মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে এসব কথাই ভাবছিল তছির মা। চোখ ছলছল করছিল।
ঘরের ভিতরকার ছিটাফোঁটা আলোর দিকে তাকাতেও কষ্ট হচ্ছিল তছির। চোখ পিটপিট করছিল। এই অবস্থায় চাপা গলায় সে বলল, কী অইলো, কথা কওনা ক্যা মা? কী অইছে বাইত্তে? এত পোলাপান আইলো কইত থিকা?
মেয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তছির মা। আজিজ গাওয়ালের পোলাপান।
ক্যা অরা এত বিয়ানে আমগো বাইত্তে ক্যা?
আজিজের বউর আহুজ পড়তাছে।
হের লেইগা বেবাক পোলাপান এই বাইত্তে পাড়াইছে?
বেবাকটি না। নাদের আর হামেদরে দেকলাম না, পরিরে দেকলাম না। অরা মনে অয় অন্যবাইত্ত গেছে।
তছি আবার কাঁথার আড়ালে মুখ লুকাল। খানিক চুপচাপ থেকে বলল, পোলাপানের চিল্লাচিল্লিতে আমি জাইগা গেছি মা। অহন আর ঘুম আহে না।
হারারাইত ঘুমাইছচ। এতনি বেলা তরি ঘুমাইলি। অহন আবার ঘুম আইবো ক্যা? ঘুমেরও তো সীমা আছে।
কাঁথার তলা থেকে মুখ বের করল না তছি। ফিসফিসা গলায় বলল, আস্তে কথা কও মা, আস্তে কথা কও। কেঐ হুইন্না হালাইবো।
না হোনবো না। বাইত্তে কেঐ নাই। কে কইলো নাই? উই যে গাওয়ালের পোলাপানরা আছে।
অরা এইমিহি আইবো না। বারেকের লগে বড়ইতলায় সাচ্চারা (সাতচারা) খেলতাছে। আবদুলের বউ রান চড়াইছে, আবদুল গেছে রানাইদ্যা।
ক্যা, মোসলমানির কাম আছে?
হ। শীতের দিন গেছেগা। অহন তো আর লেপতোষকের কাম নাই। ফান মাসে মোসলমানির কাম অয়। এই একমাস কাম কইরা দু-তিন মাস চলবো। তারবাদে লাগবো ইরি ধান কাডন, তহন ধান কাটবো। বাইষ্যাকালে করবো মাছ ধরনের কাম। কোষা নাও লইয়া বিলে গিয়া দাঐন বাইবো। একলা মাইনষের ওপরে এতডি মাইনষের সংসার। মোখের মিহি পোলাডার আর চাওন যায় না। অন্য পোলাডি তো বাইত্তে রইলো না। মজিদ টঙ্গি, শফি কামরাঙ্গির চর। হাফিজদ্দি রানাইদ্য গিয়া বিয়া কইরা ঘরজামাই অইছে। বড় মাইয়াডার হৌর বাড়ি কুগইট্টা (কুকটিয়া), মাজারের দামলা। একজনেও মা। ভাইবইনের সমবাত লয় না। তারা আছে না মইরা গেছে, জানেও না। তরে আর আমারে লইয়া আবদুলের অইছে যনতরনা।
মা’র কথা শুনে তছি বিরক্ত হল। কিন্তু কাঁথার তলা থেকে মুখ বের করল না। চাপা রাগের গলায় বলল, এত প্যাচাইল পাড়তাছো ক্যা? এত প্যাচাইল পাড়তে তোমারে আমি কইছি?
