বুজতাছি না। বহো চাচি, বহো।
ঘরের মেঝেতে হোগলা পাতা। হোগলার উপর পাতলা কাঁথা পিঠের তলায় দেওয়া মেয়ে কোলে নিয়ে বসে আছে বানেছা। আজিজ গাওয়ালে গেছে সকালবেলা, এখনও ফিরে নাই। পোলাপানরা নামার দিককার খোলা জায়গায় গোল্লাছুট খেলতে গেছে। ছ’দিন আগে, মেয়ে হওয়ার আগে যে ছেলে ছিল বানেছার কোলে সে এখন নিজের অজান্তেই দূরে সরে গেছে। এখন থাকে পরি জরির কোলে। বড়বোনের কোলে চড়ে সেও গেছে গোল্লাছুটের মাঠে। সে তো আর খেলার উপযুক্ত হয়নি, নিশ্চয় কোনও বোন তাকে কোলে নিয়ে মাঠপারে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যরা খেলছে ওরা দুইজন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
বানেছার কথা শুনে তার পাশে বসল আলার মা। ক্লান্তির শ্বাস ফেলল।
বানেছা বলল, বাইত থিকা আইলা নি?
না।
তয়?
গেছিলাম কুতুব আলীগো বাড়ি। কুতুব আলীর ছোড ভাইর বউর আহুজ পড়বো। আট মাস চলতাছে। পয়লা পখম তো, বউডা ডরায়। আইজ দোফরের সমায় চিইক্কাইর শুরু করছে, কয় বেদনা উটছে। আমারে খবর দিছে। আমি তো জানি এই বেদনা আসল বেদনা না। এইডা অর মনের বেদনা। গিয়া বুজ দিয়া আইলাম। যাওনের সমায় মনে করলাম তর মাইয়াডারে দেইক্কা যাই। ওই বানেছা, মাইয়ার নাই (নাভি) হুগাইছে?
না, অহনতরি কাঁচা। নাইর চাইরমিহি রাঙ্গা হইয়া রইছে।
কচ কী?
হ।
দেহা আমারে।
বুকের কাছ থেকে এনে সামনের দিকে দুইহাতে শিশুটিকে মেলে ধরল বানেছা। সে তখনও তার মতো চেঁচিয়ে যাচ্ছে। কান্না খেয়াল করল না আলার মা। বয়সি চোখ যতদূর সম্ভব তীক্ষ্ণ করে শিশুটির নাভির দিকে তাকাল। তাকিয়ে চমকে উঠল। নাভির চারপাশটা বেশ লাল হয়েছে। সুতার গিট দেওয়া জায়গাটায় একটু যেন পাক ধরেছে, ভিতরে যেন একটু একটু পুঁজ। এই ব্যথায়ই কাঁদছে মেয়ে? কিন্তু এমন কেন হল? এমন হওয়ার তো কারণ নাই।
আলার মা’র বুকের খুব ভিতরে অশুভ একটা কাঁপন লাগল। লক্ষণটা ভাল না। নাভিতে পচন ধরেছে। আজ রাতেই খিচুনি হবে। কাল সকাল নাগাদ থেকে থেকে হাত-পা বাঁকা হয়ে আসবে। ধনুষ্টংকার। এখন আর ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেও কাজ হবে না। অষুদ ইঞ্জেকশান কোনও কিছুতেই কাজ হবে না। কাল দুপুর নাগাদ চলে যাবে শিশুটি।
মুখে ম্লান ছায়া পড়ল আলার মা’র। চোখ উদাস হল। তবু বানেছাকে কিছু বুঝতে দিল না। চিন্তিত গলায় বলল, নাইডা এমুন হইছে ক্যা? পাতলা কাপড়ের ত্যানা পোড়া ছাই লাগাচ নাই নাইতে?
লাগাইছি তো?
তয় এমুন অইবো ক্যা?
এবার বানেছাও চিন্তিত হল। তয় কি নাইর বেদনায় কানতাছে মাইয়াডা?
হ।
বানেছা দিশাহারা হল। এই বেদনা তাইলে কমামু কেমতে?
