ক্যা, বাইরে তর কোন নাঙ্গ আছে?
আলার মা ফোকলা মুখে হাসল। এমুন করিচ না মা। আমি আইতাছি।
আর কোনওদিকে না তাকিয়ে ঘরের ঝপ সরিয়ে বেরিয়ে এল। বানেছা তখন কোরবানির গোরুর অর্ধেক গলাকাটা হওয়ার পর কোনও কোনও গোরু যেমন জান্তব শব্দ করে, তেমন করছে।
এদিকে আলার মা’কে বেরিয়ে আসতে দেখেই দিশাহারা ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়েছে আজিজ। কী অইলো চাচি? তুমি দিহি বাইর অইয়া আইলা?
আলার মা হাসল। না অন্য কিছু না। আহুজ পড়তে দেরি অইবো।
ও আইচ্ছা।
আবার আগের জায়গায় বসল আজিজ। দেরি কি বেশি অইবো?
মনে অয়।
একটু থেমে বলল, আজিজ, মুড়ি মিডাই কিছু আছেনি ঘরে?
হ চাচি আছে।
ডালায় কইরা আমারে ইট্টু দে বাজান। বেইল তো অনেকহানি অইছে। খিদা লাগছে আমার।
দিতাছি, দিতাছি।
বলে ব্যস্তভঙ্গিতে ঘরে ঢুকল আজিজ। বেতের ছোট ডালায় একডালা মুড়ি আর ছোট্ট একখান খেজুড়ি গুড়ের অর্ধেকটা এনে আলার মা’কে দিল। অ্যালুমিনিয়ামের গেলাসে করে এক গেলাস পানিও এনে দিল।
বড়ঘরের ওটায় নিজেই পিঁড়ি এনে বসেছে আলার মা। বসে ফোকলা মুখে গুড়মুড়ি খেতে লাগল। বানেছা তখনও সমানে কঁকাকঁকি করছে। আলার মা আজিজ কেউ তা পাত্তা দিচ্ছে না।
উঠানে বেশ রোদ। চারদিক খা খা করছে রোদে। আস্তে ধীরে তেতে উঠছে গ্রাম গেরস্তের উঠান পালান, ঘরবাড়ি। বাড়ির নামার দিককার আমগাছটার ডালে বসে হাঁ করে আছে একটা দাঁড়কাক। গরম বেশি পড়লে ক্লান্তিতে এমন ঠোঁট ফাঁক করে রাখে দাঁড়কাকগুলি।
এই সকালেই কি কাকের হাঁ করার মতন গরম পড়ে গেল? এখনও তো চোত বৈশাখ মাস এল না! এখনই এই! চোত বৈশাখে তা হলে কেমন গরম পড়বে এবার!
হাঁ করা দাঁড়কাকের দিকে তাকিয়ে আলার মা বলল, ইবার মনে হয় গরম বেশি পড়ব রে আজিজ।
আজিজ বলল, মনে অয়।
তর খেতে ধান অইছে কেমুন?
ইরি তো, মন্দ অয় নাই।
বর্গা দিছস কারে?
আর কারে, আরফাইন্নারে। তোমাগো খেতে অইছে কেমুন?
তোতা নিজে বোনে তো, ধানডা খুব ভাল অয়।
আমিও যুদি নিজে চুইতে (চষতে) পারতাম তাইলে আরও ভাল চালাইতে পারতাম সংসার।
একমুঠ মুড়ি মুখে দিয়ে আলার মা বলল, এমুন গলা হুগাইস না বাজান। আল্লার কাছে শুকুর কর। অহনও আল্লায় তরে ভালঐ রাকছে। গাওয়াল কইরা ভাল রুজি করচ, খেতের ধান আছে।
তারবাদেও সংসার ভাল চালাইতে পারি না।
কচ কী?
হ। কেমতে চালামু কও? এতডি পোলাপান!
শুনে আলার মা বিরক্ত হল। তয় পোলাপান এত হওয়াচ ক্যা?
কী করুম কও? পোলাপান হওয়ান না হওয়ান কি আমার হাতে?
তয় কার হাতে?
