না দেহি নাই।
তয়?
কইলাম যে মনে অয়।
নূরজাহানের মুখ আবার আগের দিকে ঘুরিয়ে দিল হামিদা। জোরে টেনে টেনে বেণী বাঁধতে লাগল। নূরজাহান একবার উহ করে শব্দ করল তারপর বলল, এত জোরে বেণী বান্দ ক্যা? দুক্কু পাই না?
হামিদা তবু নিজেকে সংযত করল না। আগের মতোই শক্ত হাতে বেণী বাঁধতে বাঁধতে বলল, আমার লগে অলঐক্কা (অলক্ষুণে) কথা কইলে এমুনঐ করুম।
তুমি যুদি আমারে বাইত থনে আইজ না বাইর অইতে দেও তাইলে আরও বহুত কথা কমু দেইক্কোনে।
যত যাই কচ বাইর অইতে দিমু না।
তখনই মুখ ঝামটা দিয়ে ওই কথাটা বলল নূরজাহান। আইজ তুমি আমারে বাইন্দাও রাকতে পারবা না। আইজ আমি বাইর অমুঐ। দুই দিন ধইরা বাইত থনে বাইর অই না। এমনু বন্দি অইয়া মানুষ থাকতে পারে?
হামিদাও নূরজাহানের মতো মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, পারবো না ক্যা? আমরা পারি কেমতে?
তুমি আর আমি কি এক অইলাম?
একঐ। আমি মা তুই মাইয়া। দুইজনেঐ মাইয়ালোক।
ততক্ষণে লাল ফিতা দিয়ে চমৎকার দুইটা বেণী বেঁধে ফেলেছে হামিদা। এখন তেলের বাটি আর কাঁকুই হাতে উঠে দাঁড়াল। শাসনের গলায় মেয়েকে বলল, বাড়ির বাইরে একহান পাও তুই দিতে পারবি না। তর বাপে হেদিন আমারে কইছে আমি যেমতে তরে চালামু অমতেঐ তর চলন লাগবো।
হামিদা উঠে দাঁড়াবার পরও মুখ ব্যাজার করে বসেছিল নূরজাহান। এবার ঘেরজালে আটকা পড়া নলা মাছের মতো লাফ দিয়ে উঠল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, না আমি চলুম না, তোমার ইচ্ছায় আমি চলুম না, আমি আমার ইচ্ছায় চলুম।
এ কথা শুনে মাথায় রক্ত লাফিয়ে উঠল হামিদার। হাতে ধরা কাঁকুই তেলের বাটি ছুঁড়ে ফেলে থাবা দিয়ে নূরজাহানের একটা বেণী ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তর ইচ্ছা মতন তরে আমি চলাইতাছি, বাইত থনে তরে আমি বাইর করতাছি, খাড়া।
বেনী ধরে টানতে টানতে নূরজাহানকে রান্নাচালার সামনে নিয়ে এল। রান্নাচালার মাথার কাছে সব সময় থাকে একগাছা দড়ি। একহাতে নূরজাহানের একটা বেণী ধরে রেখেই অন্যহাতে দড়িটা টেনে নামাল সে। সেই দড়ি দিয়ে কষে হাত দুইখানা বাঁধল নূরজাহানের। দড়ির অন্যমাথা বাঁধল রান্নাচালার একটা খুঁটির সঙ্গে। তারপর ধাক্কা দিয়ে নূরজাহানকে বসিয়ে দলি মাটিতে। পারলে অহন বাইর অ বাইত থন, দেহি কেমতে বাইর অছ!
রাগে দুঃখে নূরজাহানের তখন চোখ ফেটে যাচ্ছে। হাত দুইটা বাধা, পা ছড়িয়ে রান্নাচালার মাটিতে বসা নূরজাহান তারপর ঙো ঙো করে কাঁদতে লাগল।
.