হেইডা বোজতে পারতাছি না। এক কাম কর, আজিজ বাইত্তে আইলে, যহনঐ আইবো তহনঐ মাইয়াডারে লইয়া কাজিরপাগলা যাবি। করিম ডাক্তাররে দেহায় আন। অষইদ দিলে, সুঁই দিলে বেদনা কইমা যাইবো।
শুনে ঠোঁট উলটাল বানেছা। হ, তুমিও যেমুন! এই মাইয়া লইয়া হেয় যাইবো ডাক্তারের কাছে! পোলা মাইয়ার কোনও দাম আছেনি হের কাছে?
এবার আলার মা একটু রাগল। দাম না থাকলে পোলাপান হওয়ায় ক্যা?
হেইডা তো আমিও কই?
তুই বা অরে কচ না ক্যা, তুইই বা হওয়াচ ক্যা?
আমি কী করুম?
যা করনের তাই করবি। পোলাপান যাতে না অয় হেই বেবস্থা করবি।
শিশুটি তখন আরেকটু নিস্তেজ হয়েছে। গলার স্বর আরও বসে গেছে। এমন করুণ শোনাচ্ছে কান্না! জাতসাপে থাবা দিয়ে ধরার পর, সাপের বিষাক্ত মুখে আটকা পড়ে যেমন করে গোঙায় কুনোব্যাং, শিশুটির কান্না অনেকটাই তেমন।
আলার মা মনে মনে বলল, আল্লাহ রহম করো, রহম করো।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠল। যাই লো মা।
বানেছা হতাশ গলায় বলল, ডাক্তরের কাছে যাওন ছাড়া আর কোনও উপায় নাই?
কইতে পারি না।
আলার মা আর দাঁড়াল না। শিশুটির দিকে একপলক তাকিয়ে ঘর থেকে বেরুল। পশ্চিম দিককার ভাঙন দিয়ে চকে নামল। নেমেই মনে হল তার কোনও গাফিলতির জন্য এমন হয়নি তো? আজিজ গাওয়ালের কথা শুনে মনটা অন্যরকম হয়েছিল বলে নাভিটা সে কি যত্ন করে কাটেনি? সুতার গিটটু কি যত্ন করে দেয়নি? পোড়া কাপড়ের ছাই কি জায়গা মতো লাগায়নি? নিজের অজান্তে কি সে তা হলে আজিজের কথা মতোই কাজ করেছে? শিশুটি যাতে বেঁচে থাকতে না পারে সেই ব্যবস্থা করেছে?
হায় হায় এতকাল ধরণীর কাজ করে এই শেষ বয়সে এসে এ কোন পাপ সে করল? ছয়দিনের হোক আর যাই হোক মানুষ তো! আলার মা তা হলে মানুষ খুন করল!
এসব ভেবে বুক কেমন করতে লাগল আলার মা’র। চিন্তা চেতনা এলোমলো হয়ে গেল।
মাঠ থেকে রোদ তখন গুটিয়ে নিচ্ছিল সূর্য। দিগন্তরেখা অতিক্রম করে আগাচ্ছিল সন্ধ্যাবেলার ছায়া। রোদে পোড়া দিনের তাপ মুছে দিতে হু হু করে বইছিল মায়াময় হাওয়া। মাঠ প্রান্তর থেকে বিষয়কর্ম সেরে মানুষ ফিরছিল যে যার সংসারে, পাখিরা উড়ে উড়ে যাচ্ছিল আপনগাছে। আলার মা’র আঙিনার তালগাছের বাসায় আর ডালে ডগায় বসে কিচিরমিচির করছিল বাবুই পাখিরা।
চক ছাড়িয়ে, ভাঙন ঠেলে নিজের আঙিনার দিকে উঠতে উঠতে আলার মা টের পেল পা চলছে না তার। কোমরের তলা থেকে পায়ের বহু বহুবছরের পুরানা হাড়গুলি অসাড় হয়ে গেছে। হাড়ের ভিতর থেকে যেন টেনে নিয়েছে মজ্জা। চামড়ার তলায় লুকিয়ে থাকা পুরানা মোটা চিকন রগ বন্ধ করে দিয়েছে রক্তের চলাচল। মাংসপেশিগুলি করে দিয়েছে অকেজো।
