কুট্টি আবার হাসল। এইডাও তুই বড় অইলে বুজবি।
পরি এবার কুট্টির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, মাইয়ারা ডাঙ্গর অইলে বিয়া ছাড়াও কি তাগো পোলাপান অয়?
কুট্টি থতমত খেল। তারপরই নিজেকে সামলাল। তুই অহন বাইত্তে যা পরি। দেকগা তর ভাইবইন অইলো নি? তুই ইট্টু বড় হ, এই হগল কথার বেবাক জব তরে আমি দিমু।
পরি উঠে দাঁড়াল। যাইতাছি। তয় নিজেগো বাইত্তে যামু না। যামু হাজামবাড়ি। নিজেগো বাইত্তে যাইতে আমার অহন ভাল্লাগবো না।
ক্যা?
অহনতরি যুদি আহুজ না পইড়া থাকে তয় মায় তো চিল্লাচিল্লি দাপড়া দাপড়ি করবো। হেইডা আমি সইজ্জ করতে পারুম না। মা’র আহুজ পড়নের পর বাবায় গিয়া আমগো। হাজামবাড়ি থিকা ডাইক্কা আনবো।
পরি চলে যাওয়ার পর আশ্চর্য এক অনুভূতি হতে লাগল কুট্টির। মনে হল তার শরীরের ভিতর, গর্ভের অন্ধকারে যেন অঙ্কুরিত হচ্ছে এক মানব শিশু। আস্তে ধীরে যেন বড় হচ্ছে সে। পৃথিবীর আলো হাওয়ায় যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু শরীরে কুট্টির কোনও ব্যথা বেদনা নাই। আছে অপরিসীম এক রোমাঞ্চ, আছে অপরিসীম এক উত্তেজনা। গভীর এক ভাললাগা।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন মানুষের তাগড়া জোয়ান কালোপানা শরীর ভেসে উঠল কুট্টির চোখে। মাথাভরতি কদমছাট চুল তার, পাথরের মতো নির্বিকার মুখ। সেই নির্বিকার মুখেই যেন লুকিয়ে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পুরুষের সৌন্দর্য। চোখ তার ভাটার মতো। পলক খুবই কম পড়ে চোখে, তবু সেই চোখেই যেন লুকিয়ে আছে দুনিয়ার সব মায়া।
কেন যে কুট্টি তারপর মনে মনে বলল,
কুট্টি লো কুট্টি
তরে দিলাম ছুট্টি!
.
বড়ঘরের ছেমায় বসে বিড়ি টানছে আজিজ।
উঠানের উত্তর কোনার চেঁকিঘরে শুয়ে প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে বানেছা। বেলা অনেকখানি হয়েছে। আলার মাও এসেছে অনেকক্ষণ কিন্তু এখনও ভূমিষ্ঠ হয়নি সন্তান। কখন হবে আল্লাহ মালুম। কতক্ষণ ব্যথায় কাতরাবে বানেছা, আল্লাহ মালুম।
আজিজ শুনতে পাচ্ছিল বেশ শব্দ করেই বানেছাকে থেকে থেকে বুঝ দিচ্ছে আলার মা। এতো চিল্লাইস না ছেমড়ি। আর ইট্র সইজ্জ কর। এইবার কি তর পয়লা আহুজ পড়তাছে যে এমুন করতাছস?
