না তা অই নাই।
তয়?
তয় তোমারে আইজ একহান কথা কই চাচি। যতবার মা অই ততবারঐ আমার মনে হয়, এইবার পয়লা অইলাম।
কচ কী?
হ। আর একহান জিনিস আরচইজ্য লাগে। বেদনা ওডনের পর থিকা পোলাপান। অওনের আগ তরি এমুন বেদনা, মনে অয় মইরা যামু, আর বাঁচুম না। যেইনি পোলাপান অইয়া গেল, লগে লগে বেদনাডা বন্দ। কী শান্তি!
হ এইডা আল্লার কুদরত। তয় তুই যহন কইলিঐ, তরে তাইলে কই। আইল্লায় (মালশায়) লাকড়ির কয়লা লইয়া আগুন দিবি। কয়লার যে ধিকিধিকি আগুনডা অইবো হেই আগুনের তাপ লবি।
হ জানি তো। আইল্লাডা মাডিতে রাইক্কা এমুন কইরা খাড়ন লাগবো য্যান শাড়ির ফাঁক দিয়া তাপ উইট্টা যায় উপুর মিহি।
হ।
আমি সব সময় এইডা করি চাচি।
ইবারও করিচ।
আইচ্ছা।
একটু থেমে আলার মা বলল, আর দুয়েকহান কথা কমু তরে?
কও।
মনে কষ্ট লবি না তো?
না।
সাতহান পোলাপান অইছে, আর পোলাপান অওয়াইচ না।
এইডা কেমুন কথা কইলা চাচি? পোলাপান অওন কি আমগো হাতে? এইডা অইলো আল্লার হাতে।
না, তগো হাতে। তরা ইচ্ছা করলেঐ ঠেকাইতে পারচ। বানেছা একটু চুপ করে থেকে বলল, তোমার কথা আমি বুঝছি চাচি। অষইদ বিষইদের কথা কও তো। ওই হগল অষইদ খাইতে আমার ডর করে।
তর খাওনের কাম নাই। তর জামাইরে ক। বেড়াগো বেবস্থাও তো আছে।
হেইডাও আমি জানি।
তারপরই লাজুক হয়ে গেল বানেছা। খানিক আগে যার হাতে বাচ্চা হওয়াল তার মুখের দিকেই আর তাকাতে পারল না। মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল, ওই হগল আমার ভাল্লাগে না। আমি আরাম পাই না।
ঠিক আছে এইডাও মাইন্না লইলাম। তয় তুই একহান কাম কর, আজিজরে দিগলির হাসপাতালে যাইতে ক। ওহানকার ডাক্তারগো লগে কথা কইতে ক। বেডারা যাতে বাপ না অইতে পারে তার তো আরও বেবস্থা আছে।
এইডাও আমি জানি। তয় তোমগো পোলায় হেইডা করাইতে চায় না। তার বলে ডর। করে।
ওইডা ডরের কোনও কামঐ না। তয় এতকথা তরে আমি আইজ ক্যান কইলাম জানচ, পোলাপান জন্ম দেওয়া খুব সোজা। খাওয়াইয়া পরাইয়া বাঁচাইয়া রাখা বহুত কঠিন। আর যুদি ঠিক মতন খাওয়াইতে পরাইতে না পারচ এই পোলাপানেঐ তগো অভিশাপ দিব। গাইল দিবো।
বানেছা কথা বলল না। চিন্তিত হয়ে রইল।
আলার মা বলল, রিজিগ দিয়াঐ বেবাকতেরে আল্লায় দুনিয়ায় পাড়ায়। তারবাদেও আল্লায় কইছে তোমরা সীমা লঙ্ঘন কইরো না। নিজের ভালমন্দ নিজে বুইঝা চইলো।
আলার মা আর দাঁড়াল না, ঝাঁপ খুলে উঠানে নামল।
আজিজ তখনও একই ভঙ্গিতে বসে আছে বড়ঘরের ছেমায়। তার পিছনে দুয়ার খোলা ঘরের মেঝেতে দেখা যাচ্ছে গাওয়াল করার হাড়ি পাতিল কলস বদনার ভার। এখন আর হাতে বিড়ি নাই আজিজের। চোখে উদাসীনতা। আলার মা’কে দেখে ম্লান গলায় বলল, বুঝছি। মাইয়া অইছে।
আজিজের উপর রেগে আছে আলার মা। গম্ভীর গলায় বলল, হ। তয় অহন হেই গিরস্তের লাহান ক,
গাই বিয়াইলো দামড়ি বাছুড়,
বউ বিয়াইলো মাইয়া।
আজিজ মাথা নিচু করে বলল, আর শরম দিয়ো না চাচি। বহুত ভুল কইরা হালাইছি। তয় আমার দিকটাও চিন্তা কইরো। এতডি পোলাপান লইয়া আর পারি না চাচি।
শেষ কথাটা এমন কাতরগলায় বলল, আলার মা’র মনটা নরম হল। বলল, বুজছি। বাজান, তর কথা আমি বুজছি। তয় আবারও কই, পোলাপান না হওনের ব্যবস্থা কর।
করুম চাচি, ডরভয় বাদ দিয়া কইরা হালামু।
লুঙ্গির কোচড় থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করল আজিজ। আলার মা’র দিকে এগিয়ে দিল। নেও চাচি।
টাকাটা আলার মা নিল না। বলল, ইবার টেকা আমি নিমু না বাজান।
ক্যা? রাগ করছো?
