এবার কথাটা বুঝল হামেদ। স্বস্তির শ্বাস ফেলল। বুজছি, ইবার বুজছি।
মুনশিসাবে বহুত কামেলদার মানুষ আছিলো। হেয় একহান ফুঁ দিয়া দিলে মাইনষের অসুখবিসুখ ভাল অইয়া যাইতো।
মন্নান মাওলানা সাবেও বলে বহুত কামেলদার?
নাদের ভুরু কুঁচকে বলল, থো। ওই হালায় বদমাইশ। কাশেম কাকারে কেমতে খেদাইলো গেরাম থিকা! নূরজাহান বুজি বহুত ভাল কাম করছে। বেবাকতের সামনে হালার মোকে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছে।
এসব কথা শুনতে ভাল লাগছিল না হামেদের। সে শুনতে চাচ্ছিল গা ছমছমে ভয়ের কথা। কায়দা করে সেদিকেই কথা ঘুরিয়ে নিল। ওই দাদা, মেন্দাবাড়ির বড় পুকইরডায় বলে শিকল আছে?
হ শিকল আছে ড্যাগও (ডেকচি। মেজবানি রান্নার তামার বড় হাঁড়ি) আছে।
দেকছে কেঐ?
হ কতজনে দেকছে। হাজামবাড়ির মজিদ একবার নাইতে নামছিল, সাঁতরাইতে সাঁতরাইতে জাহাঙ্গির কাকাগো বড়ঘর বরাবইর ভাঙ্গনের মিহি গেছে, হের পাও পঁাচাইয়া ধরছিল শিকলে। মজিদ জুয়ানমর্দ মানুষ দেইক্কা পানির নীচে দুই পাও দাপড়া দাপড়ি কইরা শিকল ছাড়াইয়া উটতে পারছিল। নাইলে ওইদিনঐ শিকলে হেরে পানির নীচে টাইন্না নিত। দুইদিন পর ভাইস্যা উটতো নাচ।
খাইছেরে।
হ। শিকলে সব সময় মানুষরে প্যাঁচ দিয়া ধরে। পাইনতে ডুবাইয়া মারে।
আর ড্যাগ?
ড্যাগে ভরা থাকে খালি কাঁচাটেকা।
কচ কী?
হ।
মাইনষে হেই টেকা নিতে পারে না?
ইচ্ছা করলে পারে।
কেমতে?
চাইলেঐ। তয় এর মইদ্যে একহান কথা আছে।
কী কথা?
একডেগ টেকার বিনিময়ে একজন মাইনষের জান দিতে অইবো।
শুনে হামেদ আকাশ থেকে পড়ল। আ?
হ। জাহাঙ্গির কাকার মায় একবার পাইছিল।
সত্যঐ?
তয় মিছানি?
ক না কেমতে পাইছিল?
নাদেরেরও ভালই লাগছে কথা বলতে। বেশ মগ্ন গলায় সে বলল, জাহাঙ্গির কাকার ছোডবইন সন্ধা (সন্ধ্যা) তহন পেড়ে। বাইষ্যাকাল। দাদি একা রাইতে সপনে দেহে তার ঘরের খাডালে বিরাট একহান ড্যাগ। মোখে একহান ঢাকনা। ঢাকনাডা ইট্টু ফাঁক অইয়া রইছে। হেই ফাঁক দিয়া দেহা যায় ভিতরে চকচক করতাছে কাঁচাটেকা। জাহাঙ্গির কাকার মায়, দাদি গেছে টেকা নিতে, লগে লগে ভিতরে থিকা আওজ অইলো, নিতে পারচ, বিনিময়ে আমারে একহান নাইরকল দেওন লাগবো। কথাডা হেয় বাড়ির ময়মুরব্বিগ কইলো। হুইন্না বেবাকতে কইলো, খবরদার রাজি অইয়ো না তুমি। এই নাইরকল হেই নাইরকল না, গাছের নাইরকল না। এই নাইরকল অর্থ পোলা। ড্যাগে তোমার একহান। পোলা নিতে চায়, বিনিময়ে তোমারে ওই টেকাডি দিবো। অহন তুমি কও কোনডা নিবা? দাদি কইল আমার টেকা লাগবো না। আমার সোনার চানরা বাইচ্চা থাউক।
তারবাদে?
