এসব ভেবেই ধড়ফড় করে উঠে বসল কুট্টি। নিজের জন্য আর আলফুর জন্য যেমন করে তোক বাঁচিয়ে রাখতে হবে বড়বুজানকে। গলা টিপে ধরা মওতকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে হবে বড়বুজানের শিথান থেকে।
সেরকম মারমুখো ভঙ্গি নিয়েই উঠে দাঁড়াল কুট্টি। তীক্ষ্ণচোখে তাকাল বড়বুজানের বিছানার দিকে।
কিন্তু শব্দ ওদিক থেকে আসছে না। কুট্টির দিকে পিছন ফিরে বেড়োরে (নিঃসাড়ে) ঘুমোচ্ছেন বড়বুজান।
তা হলে শব্দ আসে কোত্থেকে?
কুট্টি দিশাহারা হল, কানখাড়া করল। তারপরই বুঝে গেল শব্দটা আসছে উত্তরের বারান্দা থেকে। আলফু করছে।
কী হল মানুষটার? এমন করছে কেন? বোবায় ধরল নাকি?
বোবায় ধরার শব্দ এমন না। বোবায় ধরলে শব্দ করে গোঙায় পুরুষমানুষ। ছোটবেলায় বাবাকে দুই-একবার গোঙাতে শুনেছে সে। প্রায় রাতেই বাবাকে বোবায় ধরত। তখন জোরে জোরে বাবাকে দুই-তিনটা ধাক্কা দিত মা। সেই ধাক্কায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসত বাবা।
বোবা হচ্ছে একধরনের অলৌকিক শক্তিধর অসুর। রাতদুপুরে ঘুমন্ত মানুষের বুকে চেপে বসে। গলা চেপে ধরে। মৃতপ্রায় মানুষ তখন গোঙাতে থাকে। অন্য কেউ জোরে ধাক্কা না মারলে বুক থেকে ছিটকে পড়ে না বোবা। মানুষের জান কবচ করে তবে যায়।
কিন্তু এতদিন ধরে এই বাড়িতে আছে আলফু, বারান্দায় ঘুমাচ্ছে, কই কখনও তো বোবায় ধরেনি তাকে! কখনও তো রাতদুপুরে তার কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি!
আজ কী হল? কেন এমন করুণ স্বরে কাতরাচ্ছে? কুট্টির ইচ্ছা করে দরজা খুলে আলফুর কাছে যায়। আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী অইছে আপনের? এমুন করতাছেন ক্যা?
নারীর সংকোচ তার পা চেপে ধরে রাখে। এরকম গভীর রাতে পরপুরুষের কাছে কেমন করে যাবে সে? নিজেকে কেমন মেয়েমানুষ মনে হবে তখন! আলফুই বা কী ভাববে আর এতকাছে বড়বুজান শুয়ে আছে, মরণের মুখে দাঁড়িয়েও যতটা সম্ভব কুট্টির দিকে নজর রাখে সে। আলফুর সঙ্গে কুট্টির কথাবার্তার শব্দ পেলেই কান খাড়া করে। জিজ্ঞাসা করে, কী এত প্যাচাইল পারচ জুয়ানমর্দ বেড়ার লগে? তুই যুবতী মাইয়া, হিসাব কইরা চলাফিরা করি। আকাম কুকাম কইরা পেটপোট বাজাইয়া মরিচ না।
এখনও বড়বুজানের কথাগুলি মনে পড়ল।
কিন্তু মানুষটা এমন করছে! তা ছাড়া কুট্টির মন শরীর সবই তো তার জন্য অনেকদিন ধরে উন্মুখ। নিজেকে কুট্টি কতদিন ফিরিয়ে রাখবে?
নাকি আজ রাতেও ফিরাবে নিজেকে! আলফুর কাছে যাবে ঠিকই কিন্তু অন্যভাবে, সবদিক রক্ষা করে। প্রথমে বড়বুজানকে ডাকবে। ডেকে বলবে, আলফু জানি কেমুন করতাছে। হারিকেনডা লইয়া দুয়ার খুইলা দেহি।
তারপর শব্দ করে দরজা খুলে বারান্দায় যাবে, আলফুকে ডাক দিবে। কী অইছে আপনের?
