শুনে হতভম্ব হয়ে গেল আলার মা। কোনওরকমে বলল, কচ কী বাজান?
হ।
এইরকম কোনও পথও আমার জানা নাই বাজান। জীবনভর ধরণীর কাম কইরা যাইতাছি, এমুন কথা কোনওদিন হুনিও নাই। এমুন কোনও পথ আছে, জানিও না। এইবারের বাচ্চাডা অইয়া যাওনের পর তুই বাজান বউরে ডাক্তারের কাছে লইয়া যাই। ডাক্তাররা ব্যবস্থা কইরা দিবো।
বানেছা মইরা গেলেও ডাক্তারের কাছে যাইবো না।
তয় তুই যা।
আমি গিয়া কী করুম?
বেডারা যাতে বাপ অইতে না পারে হেই ব্যবস্থাও ডাক্তারগো কাছে আছে।
বুজছি। অরাপেশন (অপারেশন)। কী টেমি জানি কয় হেই অরাপেশনরে। না গো চাচি হেইডা আমি করাইতে পারুম না। আমার ডর করে।
তয় আর করনের কিছু নাই।
আলার মা উত্তরের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে, থাবা দিয়ে তার হাতটা ধরল আজিজ। তয় আর একহান কাম তুমি আমার কইরা দেও চাচি। এইবার যেইডা অইবো হেইডা যাতে না বাঁচে….।
আজিজের কথা শেষ হওয়ার আগেই রাগী বেঁজির মতন ফুঁসে উঠল আলার মা। কী, কী কইলি তুই? আমারে দিয়া তুই মানুষ খুন করাইতে চাচ? একমিনিটের আয়ু হোক নাইলে একশো বচ্ছরের হোক, মানুষ মানুষঐ। ওইরকম মানুষ খুন করতে কচ তুই আমারে? আমি মানুষরে জন্ম দিতে সাহাইয্য করি, মারতে না। আমি ধাত্রী, ঘাত্রী (ঘাতক অর্থে) না। তর বউর এই দশা না অইলে একটা মিনিটও তর বাইত্তে আমি থাকতাম না। প্রসব যন্ত্রণায় কষ্ট পাওয়া মাইনষেরে হালায় গেলে আল্লায় আমারে কোনওদিন মাপ করবো না। এর লেইগা তর বাচ্চাডা আমি হওয়াই দিয়া যাইতাছি। নাইলে থাকতাম না তর বাইত্তে। আরে তুই কেমুন মানুষ? কেমুন বেড়া? বউরে বুজাইতে পারচ না, নিজে ডরে বাপ অওনের খেমতা নষ্ট করতে চাচ না, চাচ অন্যেরে দিয়া মানুষ খুন করাইতে! ভিতরে ভিতরে তুই যে এত বদ এইডা কোনওদিন বুজি নাই আইজ্জা। তারবাদেও তরে যহন কথা দিছি এই হগল কথা। আমি কেঐরে কমু না। মনের মইদ্যে চাইপ্পা রাখুম।
আলার মা আর দাঁড়াল না। ঢেঁকিঘরে গিয়ে ঢুকল।
আজিজ তখন পুরানা গাছের মতো স্থির। মাটির দিকে তাকিয়ে নিথর হয়ে আছে। চোখের ভিতর এখন আর হিসাবের খেরোখাতাটা খুলল না তার। কাঁথার তলা থেকে কচ্ছপের মতন নিঃশব্দে মাথা বের করল তছি। মুখের কাছে বসা মা’কে ফিসফিসা গলায় বলল, বিয়ানবেলা বাইত্তে এত চিল্লাচিল্লি কীয়ের? এত পোলাপান আইলো কইত থিকা?
