আলফু দোনোমোনো গলায় বলল, বিয়ানে তো আমি খাইছি।
খাইছেন যে হেইডা তো আমি জানিঐ। আমিঐত্তো আপনের খাওনদাওন দেই।
হ। আইজও তুমিই দিলা।
কুট্টি আবার একপলক আলফুর দিকে তাকাল। পাউরুটির কাটা টুকরোগুলি ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, পান্তাভাত পেড়ে থাকে কতক্ষুন? বহেন।
হাতের কাছে রাখা একখান পিড়ি এগিয়ে দিল আলফুকে।
কোমর থেকে গামছা খুলে তেলতেলে মুখটা গলাটা মুছল আলফু। গামছাটা ডানদিককার কাঁধে ফেলে রান্নাঘরের ছেমায় বসল। পরিকে বলল, তুই আইছচ কুনসুম?
পরি বলল, অনেকক্ষুন।
যে মগটায় বেশি চা সেই মগ আর চার টুকরা পাউরুটি আলফুকে দিল কুট্টি। নেন। চায়ে ভিজাইয়া ভিজাইয়া খান। বহুত সাদ লাগব।
নিঃশব্দে জিনিসগুলি নিল আলফু। খেতে শুরু করল।
পরির মগটা পরিকে দিল কুট্টি, নিজেরটা নিল। পরিকে দিল তিন টুকরা রুটি, নিজে নিল তিন টুকরা, চায়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খেতে শুরু করল।
খেতে খেতে আলফু তখন অন্য একটা কাজ করছিল। নিজে যতবার মুখে দিচ্ছিল রুটি ততবারই রুটির পোড়া দিকটার কিছু না কিছু ছুঁড়ে দিচ্ছিল উঠানের কাক শালিকের দিকে, বিড়ালদের দিকে। মনোহর পাউরুটি মুখের কাছে পেয়ে ছানাদের দুধ দেওয়া ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছে মা বিড়াল, টুকটাক করে খাচ্ছে পাউরুটি। তার দেখাদেখি ছানাগুলিও ছুটাছুটি করছে পাউরুটির লোভে। বিড়ালের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া পাউরুটি ঠোঁটে তুলতে তক্কে তক্কে থাকছে কাকগুলি, কাকেরটা ছিনিয়ে নিতে ছুটছে বেড়ালেরা, শালিক পাখিটা নিরীহ ধরনের বলে এই টানাহ্যাঁচড়ার ভিতর ঢুকতে পারছে না। দূরে দাঁড়িয়ে অসহায়, ক্ষুধার্ত চোখে কাণ্ডটা দেখছে।
শালিক পাখিটার কথা ভেবে তার মুখের কাছে ছোট্ট একটা রুটির টুকরা ছুঁড়ে দিল আলফু। এই দেখে পরি খুব মজা পেল। হি হি করে হেসে বলল, আলফু কাকায় দিহি পোলাপানের লাহান করতাছে।
চায়ে বড় করে চুমুক দিয়ে আলফু বলল, পোলাপানের লাহান করি না মা। আমাগো খিদা আছে, অগোও তো আছে। আল্লার দুনিয়ার বেবাক জীবেরই পেট আছে, খিদা আছে। আমরা তিনজন মানুষ খাইতাছি আর অরা পেডের খিদা লইয়া চাইয়া রইছে এইডা আমার সইজ্জ অয় না মা। এর লেইগা এমুন করতাছি।
পরি বোধহয় আলফুর কথা বুঝতে পারল না। কুট্টি পারল। মনে পড়ল সেই দিনটির কথা। নিজের ভাগের খাবার নিয়ে দুপুরবেলা চালতাতলায় চলে গিয়েছিল আলফু। নিজে আধপেটা খেয়ে মাকুন্দা কাশেমকে খাইয়েছিল। সেদিন মানুষটার মনের অনেকখানিই যেন চিনে ফেলেছিল কুট্টি। আজ চিনল আরও অনেকখানি। চিনে চা পাউরুটি খাওয়ার কথা ভুলে অপলক চোখে আলফুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরি খেয়াল করল না ব্যাপারটা, আলফু করল। একপলক কুট্টির মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে চা পাউরুটি খাওয়া শেষ করল। তারপর নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল, চালতাতলার দিকে চলে গেল।
কুট্টি তখনও তেমন করে তাকিয়ে আছে। তার চোখের সামনে পশ্চিম উত্তরভিটির ঘর দুইখানার মাঝখানকার চিরলপথে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষ। পিছন থেকে তার কালোপানা কোমর পিঠ আর শক্তপোক্ত ঘাড় দেখা যাচ্ছে। এই দেখে শরীরের খুব ভিতরে আজ সকালে আবার অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ হল কুট্টির, অদ্ভুত এক কাঁপন লাগল। নিজের অজান্তেই কুট্টি কেমন লাজুক হয়ে গেল।
চা পাউরুটি শেষ করে পরির মুখে তখন ভারী আরামদায়ক একটা লাবণ্য। হাসিমুখে কুট্টির দিকে তাকিয়েছে। তাকিয়ে খেয়াল করল কুট্টি বেশ আনমনা। চায়ের মগ সামনে, পাউরুটির খণ্ড হাতে, চা পাউরুটি মুখে দিচ্ছে না সে।
পরি বলল, কী অইছে ফুবু?
