আগে জায়গাটাতে খুব ঘাস ছিল। এখন ঘাসের বংশও নাই। শুধু মাটি, রুক্ষ সাদা মাটি। রাস্তার কারণে চেহারাটাই বদলে গেছে।
তবু এই বদল এখন আর চোখে লাগে না। অনেকদিন ধরে আগাচ্ছে রাস্তা, অনেকদিন ধরে একই দৃশ্য দেখছে দেশগ্রামের লোক। চোখ সয়ে গেছে তাদের। বদলটা টের পায় না। কারও কারও মনে হয় যেন এমনই ছিল জায়গাটা। আসলে কোনও বদল হয়নি।
হিজলতলায় দাঁড়িয়ে হামেদ বলল, ওই দাদা, মা’র আহুজ কি অহনতরি পড়ছে?
নাদের বলল, মনে অয় না।
তয় তো অহন বাইত যাওন যাইবো না।
না।
করবি কী?
কী করুম ক।
ল এহেনে বইয়া থাকি।
বইয়া কী করুম? বইয়া থাকতে ভাল্লাগবো?
লাগবো।
কেমতে?
তরে আমি কতডি কথা জিগামু। হেই কথার জব দিতে দিতে দেকবি দোফর অইয়া যাইবো। দোফরের মইদ্দে মা’র আহুজ পইড়া যাইবো। তহন বাইত যামুগা আমরা।
ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল নাদের। কী কথা জিগাবি?
হিজলতলার মাটিতে ইলাস্টিক লুজ হওয়া প্যান্ট নিয়ে বসে পড়ল হামেদ। বয়, কইতাছি।
নাদেরও বসল। ক।
পুবদিককার মাঠ ছাড়িয়ে, আমিন মুনশির বাড়ির লগের মাদ্রাসাঘর ছাড়িয়ে, সোজা পুবদিকে তালুকদার বাড়ির দক্ষিণ কোণে মাঠের মাঝখানে দাঁড়ানো বিশাল কড়ুই গাছটার দিকে তাকিয়ে হামেদ বলল, ওই গাছেও বলে একজন থাকে?
আচমকা এরকম একটা কথা! নাদের যেন বুঝতে পারল না। ভোররাতে আজ যেমন করে তার কথা বুঝতে পারেনি হামেদ এখন যেন তেমন করেই হামেদের কথা বুঝতে পারল না নাদের। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো বলল, কেডা থাকে ওই গাছে?
হামেদ হাসল। বোজচ নাই?
এবার নাদেরও হাসল। বুজছি।
তার সমন্দে তুই জানচ?
হ জানি।
তয় আমারে ক দাদা। এই হগল হুনতে আমার বহুত আমোদ লাগে।
এই ধরনের গল্প করতে নাদেরও খুব মজা পায়। নড়েচড়ে জুত করে বসল। কড়ুইগাছে যে থাকে হে কইলাম কনধনাইয়া না।
তয়?
হেয় অইলো মাউচ্ছা ভূত।
মাউচ্ছা ভূত আবার কী?
যেই ভূতে খালি মাছ খায়। খালপার নাইলে বড় পুকঐর পার, বিলের মইধ্যে যে বড় বড় ডেঙ্গা (দিঘি) থাকে হেই হগল ডেঙ্গার চাইরমিহি থাকে। তালুকদার বাড়ির খালে তো অনেক মাছ, এর লেইগা খালের ইট্টু দূরে কড়ুইগাছটায় থান লইছে হেয়।
বুজছি। একবার বলে মেন্দাবাড়ির এনামুল দাদারে ধরছিলো।
হ।
কুনসুম?
খাড়া দোফরে।
কচ কী?
হ।
দোফরেও হেরা মাইনষেরে ধরে?
হ ধরে। নিটাল দোফরে। শনিবার নাইলে মঙ্গলবার।
এনামুল দাদারে ধরছিলো কবে?
মঙ্গলবার দোফরে।
হেয় ওহেনে গেছেলো ক্যা?