তছির মাথায় কদমফুলে প্রথম রেণু আসার মতো বিনবিন চুল। দিনরাত কাঁথার তলায় শুয়ে থাকার ফলে শ্যামলা মুখে চাপাপড়া ঘাসের রং ধরেছে। কথাবার্তা মানুষের সঙ্গে বলা হয় না বলে গলার স্বর ভারী আর অচেনা।
রোয়াইলতলার এই ছাপরাঘর একেবারেই ভাঙাচোরা। মাথার উপর টিনের চাল আছে। ঠিকই কিন্তু বৃষ্টিবাদলায় পানি চুয়ায় (পড়া অর্থে) নানান জায়গা দিয়ে। আর চারদিকের বেড়া, ঝাঁপ ওইসব টিকে আছে কোনওরকমে। বাঁশের বেড়ার চটিগুলির এমন অবস্থা, খলফাগুলির এমন অবস্থা, ছোট্ট পোলাপানের হাত লাগলেও হরমাইলের মতো পটপট করে ভেঙে যাবে। ফাঁকফোকরের অন্ত নাই বেড়াগুলিতে। ফলে সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, বাইরে আলো ফুটবার সঙ্গে সঙ্গেই বেড়ার ফাঁকফোকর আর টিনের চালের ছেদা দিয়ে। আলোটা সরাসরি ঘরেও ঢোকে। বাইর ঘর একসঙ্গেই আলোকিত হয়।
এখন অনেকখানি বেলা হয়েছে। বাইরে খা খা করছে রোদ। সেই রোদের অনেকখানিই নানান কায়দায় ঢুকেছে ঘরের ভিতর। অনেকখানিই আলোকিত করেছে ঘর। এই আলোয় বহুদিন পর যেন পাগল মেয়েটির মুখ দেখতে পেল তছির মা। কিন্তু মেয়েটিকে যেন চিনতে পারল না। এই মেয়েটি যেন তার সেই পাগল মেয়েটি না। যখন তখন মুখ খিঁচিয়ে ওঠা, রেগে গেলে চড় থাবড় কিল ঘুসিতে নাস্তানাবুদ করা, মুখে যা আসে তাই বলে বকাবাজি, যখন যেখানে ইচ্ছা চলে যাওয়া, মাথাভরতি উকুন, যখন তখন ঘচর ঘচর করে মাথা চুলকানো, আবার মায়ের ফাঁদে আটকা পড়া ভাইরবেটা বারেককে গভীর রাতে গিয়ে চুরি। করে এনে দাদির বুকে শুইয়ে দেওয়া, আজকের এই মেয়ে যেন সেই মেয়ে নয়। এ যেন অন্যমেয়ে। অচেনা মেয়ে।
আহা রে, কী জীবন কী হয়ে গেল মেয়েটির! তছি পাগলনির কোন পাপের শাস্তি হিসাবে রুস্তম রিকশাআলাকে এই গ্রামে পাঠিয়েছিলেন আল্লাহপাক। শ্রীনগরের ওদিকে এত রিকশাআলা থাকতে এনামুলই বা কেন শুধু রুস্তমকেই বেছে নিয়েছিল! দশটা টাকাই বা কেন দিয়েছিল তছিকে!
আর রুস্তম!
মানুষ হয়ে রুস্তমের ভিতরই বা কেন জেগে উঠেছিল এক কনধনাইয়া! যার শরীর ভরতি শুধুই চোখ। সেই চোখ দিয়ে যে শুধু দেখেছিল এক যুবতীর লোভনীয় অঙ্গ। মানুষের মতো চোখ দিয়ে সে কেন দেখেনি যুবতী হলেও মেয়েটি সুস্থ স্বাভাবিক না। জন্ম থেকে পাগল। তছির আচরণে শুরুতেই তো তার তা বুঝে যাওয়া উচিত ছিল।
নাকি সাত আশমানের উপরে বসা মহান আল্লাহপাক রুস্তমের মওত লিখেছিলেন এইভাবেই। সে নিজেই নিজের মওত রিকশায় বসিয়ে, মুরুলিভাজা খাওয়াবার লোভ দেখিয়ে মেদিনীমণ্ডল থেকে রিকশায় প্যাডেল মেরে নিয়ে গিয়েছিল শ্রীনগরের ওদিককার খালপারের সেই নির্জন ছাড়াবাড়িতে। আল্লাহর ইশারায়ই তছি নিয়েছিল আজরাইলের ভূমিকা।
যদি তাই হয়ে থাকে, তা হলে আল্লাহ কেন এইভাবে কষ্ট দিচ্ছেন তার পাগল মেয়েটিকে! কেন তার পাগল স্বাধীন উদ্দাম জীবন এভাবে নষ্ট করে দিলেন? কেন মেয়েটিকে বন্দি করলেন হতদরিদ্র ছাপরাঘরের মাটির বিছানায়, তালি পড়ে পড়ে পাথরের মতন ভারী হয়ে ওঠা কাঁথার তলায়! রাত গেল যার দিন হয়ে, আর দিন হয়ে গেল রাত। মেয়ের সঙ্গে তাল দিতে গিয়ে সহজ সরল সাদামাটা জীবন বদলে গেল দুঃখিনী মায়ের।
