বাইত থিকা কী, কইতা ঘর থিকাঐ বাইর অয় না।
হ হেইডাও কইছি।
শুনে খুশি হল তছি। কইছো, সত্যঐ কইছো মা?
হ কইছি।
কেমতে কইছো কথাডা?
কইছি, মাথা পুরা খারাপ অইয়া গেছে দেইক্কা তছি গেছে তব্দ (স্তব্ধ) অইয়া। ঘর থিকা বাইর হয় না। হারাদিন হারারাইত কেঁতা মুড়া দিয়া হুইয়া থাকে।
ভাল করছো মা, ভাল করছে।
যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন গলায় বলল, আমি যে নাইড়া অইয়া গেছি হেইডা কও নাই তো?
না। হেইডা কই নাই।
না কইয়া বহুত ভাল করছো।
অনেকদিন পর পাগল মেয়েটার সঙ্গে এত কথা হচ্ছে। কথা বলতে এত ভাল লাগছে তছির মা’র! মনে হচ্ছে এতদিনকার চেনা মেয়েটি যেন তার কোথায় চলে গিয়েছিল, কোথা থেকে যেন আবার ফিরে এসেছে তার কোলে। অনেকদিন পর মা-মেয়ে দু’জন দুইজনকে ফিরে পেয়ে যেন মনের সব জানলা দুয়ার খুলে বসেছে। যেখানে যত কথা জমে আছে সব যেন বলতে শুরু করেছে। না বললেও হয় এমন কথাও।
যেমন এখন তছির কথার পিঠে বলল, ক্যা, না কইয়া ভাল করছি ক্যা?
কাঁথার তলায় ফিক করে একটু হাসল তছি। আমার শরম করতো।
কীয়ের শরম?
এমুন ডাঙ্গর মাইয়া নাইড়া অয়নি?
হ ঠিক কথা।
দুইজন মানুষই একটু চুপ করে থাকে। তারপর তছি বলল, ওমা, ওই তিনজন মানুষ ছাড়া আর কেঐ আমার কথা জিগায় নাই?
আর কে জিগাইবো?
গেরামে দিহি এত মানুষ, আর কেঐ জিগায় নাই আমার কথা?
কেমতে জিগাইবো, ক?
ক্যা জিগাইতে অসুবিদা কী?
আরে ছেমড়ি আমারে পাইবো কই যে জিগাইবো?
ক্যা তুমি কোনও বাইত্তে যাও না?
এই এক-দেড়মাসের মইদ্যে খালি দুইডা বাইত্তে গেছি। মেন্দাবাড়ি আর আজিজ গাওয়ালের বাড়ি। মেন্দাবাড়ি গিয়া দেলরার লগে দেহা অইলো। হেয় জিগাইলো। আর বানেছার আবার আহুজ পড়বো দেইক্কা অরে একদিন দেকতে গেছি, ওই বাইত্তে কুট্টির লগেও দেহা অইলো।
বুজছি। তয় অন্যকোনও বাইত্তে যাও নাই ক্যা?
তর লেইগা যাই নাই, আবার ক্যা?
ক্যা আমি কী করছি?
তুই না কইছচ আমি য্যান সব সময় তর শিথানে বইয়া তরে পাহারা দেই।
তছি নরম মায়াবী গলায় বলল, হ মা কইছি।
এর লেইগাঐত্তো কোনও মিহি আমি যাই না।
তয় ইচ্ছা করলে তুমি যাইতে পারতা।
কেমতে?
আমি তো রাইত্রে ঘুমাই না, ঘুমাই দিনে। আমার ঘুমের ফাঁকে তুমি যাইতা গা।
ওই ফাঁকেঐত্তো দুইডা বাইত্তে গেছি। তয় গিয়া আমার মন টিকে নাই মা।
ক্যা?
তর লেইগা মনডা ছটফট করছে।
ক্যা গো মা, ছটফট করছে ক্যা?
মনে অইছে মাইয়াডা আমার ভাঙ্গাঘরে কেঁতার তলে পলাই রইছে। শিথানে বইয়া অরে আমি পাহারা দেই। আমি না থাকলে দারগা পুলিশ আইয়া যুদি অরে ধইরা লইয়া যায়? যুদি অরে ফাঁসি দেয়।
গলা ধরে এল তছির মা’র, চোখ ভরে পানি এল। হাঁ করে একটা শ্বাস ফেলে চোখের পানি সামলাল সে।
এই ফাঁকে আলতো করে মুখ থেকে কথাটা একটু সরাল তছি। সরিয়ে অপলক চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আঁচলে চোখ মুছল তছির মা। মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। কী রে মা, এমতে চাইয়া রলি ক্যা?
