কাঁথার তলা থেকে হাত বাড়িয়ে মায়ের একটা হাত ধরল তছি। আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, মা মাগো, আমি ক্যান এমুন কামডা করলাম? আমি ক্যান বেডারে মাইরা হালাইলাম?
কান্নার ফাঁকে তছির মা’র মনে হল পাগল মেয়েটা তার আর পাগল নাই। মেয়েটা তার সুস্থ হয়ে গেছে। মনের ওপর মানুষ খুনের চাপে মন মাথা বদলে গেছে তার। এখন এই সুস্থ মেয়েটিকে দারোগা পুলিশের হাত থেকে কেমন করে বাঁচাবে সে। ফাঁসির দড়ি থেকে কেমন করে বাঁচাবে!
ভাঙনের দিক থেকে এই বাড়ির উঠানের দিকে উঠতে উঠতে আজিজ গাওয়ালের মেয়ে পরি তখন ছোটবোন জরিকে ডাকছিল। জরি রে, ওই জরি। কো তরা? কোনহানে?
এই শব্দে সামনে শত্রুর শব্দ পাওয়া কচ্ছপ যেমন করে মুখমাথা টেনে নেয় শক্ত খোলসের ভিতর ঠিক তেমন করে মুখমাথা কাঁথার তলায় লুকিয়ে ফেলল তছি। চোখ মুছে তছির মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে আল্লাহকে বলল, আল্লা গো আল্লা, আমার তছিরে তুমি বাঁচাইয়া রাইখো।
.
দুপুরের দিকে মেয়ে হল বানেছার।
মেয়ের মুখ দেখে খুশি সে হল কি হল না বোঝা গেল না। তবে নয়মাস দশদিন মেয়েটিকে পেটে করে বয়ে বেড়ানো আর আজ ভোররাত থেকে এই পর্যন্ত পাওয়া কষ্টের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার ফলে মুখে আরামদায়ক অবস্থা ফুটে উঠল। দেখে বাঁশের চোঁচ দিয়ে বাচ্চার নাড়ি কেটে সুতা পঁাচিয়ে গিঁটটু দিতে দিতে আলার মা বলল, মাইয়া দেইক্কা খুশি অইছচ?
বানেছা আরামের গলায় বলল, মাইয়া পোলা কোনওডা লইয়া আমার কোনও হায়আপশোস নাই। একটা অইলেই অইলো।
বাচ্চার নাভির কাজ শেষ করে, বহুদিনের অভিজ্ঞ হাতে বানেছার গর্ভ থেকে ফুল বের করে আনল আলার মা, গর্ভ একেবারেই পরিষ্কার হয়ে গেল বানেছার। বাচ্চাটা বানেছার কোলের কাছে শোয়াইয়া দিয়া যে পুরানা পাতলা কাঁথার উপর প্রসব করেছে বানেছা সেই কাঁথায় ফুল ইত্যাদি প্যাচিয়ে কথাটা একপাশে সরিয়ে রাখল।
প্রসব করাতে আসার সময় আলার মা’র সঙ্গে ছোট্ট একখান চটের ব্যাগ থাকে। সেই ব্যাগে নাড়িকাটার বাঁশের চেঁচ, নিজের জন্য ধোয়া একখান গামছা আর একটুকুরা বাংলা সাবান থাকে। আজ ঘরে ঢোকার আগে এক বালতি গরম পানি, একখান লোটা আর নয়তো বদনা এনে রাখে। কাজ শেষ করে মা এবং শিশুটিকে পরিষ্কার করে, নিজে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে গামছায় হাত মুছতে মুছতে কাজটি সার্থকভাবে শেষ করবার জন্য আল্লাহর কাছে শোকর গুজার করে।
আজও করল। হে আল্লাহ, তোমার রহমতের দুয়ার আমার লেইগা খুইল্লা দিছ দেইক্কাঐ কামডা আমি ছহিসালামতে করতে পারলাম। তোমার কাছে হাজার হাজার শুকুর। যে জন্মাইলো আর যে জন্ম দিলো, তাগো তুমি হায়াত দরাজ কইরো আল্লাহ।
বানেছার দিকে তাকাল আলার মা। তরে তো নতুন কইরা কওনের কিছু নাই। সাতহান পোলাপান অইলো। তুই তো জানচঐ সব। তারবাদেও কই। মাইয়ারে বুকের দুদ দিবি। চামিচে কইরা তালমিছরির পানি আর ইট্টু ইট্টু মধু দিবি। মধু আবার বেশি দিচ না। কোনও কোনও বাচ্চা মধু সইজ্জ করতে পারে না। পেট নামাইবো। আর হারিকেনের মাথায় নরম ত্যানা চাইরভাজ কইরা দিয়া হেই ত্যানা ইট্টু ইট্টু গরম অইলেঐ ত্যানাডা দিয়া বাচ্চার নাভি ছেইক্কা দিবি। তাইলে নাভি তাড়াতাড়ি হুগাইয়া যাইবো।
বানেছা বলল, বুকের দুদ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারুম না। তালমিছরি, মধু এই হগল পামু কই?