আউজকার কথা না তো। ম্যালাদিন আগের কথা। হেয় তহন বহুত ছোড। আমার লাহান অইবো। আমিনল মামাগো লগে গোয়ালিমান্দ্রার হাডে গেছিল। বড় একহান গজার মাছ কিন্না আমিনল মামায় কইছে তুই বাইত্তে যা গা, আমি পরে আমুনে। গজার মাছের কানসার ভিতর কাতা (নারকেলের ছোবড়ার চিকন দড়ি) ভইরা, ফাঁসের লাহান কইরা মাছহান ঝুলাইয়া দিছে এনামুল দাদার হাতে। হেয় পোলাপান মানুষ, কিছু বোজে নাই। মাছ হাতে লইয়া মেলা দিছে। কড়ুইতলায় আইতে আইতে দোফর অইয়া গেছে। চাইরমিহির খেতখোলায় কোনও মানুষ নাই, খালি রইদ। এমুন সোমায় পয়লা একহান বাতাস উটলো কড়ইগাছে। তুফান আইলে গাছ যেমন লড়ে, অতবড় কড়ইগাছটা অমুন লড়তে লাগলো। আর বাতাসে পচা মাছের গন্ধ। এনামুল দাদায় পোলাপান মানুষ, হেয় তো কিছু বোজে নাই। আথকা গাছের মাথায় দেহে কালা কাকলাসের লাহান একজন বইয়া রইছে। ইয়া লাম্বা লাম্বা হাত-পাও, এত্ত বড় বড় চারি (নখ), নাকহান দেড়হাত লাম্বা, চকুগুনি বউন্না গোডার লাহান, বড় মাইনষের হাতের পাঞ্জার লাহান এহেকখান দাঁত মোখে। ক্যাতকুতির (বগলের) তলে আর শইল্লে খালি পশম, খালি পশম। গাছের উপরে থিকাঐ একহান হাত বাড়াইয়া দিল এনামুল দাদার মিহি। নাকি গলায় কইল, গজার মাছটা আমারে দিয়া যা। এনামুল দাদায় মাছ দিবো কী, ওই চেহারা দেইক্কা এমুন এক চিক্কইর দিছে, তারবাদে দিছে দৌড়। হাতের মাছ কই ছিট্টা পড়ছে কে কইবো। চিকইর পাড়তে পাড়তে, দৌড়াইতে দৌড়াইতে আইয়া পড়ছে আমিন মুনশির বাড়ির সামনে। মুনশিসাবে তহন নমজ পইড়া বাইর অইছে। বাড়ির সামনে দিয়া চিক্কইর পাড়তে পাড়তে এনামুল দাদারে দেইক্কা ডাক দিছে। কী হইছে রে এনামুল? এমুন করচ ক্যা? মুনশিসাবরে এনামুল দাদায় সব কইলো। হুইন্না মুনশিসাবে কইলো আমিনলের উচিত অয় নাই মঙ্গলবাইরা দিনে একলা একলা তরে। এই রাস্তা দিয়া পাড়ান। মামা-ভাইগনা একলগে থাকলে হেয় কোনও ক্ষতি করতে পারতো না। অহনও পারবো না। আমার লগে যহন তর দেহা অইয়া গেছে অহনও তর আর কোনও ক্ষতি অইবো না। আয় আমার কাছে আয়। মুনশিসাবের সামনে গেল এনামুল দাদায়, মুনশিসাবে দোয়া পইড়া তার মাথায় ফুঁ দিয়া দিল। যা অহন বাইত যা। আর কিছু অইবো না। এনামুল দাদায় বাইত্তে আইয়া পড়ল।
ঘটনা শুনে প্রথমে মুগ্ধ হয়ে থাকল হামেদ। তারপর বলল, ওই দাদা, গজার মাছটা তো হেয় রাইক্কাঐ দিল। তারবাদে আবার ক্ষতি কী অইবো? মুনশিসাবের কথাডা তো আমি বুজলাম না।
নাদের বিরক্ত হল। আরে এইডা অইলো অন্যরকম ক্ষতি। হেরে দেইক্কা যেই ডরানডা এনামুল দাদায় ডরাইছিল, ওই ডরে হেই দিন তার জ্বর আইতে। হেই জ্বর আর ভাল অইতো না। হেই জ্বরেঐ এনামুল দাদায় যাইতো।
