ঠাটাপড়া মানুষের মতন কুট্টি তখন স্থির। মায়ের কোল থেকে নয়ন দুঃখী মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই তাকানোয় কী যে মায়া ছিল! আজও যখন তখন সেই স্মৃতি মনে পড়ে কুট্টির। কতকাল আগের কথা, তবু সেই শিশুটিকে পরিষ্কার দেখতে পায় কুট্টি। তার। মিষ্টি মুখখানি, তার ডাগর চোখ দেখতে পায়। আর কানের অনেক ভিতরে থেকে শুনতে পায় পাখির গলায় সে ডাকছে, মা মা।
সন্ধ্যার মুখে মুখে ঝুলবারান্দার দিককার দরজাটা বন্ধ করতে হয় ওদিকে আর কোনও কাজ থাকে না বলে। তা ছাড়া দেশগ্রাম এখন আর আগের মতো নাই। রাস্তার কাজ শুরু হওয়ার পর দেশগ্রামে এখন বারো পদের মানুষ। চোরধাউরে ভরে গেছে। মুকসেইদ্দা চোরাও নাকি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরেছে। দরজা খোলা থাকলে দক্ষিণের ঝুলবারান্দা টপকে কে এসে ঢুকবে ঘরে কে জানে! কুট্টি থাকবে তখন রান্নাঘরে, উত্তরের বারান্দায়, উদিসও পাবে না কে এসে ঢুকল ঘরে! আর বড়বুজানের তো যোদববাদ (বোধ অর্থে) নাইই, মানুষের পায়ের শব্দ পেলে ভাববে কুট্টিই চলাফেরা করছে। কথাই বলবে না।
সুতরাং বিকাল ফুরিয়ে চারদিক ছায়াময় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওদিককার দরজা বন্ধ করে কুট্টি। তারপর নিশ্চিন্ত মনে রান্নাঘরের কাজ সেরে উত্তরের বারান্দায় এসে ঢোকে। কুপিবাতি জ্বেলে প্রথমে বড়বুজানকে খাওয়ায়, সেই ফাঁকে আলফু এসে বাইরের দিককার দরজা বন্ধ করে। দরজার আড়ালে রাখা হোগলা পেতে বসে।
বড়বুজানকে খাইয়ে আলফুকে খেতে দেয় কুট্টি, নিজে খায়। আগে বেশ তাড়াতাড়িই সারত কাজটা। কথাবার্তা আলফু কম বলে, কুট্টিও তেমন বলত না। খাওয়াদাওয়া সেরে যে যার মতো ব্যস্ত হত। খাটালে ঢুকে বারান্দা আর খাটালের মাঝখানকার দরজা বন্ধ করে, হারিকেন নিভুনিভু করেই শুয়ে পড়ত কুট্টি। বন্ধ দরজার ওপাশে বারান্দায় বিছানা পেতে শুয়ে পড়ত আলফু। যে যার মতো চলে যেত ঘুমের জগতে।
মাকুন্দা কাশেমের ঘটনার ক’দিন আগে, সেই যে সেই দুপুরে চালতাতলায় পিছন থেকে আলফুর পিঠ কাঁধ দেখে শরীরের খুব ভিতরে আশ্চর্য এক কাঁপন লাগল কুট্টির, আর একদিন কী কাজে ঘাটলায় গিয়ে কচুরির চাক তুলে মাছ ধরতে থাকা আলফুকে দেখেও সেই একই অনুভূতি। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী যেন কী চাহিদা। শরীর যেন উন্মুখ হচ্ছে, মন উন্মুখ হচ্ছে। তারপর ঘটল মাকুন্দা কাশেমের ঘটনা। নিজের ভাগের ভাতটুকু কাশেমের সঙ্গে ভাগ করে খেতে বসেছিল আলফু, সেই দৃশ্যের ভিতর দিয়ে আলফুর মনেরও যেন অনেকখানি দেখে ফেলল কুট্টি। একদিকে শরীর আরেকদিকে মন, ভিতরে ভিতরে আলফুর জন্য কী যেন কী একটা কাণ্ড ঘটতে লাগল কুট্টির। আলফুর দিকে এখন তাকাতে লজ্জা তার, কথা বলতে লজ্জা। ইচ্ছা করে খুব। খুব