তোমার মুকহান দেকতে ইচ্ছা করলো মা।
ক্যা?
তোমার কথা হুইন্না।
আমি আবার কী কইলাম?
কী যে কইলা হেইডা আমি বুজছি আর বোজছে আমার আল্লায়। মাগো, তোমার লেইগা আমার খুব মায়া লাগে মা। কেঁতার তলে হুইয়া হুইয়া তোমার কথা বহুত ভাবি আমি।
কী ভাবো গো মা? ভাবি পাগল না অইয়া আমি যুদি ভাল মাইয়া অইতাম তয় আমারে লইয়া এমুন কষ্ট তোমার অইতো না। এতদিনে অন্য মাইয়াগো লাহান বিয়াশাদি দিয়া হালাইতা আমার। জামাইবাড়ি যাইতাম গা আমি। আমারে লইয়া তোমার কোনও চিন্তা থাকতো না।
এতক্ষণ ধরে তছির সঙ্গে কথা বলতে বলতে এই প্রথম তছির মা’র মনে হল জন্মের পর থেকে এতটা বড় হওয়া পর্যন্ত তছি কখনও, কোনওদিন স্বাভাবিক মানুষের মতো এতকথা বলেনি। আজই প্রথম বলছে। তা হলে গোপনে কি তছির কোনও বদল হয়েছে? কাঁথার তলায় চুপচাপ শুয়ে থাকতে থাকতে, দিনকে রাত আর রাতকে দিন করার ফলে কি ভিতরে ভিতরে স্বাভাবিক হয়ে গেছে সে! পাগলামি চলে গেছে তার! নাকি মানুষ খুন করার। অপরাধে মনটাই বদলে গেছে! আল্লাহপাকের ইশারায়ই কি হয়েছে এসব!
কিন্তু এই নিয়ে তছিকে কিছু বলা ঠিক হবে না।
মা যখন এসব ভাবছে তছি তখনও অপলক চোখে মায়ের মুখটা দেখছে। দেখতে দেখতে বলল, কেঁতার তলে হুইয়া হুইয়া আমি আইজকাইল আল্লারে বহুত ডাক পাড়ি মা। কত কথা যে কই তারে।
তছির মা ধরা গলায় বলল, কী কথা কও মা?
বেবাক কথা মনে থাকে না। যেইডা আছে হেইডা কই।
আইচ্ছা কও।
আল্লার কাছে কই, আল্লা গো, এই জনমে তো পাগল কইরা রাকলা, মানুষ খুন করাইলা, আবার যুদি কোনওদিন আমারে দুইন্নাইতে পাডাও, তাইলে পাগল কইরা পাডাইয়ো না। অন্য মাইয়াগো লাহান ভাল কইরা পাডাইয়ো। আর মানুষ খুন করাইয়ো না। আর যেই মা’র ঘরে জন্ম দিছ, আল্লা গো, এই মা’র ঘরে আমারে তুমি জন্ম দিয়ো।
তছির কথা শুনতে শুনতে নিজের অজান্তে কখন কাঁদতে শুরু করেছে মা। কখন চোখের পানিতে গাল ভাসতে শুরু করেছে তার সে তা টেরই পায়নি।
কাঁদতে শুরু করেছে পাগল মেয়েটিও। কাঁদতে কাঁদতে বলল, এই জীবন আমার ভাল্লাগে না মা। আমার আর সইজ্জ অয় না। ক্যান যে বেডারে আমি মারলাম! তার থিকা বেডায় আমারে নষ্ট করতে চাইছিল করতো। আমার নাইলে পেটপোট অইয়া যাইতো, পোলাপান অইয়া যাইতো। হেই পোলাপান কুলে লইয়া হাটেবাজারে ভিক্কা কইরা খাইতাম আমি। কত পাগলনিরাঐত্তো এমতে বাঁইচ্চা থাকে। আমিও থাকতাম। আমি ক্যান এমুন কামডা করলাম?