কুট্টি চমকাল। কো কী অইছে? কিচ্ছু না।
তয় এমুন টাসকি ধইরা রইছো ক্যা? খাইতাছো না ক্যা?
কুট্টি তাড়াতাড়ি চায়ে পাউরুটি চুবাল। তুই শ্যাষ করছ?
কুনসুম!
আর ইট্টু চা নিবি, আমার ভাগ থিকা আধাহান রুডি?
না।
ক্যা শরম করতাছে নি?
আরে না। আমি আর খাইতে পারুম না। আমার প্যাট ভইরা গেছে।
নিঃশব্দে কুট্টি তারপর নিজের খাওয়া শেষ করল। যখন শেষ কামড় রুটি মুখে দিয়েছে, দিয়েই চায়ের মগে চুমুক দিয়েছে তখনই পরি বলল, অহন হেই কথাডা তোমারে জিগামু ফুকু?
কুট্টি চায়ের মগ নামিয়ে আঁচলে মুখহাত মুছে আনমনা গলায় বলল, জিগা।
মাইনষের পোলাপান অয় ক্যা?
এই ধরনের একটা প্রশ্ন করবে পরি এটা কল্পনাও করেনি কুট্টি। পরির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী কইলি তুই?
হ। মাইনষের পোলাপান অয় ক্যা? কেমতে অয়? এই যে বচ্ছর বচ্ছর মা’র ঘরে খালি আমরা হইতাছি এইডা কেমতে অয়? ক্যান অয়?
এইডা তরে আমি কেমতে বুজাই। তুই এত ছোড মাইয়া।
ছোড অই আর যাঐ অই তুমি আমারে বুজাও। আমার এইডা বুজতে অইবোঐ।
ক্যান?
মা’র যে বচ্ছর বচ্ছর খালি পোলাপান অয় এইডা আমার ভাল্লাগে না। বেদনা ওডনের পর মায় যে এত কষ্ট পায়, দেইক্কা আমার সইজ্জ অয় না। কান্দন আহে।
ও এর লেইগাঐ জানতে চাইতাছচ?
হ।
পরির মাথায় পিঠে মায়াবী ভঙ্গিতে হাত বুলাল কুট্টি। এইডা দুনিয়ার নিয়ম মা। মাইয়ারা বড় অইলে তাগো বিয়া অয়। বিয়া অওনের পর পোলাপান অয়।
এইডা আমি জানি। অয় কেমতে?
তুই যহন বড় অবি, তর যহন বিয়া অইবো, তহন বুজবি কেমতে অয়।
আমি ফুবু কোনওদিন বিয়া বমু না।
ক্যা?
বিয়া বইলেঐত্তো পোলাপান অইবো। পোলাপান অওন বহুত কষ্টের। মাসের পর মাস পেটহান ফুইল্লা থাকে। তারবাদে ওডে বেদনা। মা’রে দেহি বেদনার কষ্টে কেমুন কোঁকায়। তারবাদে পোলাপান হওনের পরও তো ঝামেলা কম না। তারে বুকের দুদ খাওয়াও, গোরুর দুদ তালমিচরি খাওয়াও। তেল ডলো। বেবাকঐ বহুত কষ্টের। আইচ্ছা ফুবু, এত কষ্টের পরও মাইনষে পোলাপান হওয়ায় ক্যা?