ক্যা আইজ্জারে ক মাওয়ার বাজারে গিয়া লইয়াহুক।
কাম নাই খরচের। পোলাপান আমার বুকের দুদ খাইয়াঐ বাঁচে।
তয় আর কী!
চটের ব্যাগ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল আলার মা। আমি তাইলে গেলাম।
আইচ্ছা।
ঘর থেকে বেরুবার আগে শিশুটির দিকে একবার তাকাল সে। লালচে ছোট্ট একটা মানুষ। মাথায় পাতলা কয়েকটা চুল। ফোলা ফোলা চোখ দুইটা পিটপিট করে খোলার চেষ্টা করছে। একটু একটু নাড়াবার চেষ্টা করছে হাত-পা। কী নিষ্পাপ অসাধারণ সুন্দর মুখ। এই মুখের মানুষটি একদিন বড় হবে, দুনিয়াদারির ঘোরপ্যাঁচের ভিতর নিজের অজান্তে জড়িয়ে যাবে। কত সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার মুখোমুখি হবে। কত রাত কত দিন, কত সময় অসময় পেরিয়ে যাবে। আর মেয়েমানুষ হয়ে জন্মাবার ফলে দুইটা পেটের যন্ত্রণা জীবনভর পোহাতে হবে। একপেট ক্ষুধার আরেক পেট নারীর। এক পেট খাদ্যের আরেক পেট মায়ের। খাদ্যের পেট ভরাবার জন্য প্রতিমুহূর্তে করে যেতে হবে এক ধরনের যুদ্ধ আর কিশোরী হয়ে ওঠার পর থেকে, যতদিন পর্যন্ত মা হওয়ার ক্ষমতা থাকবে ততদিন। পর্যন্ত মা হওয়ার পেটখানিকে আগলে রাখতে হবে লোভী আততায়ী পুরুষের হাত থেকে। স্বামীসংসার হওয়ার আগে তো কথাই নাই, হওয়ার পরও পরপুরুষগুলি কুত্তার মতো ছোঁক। ছোঁক করবে, কখন সুযোগ আসবে, কখন খাবলা দেওয়া যাবে আর নয়তো লম্বা জিভ বের করে আচমকা একটা চাটা। কখন একটুখানি নষ্ট করে দেওয়া যাবে মেয়েটির শরীর! এই। কুকুরগুলির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে যুদ্ধ অবিরাম করে যেতে হবে সেই যুদ্ধের নাম নারীজীবন।
আহা কেন যে মেয়ে হয়ে জন্মাল শিশুটি!
আলার মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ঝপ খুলে বেরুতে যাবে, বানেছা বলল, আমারে কিছু কইয়া গেলা না চাচি?
আলার মা ম্লান হাসল। তরে আর কী কমু? তুই কি নতুন মা অইলি নি?