তারবাদেও আরও দুইদিন ওই স্বপ্নডা দাদি দেকছে। ড্যাগে তারে কইছে টেকা নে, নাইরকল দে। স্বপ্নের মইদ্যেই দাদি কইছে, টেকা আমার লাগবো না। তুমি যাও গা। ড্যাগ তারবাদে পুকঐরে নাইম্মা গেছে।
দুইভাইই খানিক চুপ করে থাকে। কেউ কথা বলে না। সকাল ফুরিয়ে দুপুর ছুঁই ছুঁই তখন। রোদ তেজালো হয়েছে। হিজলের পাতায় একটুও হাওয়া নাই। এসময় হাজামবাড়ির দিকে চোখ গিয়েছে হামেদের, দেখে ছোট ভাইবোনদের নিয়ে পরি নেমে যাচ্ছে ভাঙনের দিকে। তাদের আগে আগে খালি গায়ে, উঁচু করে লুঙ্গি পরা আজিজ। দেখেই উত্তেজনা হল হামেদের। লাফিয়ে উঠে বলল, ওই দাদা, মা’র আহুজ পইড়া গেছে। ওই দেক বাবায় পরিগগা বাইত্তে লইয়া যাইতাছে।
নাদেরও দেখল তারপর উঠে দাঁড়াল। হ ঠিক কইছচ। ল আমরাও যাই।
সড়ক থেকে দৌড়ে চক বরাবর নেমে গেল দুই ভাই।
২.৪ গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়
কোনও কোনও গভীর রাতে আজকাল ঘুম ভেঙে যায় কুট্টির।
আগে কখনও এমন হত না। সারাদিন আর রাতের অনেকখানি সময় পর্যন্ত এতবড় বাড়ির সবকাজ, রান্ধন বাড়ন, নাওন ধোওন, বড়বুজানকে নিয়ে আন্নাতান্না (বিরক্তিকর কাজ অর্থে)। দিনভর পলকের আজার নাই। ফলে রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ করার পরপরই শরীরের ভিতর থেকে ঠেলে বেরুত ক্লান্তি। হাত-পা আর চলতে চাইত না, চোখ ভেঙে আসত দুনিয়ার ঘুমে। বড়বুজান দিনরাত শুয়ে আছে পালঙ্কের উপর, একটার পর আরেকটা তোশক ফেলা মোটা নরম বিছানায়। কুট্টি শোয় তাঁর মুখ বরাবর মেঝের পাটাতনে। নিজের পুরানা দুইখান ছেঁড়ামোটা কথা আর একখান মাথার তেল আর ঘুমের তালে মুখের কষ বেয়ে কখনও কখনও পড়া লোলের (লালা) গন্ধ মাখা বালিশ আছে। যে কাঁথা মেঝেতে বিছিয়ে শোয় বালিশ থাকে তার ভিতর প্যাঁচ দিয়ে রাখা। আর গায়ে দেওয়ার কথা থাকে আলাদা। বড়বুজানের পালঙ্কের তলায়ই থাকে জিনিসগুলি। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করেই, পালঙ্কের তলা থেকে কোনওরকমে কাঁথা বালিশ টেনে বের করে কুট্টি। একটানে কাঁথা মেলে দেয় মেঝেতে, বালিশ রাখে জায়গামতো। তারপর ঘরের উত্তর-দক্ষিণ দুইদিককার দরজার দিকে একবার তাকায়। দরজা বন্ধ আছে কি না দেখে। দক্ষিণের ঝুলবারান্দার দরজাটা সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ। সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর খুলে দেয়, দিনভর খোলা থাকে, সন্ধ্যার মুখে মুখে বন্ধ। একটা হাতলআলা চেয়ার আছে বারান্দায়। কোনও কোনওদিন বড়বুজানকে নিয়ে সেই চেয়ারে জোর করে বসিয়ে দেয় কুট্টি। শিশুর মতন দুইহাতে চেয়ারের দুইদিককার হাতল ধরে, পাকা রোয়াইল ফলের মতন খোলা। চোখে বারান্দা ছাড়িয়ে ভাঙনের দিকে নেমে যাওয়া ঝোঁপঝাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন বড়বুজান, ঝোঁপঝাড় ছাড়িয়ে কচুরি ভরতি পুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অনেকখানি জায়গা কচুরি পরিষ্কার করে ফাঁকা করে রেখেছে আলফু। শক্ত বাঁশের খুঁটি পুঁতে পুকুরের অনেকখানি জায়গা পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া কাঠের সিঁড়ি ফেলে ঘাটলা করে দিয়েছে। এই ঘাটলায় বসেই থোয়া পাকলা, নাওনষেধাওনের কাজ করে কুট্টি। আলফুও করে। সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটির দিকে চোখ তার। পরিষ্কার করা জায়গাটার তিনদিক থেকে কচুরি এসে যাতে দখল নিতে না পারে সেজন্য পানির ওপর তিনদিকে তিনটা লম্বা বাঁশ ফেলে কচুরি আগাবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