বেদনা ওঠার পর প্রতিবারই মাথায় বিকার উঠে যায় বানেছার। বাচ্চা যত তলপেটের তলার দিকে নামে বিকারটা ততই ওঠে মাথার দিকে। তখন যা মনে হয় বলে ফেলে। বাছবিচার করে না কাকে কী বলছে। দুই-একবার তো আজিজের সঙ্গে সহবাস নিয়েও এমন আকথা কুকথা বলেছে শুনে কানে আঙুল দিতে হয়েছে আলার মা’র। ওই অবস্থায়ও ছনুবুড়ি সহ্য করতে পারেনি সেসব কথা। ছ্যা ছ্যা করে উঠেছে। ইস, পোলাপান য্যান আর কেঐর অয় না, পোলাপান য্যান অর খালি একলাঐ অইতাছে। এত যহন কষ্ট তয় বচ্ছর বচ্ছর হওয়ায় ক্যা? জামাইর লগে হোয়নের সময় মনে থাকে না।
একদিকে বউর কথা আরেক দিকে মায়ের, আজিজ পড়ে যায় মাঝখানে। সে আর কী করে, যেন কিছুই শুনছে না এমন ভঙ্গিতে উদাস হয়ে বিড়ি টানতে থাকে। কখনও কখনও ভার থেকে অকারণেই নামায় গাওয়ালের জিনিসপত্র, অকারণেই ঝাড়পোছ করে, আবার সাজায় ভার। কখনও পোলাপান নিয়ে নেমে যায় বাড়ির ভাঙনের দিকে। তাদের সঙ্গে গল্পগুজব করে। আসলে বানেছার চিৎকার আকথা কুকথা থেকে সরিয়ে রাখতে চায় নিজেকে পোলাপানকে।
এবার বানেছা নিজেই বেশ একটা বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। আহুজ ঘরে ঢোকার আগেই পরিকে বলে গেছে সবাইকে নিয়ে মুড়ি মিঠাই খেয়ে যেন হাজামবাড়ি চলে যায়। অর্থাৎ পোলাপান বড় হয়েছে, এই অবস্থায় মায়ের আহুজ পড়ার সময়কার চিৎকার চেঁচামেচি যেন তাদের কানে না যায়।
ব্যাপারটা খুবই ভাল লেগেছে আজিজের। যাক বানেছা তা হলে মানুষ হয়ে উঠছে। দিনে দিনে বুদ্ধি বাড়ছে তার।
এখন আচমকা আলার মা’র কথা শুনে ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতেও এমন একখান। গাল আলার মা’কে সে দিল, শুনে বিড়িতে টান দিতে ভুলে গেল আজিজ। বানেছাকে নিয়ে খানিক আগের ধারণা তছনছ হয়ে গেল। মনে মনে খুবই হায়আপশোস করল সে। ইস এইরকম একহান মাগিরে বিয়া করছি আমি! এইরকম একহান মাগির লগে হুইয়া বচ্ছর বচ্ছর পোলাপান হওয়াই। পুরুষাঙ্গ আমার বেলেড দিয়া কাইট্টা হালান উচিত।
তবে বানেছার ওই অশ্লীল গালাগাল গায়ে মাখল না আলার মা। সে এসবে অভ্যস্ত। দীর্ঘকাল ধরে মানুষের বাচ্চা হওয়াতে হওয়াতে বুঝে গেছে জন্ম দেওয়ার সময়কার কষ্টের কোনও তুলনা এই পৃথিবীতে নাই। জন্ম যে দেয়, কষ্টটা শুধু সেই বোঝে। আলার মা নিজেও তো চারবার মা হয়েছে। সুতরাং বানেছার ওপর একটুও রাগল না সে। বানেছার খোলা তলপেটে মায়াবী ভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে শিশুকে আদর করার মতো গলায় বলল, এমুন কইরো না মা। ইট্টু সইজ্জ করো।
তারপর উঠে দাঁড়াল।
বানেছার চোখ তখন পাকা আমরুজের মতন ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। দৃষ্টি অচেনা। মুখে ভয়ানক যন্ত্রণার ছাপ। গ্রাম সম্পর্কে আলার মা তার চাচি শাশুড়ি। এমনিতে খুবই সয়সম্মান। করে তার সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু এখন বানেছা আর বানেছা নাই। এখন সে অন্য মানুষ। আলার মা’কে উঠতে দেখেই বিকারগ্রস্ত খেকুরে গলায় বলল, ওই মাগি, কই যাচ তুই? আমারে এই অবস্থায় হালাইয়া কই যাচ তুই?
কথাগুলি আলার মা গায়েই মাখল না। নির্বিকার গলায় বলল, ইট্টু বাইরে থিকা আহি মা?
