলফুর খুবই ম্লান দেখাচ্ছিল।
বাদলার কথা শুনতে শুনতে আড়চোখে প্রায়ই আলফুকে দেখছিল কুট্টি আর মনটা ভরে যাচ্ছিল আশ্চর্য মায়ায়। দিনে দিনে কেন যে এত মায়া বাড়ছে মানুষটার জন্য! দুইটা মৃত্যু সংবাদেও সেই মায়া চাপা পড়তে চাইছে না।
বাদলা কথা বলছিল জোরে জোরে। এজন্যই খাটালে শোয়া বড়বুজানের কানে গেছে। এজন্যই কুট্টিকে তিনি ডেকেছেন।
বড়বুজানের কাছে গেল না কুট্টি। পিছনদিকে মুখ ঘুরিয়ে গলা চড়িয়ে বলল, খাড়ন, বেক কথা হুইন্নালই। তারবাদে আপনেরে আইয়া কইতাছি।
সকালবেলার রোদ ভালভাবে ছড়িয়েছে। গাছপালা ঘরের চাল টপকে উঠানপালানে নেমেছে। বাদলার হাঁটু তরি রোদ, তার উপর থেকে বড়ঘরের ছায়া।
কুট্টি বলল, নিজের উডানের তালগাছতলায় আলার মা চাচি বইলো ক্যা? ঘরে গিয়া মরলো না ক্যা?
বাদলা বলল, হেয় তো বাইত্তে আছিলো না।
গেছিলো কই?
কুতুব আলীগো বাড়ি। বাইত্তে যাওনের সমায় গাওয়াল বাড়ি অইয়া গেছে। গাওয়ালের যেই মাইয়াডা অইছিল, হেইডারে দেইক্কা তারবাদে বাড়িমিহি মেলা দিছে।
বাদলার কথা শেষ হওয়ার আগেই আলফু বলল, মনে অয় বাইত্তে ওডনের সময়ই আজরাইল আইয়া সামনে খাড়ইছে। ঘর তরি চাচিরে আর যাইতে দেয় নাই।
বাদলা বড়দের কায়দায় বলল, হ, এর লেইগাঐ হেয় তালগাছতলায় বইয়া পড়ছিল।
কুট্টি বলল, বাড়ির মাইনষে কেঐ হেরে দেকলো না? হাইজ্জাকালে উডানের তালগাছতলায় কীয়ের লেইগা বইয়া পড়লো হেয়, এইডা কেঐ খ্যাল করবো না? তোতা দাদার বউ পোলাপানরা আছিলো কই?
বাইত্তেঐ আছিলো। যেই পোলাডা দাদির কাছে থাকতো ওঐত্তো পয়লা দেকছে তালগাছতলায় বইয়া রইছে দাদি। রাইত অইয়া যাইতাছে আর দাদি বইয়া রইছে তালগাছতলায়, ঘরে আহে না, এইডা দেইক্কাওই ছেমড়া দৌড়াইয়া গেছে দাদির কাছে। কী অইছে দাদি? এহেনে বইয়া রইছো ক্যা? ঘরে লও। দাদি কথা কয় না দেইক্কা হাত ধইরা টান দিছে। লগে লগে কাইত অইয়া মাডিতে পড়ছে আলার মা’য়।
কুট্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আহা রে, কেমন মউত মরলো।
আলফু বলল, দাফোন অইয়া গেছে?
না অহনতরি অয় নাই। রাইত্রেঐ গোসল দেওয়াইছে। মাওয়ার বাজার থিকা কাফোনের কাঁপোড়চোপড় আইন্না ফিন্দাইছে। বড়ঘরেঐ রাকছে লাশ। আমি গিয়া দেইক্কাইছি। জহুর নমজের আয়জানের লগে লগে লইয়া যাইবো খাইগো বাড়ির মজ্জিদের সামনে। নমজ শেষ কইরা মাওলানা সাবে জানাজা পড়বো। তারবাদে গোরস্থানে লইয়া যাইবো।
কুট্টি বলল, তুই যাবি না?
বাদলা গভীর আগ্রহের গলায় বলল, কন কী? যামুনা মাইনি? অবশ্যই যামু। পুরানবাড়ি থিকা ফিরনের সময় আপনেগো বাড়ির উপরে দিয়া যাইতাছিলাম, মনে করলাম খবরডা আপনেগো দিয়া যাই। অহন বাইত্তে গিয়া নাইয়া ধুইয়া তারবাদে আবার যামু পুরানবাইত্তে। লাশের লগে যামু মজ্জিদে। নমজ পইড়া, জানাজা পইড়া গোরস্থানে মাডিও দিতে যামু।
মাড়ি দিয়া আহনের পরও তো তর আবার নাওন লাগবো।
ক্যা?
মানুষ গোর দিয়া আহনের পর নাইতে হয়।
এইডা নিয়ম?
হ।
তয় নামু। দিনে দুইবার নাইলে অসুবিদা কী? আর অহন তো শীতের দিনও না। চইত মাস আইয়া পড়ছে। গরমের দিনে দুই-চাইরবার নাইলে অসুবিদা নাই।
বাদলার শেষ দিককার কথাগুলি যেন কানে গেল না আলফুর। আপনমনে সে বলল, শইলডা ভাল থাকলে আমিও যাইতে পারতাম চাচিরে মাড়ি দিতে।
তারপর কুট্টির দিকে তাকাল। না কি পুকঐরে গিয়া দুইহান ডুব দিয়াইয়া যামু চাচিরে মাড়ি দিতে?