তাকাতে ইচ্ছা করে মানুষটার দিকে। খুব দেখতে ইচ্ছে করে তার চোখ, মুখ। খুব বলতে ইচ্ছা করে তাকে মনের সবকথা। সামনে বসিয়ে খাওয়াবার সময় এটা ওটা তুলে দিতে ইচ্ছা করে পাতে। আর গভীর রাতে ঘুম ভাঙার পর ইচ্ছা করে নিঃশব্দে উঠে বারান্দা আর খাটালের মাঝখানকার দরজা খুলে চুপিচুপি চলে যায় মানুষটার কাছে। মা হওয়ার আগে মেয়েবেড়ালটা যেভাবে যেত মেন্দাবাড়ির হোলোটার কাছে, ঠিক তেমন এক টান শরীর মনে।
আজ রাতে ঘুম ভাঙার পরও সেই একই অনুভূতি হল কুট্টির। ঘরের এককোণে নিভুনিভু হয়ে জ্বলছে হারিকেন। গভীর রাতের জমাট অন্ধকার সেই আলোয় আবছায়া তৈরি করেছে। ঠাকুরবাড়ির ওদিককার গাছে বসে ডাকছে কোকিল। কী আকুল করা। ডাক! রাতের দিকবিদিক ভেঙে সেই ডাক চলে যাচ্ছে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে। এমন করে কেন ডাকে কোকিল? এই ডাকও যে মনের ভিতর, শরীরের ভিতর আশ্চর্য এক শিহরন জাগায় কুট্টির!
ফাগুন রাতের হাওয়া বইছে। আঙিনার গাছপালায় বয়ে যাওয়া হাওয়ার শব্দ, ঝিঁঝিরাও ডেকে যাচ্ছে তাদের মতো করে। এইসব শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ করেই কুট্টির কানে এল মানুষের কষ্টযন্ত্রণার ক্ষীণ একটা শব্দ। যেন গভীর কষ্টেও শব্দ করতে চাইছে না মানুষটা, আবার চেপেও রাখতে পারছে না, নিজের অজান্তেই শব্দটা যেন বেরিয়ে আসছে।
কুট্টির বুকটা ধ্বক করে উঠল। কে করছে এমন শব্দ? বড়বুজানে?
ঘুমের তালে মওত এসে গলা টিপে ধরেনি তো বড়বুজানের? মরণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে না তো সে!
সর্বনাশ! যার জন্য এই বাড়ির বাধা ঝি কুট্টি, যার জন্য তিনওক্ত ভরপেট খেয়ে, বছরের দুই ইদে দুইখান শাড়ি ছায়া ব্লাউজ আর স্পঞ্জের স্যান্ডেল পেয়ে, কখনও কখনও নগদ দশ-বিশটাকা পেয়ে বেঁচে আছে, সেই মানুষ যদি রাতের অন্ধকারে গোপনে মরে যায় তা হলে কুট্টির দশা হবে কী! বড়বুজান মরলেই এই বাড়িঘর বিক্রি করে দিবে মাজারো বুজানে, জমিজমা ছাড়াবাড়ি সব বিক্রি করে দিবে। দেশগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কই রাখবে না। তখন কুট্টির উপায় হবে কী? কোথায় যাবে সে? গ্রামের কোন বাড়িতে কাজ নিবে! কে তাকে দিবে এই বাড়ির মতো ভাত কাপড়, স্বাধীনতা?
আর তেমন হলে আলফুরই বা উপায় হবে কী? কোথায় যাবে সে, কোথায় কাজ নিবে?
আলফু পুরুষমানুষ, তার কাজের অভাব হবে না। চরে, নিজের দেশে গিয়েও কাজকাম করে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু মানুষটার জন্য কুট্টির শরীরমনে তৈরি হয়েছে যে অনুভূতি, বড়বুজান মরে গেলে জীবনের টানে দুইজন মানুষ ছিটকে যাবে দুই ভুবনে, আলফুর কোনও মায়ামমতা হবে কি না কুট্টির জন্য কে জানে! কুট্টির হবে। মানুষটিকে ছেড়ে সে থাকবে কেমন করে!
