কচুরি হচ্ছে অদ্ভুত আগাছা। রাতারাতি বংশ বাড়াবার ওস্তাদ। আজ দেখলে একখান কচুরি কালই দেখলে চারপাশে আরও সাত-আটখান ছোট ছোট গজিয়ে গেছে। নীল বেগুনি আর সাদায় মিশানো ফুল ছাড়া কচুরির আর কিছুই সুন্দর না।
তবে তিনদিকে কচুরি, একদিকে ঘাটলা আর অনেকখানি জায়গা জুড়ে পবিত্র মানুষের মনের মতো পানি, সেই পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ভাল লাগে।
বড়বুজানের লাগে কি না কে জানে! নিভে আসা চোখের আলোয় পানির স্বচ্ছতা সে দেখতে পায় কি না কে জানে! তবু তাকিয়ে থাকে।
পুকুরের ওপারে বাঁশবন, দুই-তিনটা হিজল বউন্নাগাছ। গাছগুলি জড়িয়ে আছে গাঢ় সবুজপাতার এক রকমের লতা। দুপুরের নির্জনতায় ঘুঘু ডাকে সেই ঝোপে। ঘুঘুর ঘুঘ, ঘুঘুর ঘুঘ।
বড়বুজানকে ঝুলবারান্দায় বসিয়ে কুট্টি হয়তো তখন নাইতে আসছে ঘাটলায়। বদনা ভরে পানি তুলে মাথায় ঢালবার আগে রান্নাঘর থেকে হাতের তালুতে করে আনা কয়লার ফাঁকি আঙুলের আগায় নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দাঁত মাজার অভ্যাস আছে তার। উদাস আনমনা ভঙ্গিতে দাঁতটা হয়তো সে তখন মাজছে, ঘুঘুপাখি তখনই হয়তো ডাকছে ঝোপে, সেই ডাকে, সেই দুপুরের নির্জনতায় মনটা কেমন করে তার! ঘাটলায় বসে পানির আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে কুট্টির মন যে চলে যায় কোনখানে!
এই জীবন কি এমন হবার কথা ছিল কুট্টির?
সতিনের সংসার হোক, সংসার তো একটা পেয়েছিল। সেই সংসারে না ছিল ভাত কাপড়ের সুখ, না ছিল স্বামীর আদর সোহাগের সুখ। সতিনটা ছিল দজ্জাল। কথায় কথায় চুলাচুলি করত, মারধর করত। তিন-চারটা পোলাপান জন্ম দেওয়ার পরও দেহে ছিল মাগির দামড়ির মতো জোর। খেয়ে না-খেয়ে বড় হওয়া কাহিল কুট্টি কিছুতেই কুলাত না তার সঙ্গে। বেদম মারধর খেয়ে বাড়ির আঙিনায় বসে অসহায়ের মতো কাঁদত। এই নিয়ে স্বামী কোনও কথা বলত না। হয়তো ওরকম করে বসে কাঁদছে কুট্টি আর সেই লোকটা রান্নাচালার সামনে বসে নির্বিকার ভঙ্গিতে নারকেলের হুঁকায় গুড়ুক গুড়ুক করে তামাক টানছে।
মানুষটার সঙ্গে শোয়ার সুযোগও তেমন পেত না কুট্টি। কোনও কোনও রাতে তো সতিন মাগিটা এসে কুট্টির পাশ থেকে টেনেই তুলে নিয়ে যেত তাকে। দেহ অনুযায়ীই চাহিদা ছিল তার। লোকটা বোধহয় কুলাতেও পারত না তার সঙ্গে। ফলে যে দুই-চারদিন তাকে ভাগে পেত কুট্টি, পাশে শুয়ে এমন ম্যাড়ার মতন (দুর্বল অর্থে) আচরণ করত, ওই আচরণে খুশি হওয়ার কথা না কোনও যুবতী মেয়ের। কিন্তু ওইটুকুতেই যেন শরীরের সুখে মরে যেত কুট্টি। ওইভাবেই হয়তো জীবনটা সে কাটাতেও পারত।
কিন্তু ভাতের কষ্ট!