না। এই পাঁচহান টেকা আমি তর এই মাইয়াডারে দিয়া গেলাম। মাইয়ার কোনও অযত্ন তুই করি না বাজান। তর লেইগাঐ দুইন্নাইতে আইছে ও। অর অযত্ন করলে আল্লায় বেজার অইবো। আর যেই ঘরে হুইয়া তর মায় চইলা গেছে হেই ঘরের মাডিতেঐ মাইয়াডা তর অইছে। আইজ থিকা তুই মনে করবি এই মাইয়াডা তর মাইয়া না, এই মাইয়াডা তর মা। এক চেহারায় চইলা গেছে যেই মা, আরেক চেহারায় ফিরত আইছে হেয়। মা’র অযত্ন। করিচ না।
আজিজের কানে এসব কথার কিছুই গেল না। পাঁচটা টাকা বাঁচাতে পেরে আনন্দে একেবারে ফেটে পড়ছে। চোখের ভিতর খুলে গেছে হিসাবনিকাশের অদৃশ্য খেরোখাতা। লাভের পাতায় যোগ হচ্ছে পাঁচটাকা।
বয়সি শরীর নিয়ে আলার মা তখন পশ্চিম দিককার নামার দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে।
.
জাহিদ খাঁ-র বাড়ি বরাবর পুকুর পারের হিজলগাছটার সামনে ছিল আলী আমজাদের কন্ট্রাক্টরি কাজের ছাপরাঘর। কাজ এগিয়ে যাওয়ার ফলে ঘরও এগিয়ে গেছে। এখন হযরতদের বাড়ি ছাড়িয়ে আরও অনেকখানি এগিয়ে ঘর। সেই ঘরে বসে আলী আমজাদ তদারক করে তার মাটিয়ালদের সর্দার হেকমতের আর ইয়ারদোস্তদের নিয়ে আড্ডা দেয়। সিগ্রেট বিড়ি চব্বিশঘণ্টাই চলছে, দিনদুপুরেও কখনও কখনও চলছে কেরু কোম্পানির মদ। সঙ্গে নিখিলের বোন ফুলমতির কষানো মুরগি, ঘিয়ে ভাজা পরোটা। ফলে ছাপরাঘরের আশপাশ সব সময়ই ম ম করছে নানা প্রকার গন্ধে আর আলী আমজাদ, আতাহার সুরুজ নিখিলদের হাসিঠাট্টা হইহল্লায়।
এদিকে হিজলতলা থেকে ছাপরাঘর উঠে যাওয়ার ফলে জায়গাটা ফাঁকা। শেষ ফাগুনের রোদেলা সকালবেলা আজ কেমন মনমরা হয়ে আছে জায়গাটা। আলার মা’কে নিজেদের বাড়ি আনবার পর, আলার মা ঢুকেছিল আহুজ ঘরে আর নাদের হামেদ ঢুকেছিল বড়ঘরে। জের থেকে মুড়ি আর টিনের পট থেকে খাজুরা মিঠাই বের করে পরি তখন ভাইবোনদের ভাগবাটোয়ারা করে দিচ্ছে। নাদের হামেদও নিয়েছিল তাদের ভাগ। তারপর গপাগপ মুড়ি মিঠাই খেয়ে, গেলাসভরতি পানি খেয়ে দুইভাই চলে এসেছে সড়কপারে। এদিক ওদিক অকারণে ঘোরাঘুরি করে শেষপর্যন্ত এসেছে হিজলতলায়।