১.১৪
দবির গাছি বাড়ি ফিরল বিকালবেলা। শেষ হেমন্তের রোদ তখন গেন্দা (গাঁদা) ফুলের পাপড়ির মতন ছড়িয়েছে চারদিকে। চকমাঠ গাছপালা আকাশ ঝকঝক করছে। থেকে থেকে বইছে উত্তরের হাওয়া। এই হাওয়ায় মনের ভিতর অপূর্ব এক অনুভূতি হচ্ছে দবিরের। গভীর আনন্দে ভরে আছে মন মৌশুমের প্রথম গাছ ঝুড়ল আজ। খুব সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেছে মিয়াদের ছাড়াবাড়িতে। তারপর থেকে একটানা গাছ ঝুড়েছে। নাওয়া খাওয়ার কথা মনে ছিল না। আটখানা গাছ ঝুড়তে বিকাল হয়ে গেছে। তারপর প্রতিটা গাছে হাঁড়ি ঝুলিয়ে এইমাত্র বাঁশের বাখারির শূন্য ভার কাঁধে বাড়ি ফিরল। হাতের কাজ শেষ হওয়ার পর পরই পেটের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠেছে ক্ষুধা। সেই ক্ষুধা এখন আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে মনের আনন্দ অন্যদিকে ক্ষুধা সব মিলিয়ে আশ্চর্য এক অনুভূতি এখন। বাড়িতে উঠে সারেনি চিৎকার করে হামিদাকে ডাকল। ও নূরজাহানের মা, তাড়াতাড়ি ভাত বাড়ো। খিদায় জান বাইর অইয়া গেল।
ঘরের সামনে সেই জলচৌকিতে বসে পুরানা ছেঁড়া মোটা একখানা কাঁথায় তালি দিচ্ছে হামিদা। কাঁথা কোলের ওপর রেখে অতিযত্নে কাজটা করছে আর রান্নাচালার দিকে তাকাচ্ছে। সেখানে দুইহাত বাঁধা নূরজাহান মাটিতে শুয়ে আছে করুণ ভঙ্গিতে। বাঁধা হাত দুইটা রেখেছে বুকের কাছে। অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে খানিক আগে থেমেছে। এখন চোখ বোজা। যে কেউ দেখে ভাববে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। কিন্তু হামিদা জানে ঘুমায়নি নূরজাহান। চোখ বুজে পড়ে আছে।
মেয়েকে এভাবে মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখে এখন মায়া লাগছে হামিদার। ইচ্ছা করছে হাতের বাঁধন খুলে ছোট্ট শিশুর মতো টেনে কোলে নেয় মেয়েকে। দুইহাতে বুকে চেপে আদর করে।
কিন্তু এই কাজ করতে গেলেই লাই পেয়ে যাবে নূরজাহান। মাকে পটিয়ে পাটিয়ে এখনই ছুটে বের হবে বাড়ি থেকে। কোথায় চলে যাবে কে জানে! তারচেয়ে এই ভাল, শাসনের সময় শাসন, আদরের সময় আদর।
তবে বাড়ির উঠানে এসে রান্নাচালায় হাত বাঁধা নূরজাহানকে শুয়ে থাকতে দেখে দবির একেবারে থতমত খেয়ে গেল। একবার নূরজাহানের দিকে তাকাল তারপর তাকাল হামিদার দিকে। ক্ষুধার কথা ভুলে বলল, কী অইছে? মাইয়াডারে বাইন্দা থুইছো ক্যা?
কথাটা ঘরের ভিতর রেখে এসে হামিদা বলল, তয় কী করুম! তোমার মাইয়ায় কথা হোনে না। জোর কইরা বাড়িতথন বাইর অইয়া যাইতে চায়।
এর লেইগা বাইন্দা থুইবা? আমার মাইয়ায় কি গরু বরকি (ছাগল)? হায় হায় করছে কী!
শূন্য ভার কাঁধ থেকে নামিয়ে ছুটে নূরজাহানের কাছে গেল দবির। চটপটা হাতে বাঁধন খুলে দিল। নূরজাহান যেই কে সেই। যেমন শুয়েছিল তেমনই শুয়ে রইল। এমন কী বাঁধা হাত যেভাবে ছিল সেভাবেই রইল, একটুও নড়াল না। যেন গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে সে, অচেতন হয়ে আছে, এই অবস্থায় হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে, উদিসই পায়নি। দেখে হামিদা বলল, ইস কুয়ারা (ঢং) দেইক্কা মইরা যাই। এই ছেমড়ি ওট, অইছে।