তছির মা ভয় পেল। না কচ নাই মা।
তয়।
এমতেঐ কইয়া হালাইছি। বহুতদিন তর লগে কথা অয় না। এর লেইগা কথা কইতে ইচ্ছা করতাছে। তরে হালাইয়া কোনওহানে যাই না, তুই কেঁতার নীচে হুইয়া থাকচ আর আমি শিথানে বইয়া তরে পাহারা দেই।
হেইডা তো খালি দিনের বেলা।
হ। রাইত্তে চোরের লাহান উইট্টা তুই হাগতে মোততে যাচ, পুকঐরে গিয়া নাইয়া আহচ, ভাতপানি খাচ। আমি তহন বারেকরে লইয়া ঘুমাই। তর যহন দিন আমার তহন রাইত।
তছি কথা বলছিল কাঁথার তলা থেকেই, ধীর চাপা গলায়। যেন জোরে কথা বললেই শত্রুপক্ষ শুনে ফেলবে। যেন কাঁথার তলা থেকে মুখ বের করলেই শত্রুপক্ষ দেখে ফেলবে তাকে। সঙ্গে সঙ্গে লৌহজং থানায় গিয়ে দারোগা পুলিশকে খবর দিবে। ওই যে গলায় গামছার ফাঁস দিয়া খুন কইরা খালের পানিতে ফালাইয়া দেওয়া হইছিল রুস্তম রিকশাআলার লাশ, খুনটা কে করেছে জানেন! মেদিনীমণ্ডলের হাজামবাড়ির সংসার আলী হাজামের ছোটমাইয়া তছি পাগলিনি। সে এখন পলাইয়া আছে বাড়িতে। রোয়াইলতলার ছাপরা ঘরের মেঝেতে খড়নাড়ার বিছানার উপরে হোগলা পাইতা, তার উপর কাঁথা মুড়ি দিয়া পলাইয়া থাকে। দিনগুলি যার রাইত হইয়া গেছে, রাতগুলি হইছে দিন।
তারপর শয়ে শয়ে পুলিশ দারোগা আসবে এই বাড়িতে। চারদিক থেকে ঘেরাও করবে বাড়ি। এই হতদরিদ্র ঘরের করুণ বিষণ্ণ ঝাঁপ লাথথি দিয়ে ভেঙে কাঁথার তলা থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করবে তছি পাগলনিকে। প্রথমে থানা হাজত, তারপর মুনশিগঞ্জ জেল, তারপর কোনও এক ভোরবেলা ফাঁসি।
এসব ভেবে কাঁথার তলায় ভয়ে কুঁকড়ে গেল তছি। থরথর করে কাঁপতে লাগল। ভয় উৎকণ্ঠা মাঘ মাসের শীতের মতো চারদিক থেকে প্যাচিয়ে ধরতে লাগল তাকে।
এই অবস্থায় সাহসের আশায় কথা বলতে ইচ্ছা করে মানুষের। তছিরও করল। আগের তুলনায় গলা আরও নিচু করে সে বলল, মাগো, ওমা, তোমার লগে বহুত প্যাচাইল পাড়তে ইচ্ছা করতাছে আমার।
তছির মা উদাস গলায় বলল, পাড়।
তয় আমি কেতার তল থিকাই পাড়ম। মুক বাইর করুম না।
ক্যা?
আলো আমার চোক্কে সয় না। ডর করে।
কীয়ের ডর? আমি ছাড়া কে আছে এহেনে? কারে ডাচ তুই?
কারে যে ডরাই হেইডা কইতে পারি না। তয় তুমি কইলাম আমার কথার জব দিবা আস্তে আস্তে। ঘরের ছেমুক দিয়া গেলেও য্যান কেঐ না হোনে।
তছির মা আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আইচ্ছা।
ওমা, গেরামের মাইনষে আমার কথা তোমারে জিগায় না?
কী জিগাইবো?
তছি পাগলনিরে দিহি আইজকাইল আর দেহি না? আগে রোজঐত্তো এই বাইত্তে ওই বাইত্তে যাইতো, বড় রাস্তায় গিয়া খাড়ইয়া থাকতো, আথালি পাথালি কাম করতো, যেই মিহি ইচ্ছা দৌড় দিতো, আথকা কী অইলো পাগলনির? অরে দেহি কোনওহানে দেহি না? ওমা, জিগায় না এই হগল কথা?
দুই-একজনে জিগাইছে?
কেডা কেডা?
মোবাড়ির দেলরায়, আজিজ গাওয়ালের বউ বানেছা, মিয়াবাড়ির কুট্টি।
তুমি কী কইছো?
কইছি তছির শইল ভাল না। পাগলামিডা এত বাড়ছে, পাগলামির চোডে তছি এক্কেরে বোবা অইয়া গেছে। কেঐর লগে কথা কয় না। কেঐর লগে দেহা করে না। কোনওহানে যায় না। বাইত থিকাঐ বাইর অয় না।