আল্লার হাতে।
এই হগল কথা কইচ না। এইডি আগিলা দিনের মাইনষের লাহান কথা। আইজকাল কত অষইদ-বিষইদ বাইর অইছে, মাইয়াগো অষইদ, বেডাগো জিনিস।
আজিজ লাজুক গলায় বলল, হ, ওই হগল আমি জানি।
তয়?
সম্পর্কে তুমি হও আমার চাচি, এই হগল কথা কেমতে কই তোমারে? তয় ইট্টুহানি খালি কই, আমি পারি না তোমাগো বউর লেইগা।
কী?
হ। আমি যা চাই হেয় তা চায় না।
বউ খালি পোলাপান চায়?
তাও না।
তয়?
কথাডা যে তোমারে কেমতে কই! অষইদ বিষইদ কোনও কিছু তোমাগো বউ মানতে চায় না। হের বলে ভাল্লাগে না।
মুড়ি শেষ করে ডালাটা নামিয়ে রাখল আলার মা। আমি তর কথা বুজছি। তয় বউডার এই দশার লেইগা তুইই দায়ী।
কেমতে?
তুই মেউন্না পোলা। বউডারে শাসন করতে পারচ নাই।
কেমতে শাসন করুম?
এই শাসন কেঐ কাঐরে হিগাইতে পারে না। এই লইয়া সাতহান পোলাপান অইবো তর। তর আর তর বউর অহনও যা বয়স এমতে চললে পোনরো-ষোলডা পোলাপান অইয়া যাইবো। বউরে এইডা বুজা। নাইলে না খাইয়া মরবি।
বানেছার কাতরানো তখন আরও বেড়েছে। কাতরানোর শব্দে আলার মা বুঝতে পারছে সময় ঘনিয়ে আসছে। উত্তরের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে, আজিজ উঠে দাঁড়াল, খাড়ও চাচি।
আলার মা দাঁড়াল। কী?
তোমারে একহান কথা কইতে চাই।
ক।
তয় কথাডা গোপন। তুমি আর আমি ছাড়া কেঐ জানবো না।
আইচ্ছা ক।
তার আগে তুমি আমারে কথা দেও, তুমি আর আমি ছাড়া এইডা কেঐ জানবো না।
আইচ্ছা।
আজিজ আলার মা’র গা ঘেঁষে দাঁড়াল। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, চাচি, বানেছা তো আমার কথা হোনে না। হোনলে বছর বছর পোলাপান অইতো না অর। তয় এই যে পোলাপান খালি অইতেই আছে, খাওনের মুখ খালি বাড়তাছে, আমি তো কুলাইতে পারি না চাচি। যদি এমুন কইরা পোলাপান খালি অইতেই থাকে তয় তো কয়দিন পরে ভাত জোটব না আমার।
ওদিকে বানেছা কাতরাচ্ছে এদিকে কথার সঙ্গে লেজ জুড়ে দিচ্ছে আজিজ, কথা যেন শেষই হয় না। আল্লায়ই জানে ওদিকে বানেছার বাচ্চা গর্ভ থেকে মাথা বের করে ফেলল কি না।
আলার মা বিরক্ত হল। অস্থির গলায় বলল, তাড়াতাড়ি ক ছেমড়া। বউর দশা ভাল না।
তবু যেন কথার লেজ গুটাতেই পারে না আজিজ। বলল, তুমি আমারে ইট্টু সাহাইয্য কর চাচি।
কী সাহাইয্য ক।
পোলাপান হওনের সময় বলে এমুন কোনও কোনও ব্যবস্থা আছে যা করলে পোলাপান আর কোনওদিন অয় না। ওইরকম একহান ব্যবস্থা তুমি কইরা দেও।
আলার মা বিনীত গলায় বলল, ওইরকম কোনও ব্যবস্থা আমি জানি না বাজান। ওই হগল অইলো ডাক্তারগো কাম। ডাক্তাররা পারে। আমি পারি না।
অনেক ধরণীরাও বলে পারে?
কইতে পারি না। তয় আমার মনে অয় না।
আর নাইলে অন্য একহান কাম করো।
কী কাম।
এমুন একহান ব্যবস্থা আইজ বানেছার ভিতরে কইরা দেও, বচ্ছর বচ্ছর পোলাপান অর হোক, তয় অয় য্যান মরা। জেতা পোলাপান য্যান আর না অয়।