দরকার হলে বড়বুজানও পালঙ্কে শুয়ে গলা উঁচু করে ডাকবে আলফুকে। কী রে আলফু, কী হইছে তর?
এসবের কিছুই কুট্টি করল না। বহুদিন ধরে শরীর মন উন্মুখ হয়ে আছে যে মানুষটির জন্য, আজকের এই রাতদুপুরে সেই মানুষের কষ্ট যন্ত্রণার শব্দ শুনে শেষ পর্যন্ত যেরকম করে যাওয়ার কথা তার কাছে ঠিক তেমন করেই কুট্টি গেল। নিঃশব্দে দরজা খুলে, পা টিপে টিপে অন্ধকার বিছানায় আলফুর পাশে গিয়ে বসল। ফিসফিস করে ডাকল, হোনছেন? হোনছেননি? এমুন করতাছেন ক্যা? কী অইছে আপনের?
কুট্টির মতোই ফিসফিস করে মুমূর্ষ গলায় আলফু বলল, মাথাডা ছিট্টা পড়তাছে বেদনায়। বেদম জ্বর আইছে।
কন কী? কুনসুম জ্বর আইলো?
ভাতপানি খাইয়া হোওনের পরঐ।
তারপরও নারীর সেই সংকোচ কিছুটা সময় আটকে রাখল কুট্টিকে। ভিতরে ভিতরে নিজের সঙ্গে খানিক যুদ্ধ করল কুট্টি। তারপর আর পারল না। ডান হাত গভীর মমতায় রাখল আলফুর কপালে। কেন যে তখন সেই ছোটবেলার কথাটা আবার মনে পড়ল,
কুট্টি লো কুট্টি
তরে দিলাম ছুট্টি!
.
কী লো বানেছা, মাইয়াডা এমতে কান্দে ক্যা?
বিকালবেলা দুয়ারের সামনে আলার মা’কে দেখে মুখে কীরকম একটা স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল বানেছার। ছয়দিন বয়সের মেয়েটা ওঁয়াও ওঁয়াও করে কাঁদছে। কান্নার শব্দে বোঝা যায় বহুক্ষণ ধরে একটানা কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়েছে। এখন আর ঠিকমতো কাঁদতেও পারছে না। গলা ভেঙে আসছে।
মেয়ের কান্না থামাতে নানারকম চেষ্টা করছে বানেছা। কখনও বুকের দুধ খাওয়াবার চেষ্টা করছে, দুধ মুখে না নিয়ে মেয়ে কাঁদছেই। তখন দিশাহারা ভঙ্গিতে দুইহাতে মেয়েকে দোল দিতে দিতে বলছে, ও কান্দে না, কান্দে না। ওরে আমার সোনারে, আমার মানিকরে, কান্দে না।
মেয়ে কাঁদছেই।
এই অবস্থায় আলার মা এসে দাঁড়িয়েছে দুয়ারের সামনে। মেয়ের কান্না শুনে প্রশ্নটা করেছে।
কথা কাপড়ে জড়ানো মেয়েকে দোল দিতে দিতে বানেছা বলল, কীর লেইগা যে এমুন কান্দন কানতাছে কইতে পারি না চাচি।
কুনসুম থিকা কান্দে?
বিয়াইন্না রাইত থিকা।
হারাদিন কানছে?
হ। কানতে কানতে গলা ভাইঙ্গা গেছে।
ইটুও থামে নাই? ইট্টুও ঘুমায় নাই?
না।
বুকের দুদ দিছচ? খাইছে?
দিছি, খায় না।
আলার মা চিন্তিত হল। পেড বেদনা করে নি?
কেমতে কমু?
তালমিছরির পানি আর মধু বেশি খাওয়াচ নাই তো?
না। ঘরে তালমিছরি আর মধু তো নাই। নাদেরের বাপে আনে নাই। দিমু কই থিকা?
তাইলে খাওয়াইছচ কী? খালি বুকের দুদ?
হ।
বুকের দুদে পেড কামড়ানের কথা না। মাইয়া তাইলে কানবো ক্যা?