ক্ষুধার কষ্ট!
কোনও কোনও দুপুরে ঘাটলায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে পানির তলায় নিজেকে দেখতে দেখতে সেই জীবনটার কথা মনে পড়ে কুট্টির। আজকের জীবন আর সেদিনকার জীবনের মাঝখানে পরিষ্কার আবরণ। চোখ খুলে তাকালেই ফেলে আসা জীবনটা সে দেখতে পায়। মনটা খারাপ হয়।
তবে যে-কোনও দুঃখের জীবনেও একটু না একটু সুখ থাকেই মানুষের। সেই জীবনেও তেমন এক সুখ কুট্টির ছিল। সতিনের ছোট ছেলেটির বয়স ছিল তিন-সাড়ে তিন বছর। শ্যামল রঙের ল্যাংটাপুটো ছেলেটি সারাদিন ঘুরঘুর করত বাড়ির আঙিনায়। শরীরের কোথাও কোনও বস্ত্র নেই, মাজায় কালো কাইতান বাঁধা, কাইতানের সঙ্গে পিতলের ছোট্ট ঘুঙুরদানা। চলার তালে তালে মৃদু ঝুমঝুম শব্দ হত। সেই শব্দে বোঝা যেত কোনদিকে যাচ্ছে সে। বারবাড়ির দিকে গেল, একলা একা কি নেমে গেল চকের দিকে, নাকি সবার অজান্তে গেল পুকুরঘাটে! পানিতে পড়ল!
কী মিষ্টি মায়াবী মুখ ছিল শিশুটির! টানা টানা চোখ, মেয়েলি ধাচের। মাথাভরতি ঘন চুল। ছোট্ট সুন্দর দাঁতে এত সুন্দর করে হাসত, সেই হাসিতে চারপাশ ফকফক করে উঠত।
যখন তখন মুগ্ধ চোখে শিশুটিকে দেখত কুট্টি।
সতিনের ছেলেমেয়েরা দুইচোক্ষে দেখতে পারত না কুট্টিকে। তার সামনেও আসত না। সত্যা হোক, মা তো ছিল কুট্টি, কেউ মা বলত না। কখনও কখনও বলত ওই শিশুটি। নাম ছিল নয়ন। কুট্টির পাশ দিয়ে কাইতানে বাঁধা ঘুঙুর দানার শব্দ তুলে ছুটে যেতে যেতে আচমকাই সে দুষ্টুদু চোখ করে তাকাত কুট্টির দিকে। মিষ্টি একটুখানি হেসে পাখির গলায় একবার দুইবার ডেকে উঠত, মা মা।
সেই ডাকে কুট্টির বুকের ভিতর তোলপাড় করত। সতিনের সংসার, ক্ষুধার কষ্ট আর মারধর সব মুহূর্তের জন্য ভুলে যেত। নয়নের পিছু পিছু ছুটে গিয়ে দুইহাতে পাগলের মতো বুকে নিত তাকে। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে, গালে মুখে চুমু খেয়ে আদরে আদরে ভরিয়ে দিত ছেলেটিকে।
এইটুকু ভাল লাগাও তার ছিনিয়ে নিয়েছিল সতিন মেয়েছেলেটি। এক বিকালে মা ডাকার পর অমন করে নয়নকে আদর করছিল কুট্টি, নামার দিকে কী কাজে গিয়েছিল নয়নের মা, নয়নকে কুট্টির কোলে দেখে চিলে থাবা দিতে আসা ছানা রক্ষার জন্য যেমন করে ছুটে আসে মুরগি তেমন করে ছুটে এল। এসে ছোঁ মেরে নিল নয়নকে। তারপর তুবড়ির মতো। গালাগাল। পোলাডারে আমার ভাগাইয়া নেওনের চিন্তায় আছচ মাগি? চুপ্পে চুপ্পে হিগায় দিছচ আমার পোলায় য্যান তরে মা ডাকে? জামাইরে হাত করতে না পাইরা অহন আমার। পোলার মিহি হাত বাড়াইছচ? ওই হাত ভাইঙ্গা (মুদ্রণযোগ্য নয়) ভইরা দিমু!
