আজও নূরজাহানকে গোসল করাবার সময় এই ধরনের কথাই বলেছে হামিদা। যখন অবিরাম কথা বলতে থাকে সে তখন মুখে টু শব্দ থাকে না নূরজাহানের। মুখ ব্যাজার করে সব শোনে। কখনও কখনও রাগের মাথায় এত জোড়ে ধুন্দুলের ছোবা নূরজাহানের বুকে পিঠে ঘষতে থাকে হামিদা, শরীর লাল হয়ে যায় নূরজাহানের, ব্যথা পায়, তবু কথা বলে না।
দুই দিন ধরে বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না বলে মন মেজাজ তার খারাপ এজন্য ঘাটলায় বসে হামিদার মুখে মুখে দুই একটা কথা আজ সে বলেছে। হামিদা যখন বলল, আমি মইরা গেলে করবি কী তুই? লগে লগে উৎসাহের গলায় নূরজাহান বলল, কবে মরবা তুমি?
নিজের কথার তালে ছিল বলে মেয়ের কথাটা প্রথমে বুঝতে পারেনি হামিদা। বলল, কী কইলি?
নূরজাহান নির্বিকার গলায় বলল, আমারে নাওয়াইতে (গোসল) বহাইয়া, খাওয়াইতে বহাইয়া তুমি যে সব সময় খালি কও মইরা যাইবা, কবে মরবা?
নূরজাহানের কথায় গা জ্বলে গেল হামিদার। ডানহাতে নূরজাহানের থুতনি বরাবর একটা ঠোকনা (ঠোনা) মারল সে। ক্যা আমি মইরা গেলে তুমি সরাজ (স্বরাজ) পাও! যা ইচ্ছা তাই কইরা বেড়াইতে পারো।
হামিদার ঠোকনায় ব্যথা পেয়েছে নূরজাহান। ব্যথাটা সহ্য করল, করে বলল, হ সরাজ পাই, যেহেনে ইচ্ছা যাইতে পারি। তোমার লাহান বাইত্তে আমারে কে আটকাইয়া রাখবো না। দিনরাইত নিজের ইচ্ছা সাদিন (স্বাধীন) ঘুইরা বেড়ামু। কে কিছু কইবো না।
তরে বিয়া না দিয়া আমি মরুম না। বিয়ার আগে আমার বাইত্তে তরে আটকাইয়া রাখুম, আর বিয়া দিলে জামাই বাইত্তে এমতেঐ তুই আইটকা থাকবি। হেরা তরে ঘর থিকা বাইর অইতে দিব না।
নূরজাহান মুখ ভেংচে বলল, ইহ বাইর অইতে দিব না। আমি তাইলে বিয়াই বমু না।
তারপরও বেশ অনেক কথা হয়েছে মা মেয়ের। শেষ পর্যন্ত বাংলা সাবান দিয়ে মাথার চুল পর্যন্ত ধুয়ে দিয়ে নূরজাহানকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে হামিদা। ধোয়া লাল পাড়ের সবুজ একখানা শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। শাড়ি পরাবার সময় আজ প্রথম খেয়াল করেছে নূরজাহানকে ব্লাউজ পরানো উচিত, মেয়ে বড় হয়ে গেছে।
ফুল তোলা টিনের বাক্সে নাইওর যাওয়ার শাড়ি ব্লাউজ তোলা আছে হামিদার। বছর দুইবছরের বর্ষাকালে কেরায়া নৌকা করে স্বামী কন্যা নিয়ে বাপের বাড়ির দেশে যায় হামিদা। লৌহজং ছাড়িয়ে আড়াই তিন মাইল পুবে পয়সা গ্রাম, সেই গ্রামে বাপের বাড়ি হামিদার। বাপ মা কেউ আর এখন বেঁচে নাই। আছে একমাত্র ভাই আউয়াল। গিরস্তালি করে। অবস্থা ভালই। নাইওর গেলে বোন বোনজামাই আর ভাগ্নিকে ভালই খাওয়ায়।
আজ দুপুরে মেয়ের জন্য নিজের নাইওর যাওয়ার লাল ব্লাউজখানা বের করেছে হামিদা। মেয়েকে পরিয়ে দিয়েছে। বেশ টাইট হয়ে ব্লাউজ গায়ে লেগেছে নূরজাহানের। সবুজ রঙের লাল পেড়ে শাড়ি আর ব্লাউজে হঠাৎ করেই রূপ যেন তারপর খুলে গেছে নূরজাহানের। এতক্ষণ ধরে বকাবাজি করা মেয়েটাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে হামিদা। সাবান দিয়ে গোসল করাবার ফলে, আসন্ন শীতকাল, মানুষের ত্বকে এমনিতেই লেগে গেছে হাওয়ার টান, নূরজাহানের হাত পা মুখ গলা খসখসা দেখাচ্ছিল। কোথাও কোথাও খড়ি ওঠা। মাথার চুল সাবান ঘষার ফলে উড়াউড়া। বেশ অন্যরকম লাগছে মেয়েটিকে দেখতে।
হামিদা তারপর হাতে পায়ে মুখে গলায় সউষ্যার (সরষার) তেল মেখে দিয়েছে নূরজাহানের। চুলে হাত দেয়নি। বলেছে ভাত খেয়ে উকুন মেরে দেবে, চুল আঁচড়ে বেণী করে দেবে। এখন সেই কাজেই বসেছে।
তবে নূরজাহানকে গোসল করার সময় মেজাজ যেমন তিরিক্ষি হয়েছিল এখন আর সেটা নাই। ভাত খাওয়ার ফলে মুখে মেজাজে প্রশান্তির ভাব আসছে। বাটি থেকে আঙুলের ডগায় তেল নিয়ে নূরজাহানের চুলের গোড়ায় গোড়ায় লাগিয়ে দিচ্ছে। সেই ফাঁকে দুই একটা উকুন ধরে এক বুড়া আঙুলের নখের ওপর রেখে অন্য বুড়া আঙুলের নখে চেপে পুটুস করে মারছে। মাঝে মাঝে নূরজাহানকেও মারতে দিচ্ছে একটা দুইটা।
একবার একটা বড় কালো উকুন মারতে মারতে নূরজাহান বলল, ও মা, উকুনের এই হগল নাম দিছে কেডা? বড় উকুনডিরে কয় ‘বুইড়া’ মাজরোডিরে (মেজ) কয় ‘পুজাই’ ছোডডিরে কয় ‘লিক’।
হামিদা বলল, কইতে পারি না। মনে অয় আগিলা (আগের) দিনের ময়মুরব্বিরা দিয়া গেছে।
আগিলা দিনেও উকুন আছিল?
আছিল না! মাইনষের মাথা যতদিন ধইরা আছে উকুনও হেতদিন ধইরা আছে।
তারপর উকুন নিয়ে আর একটা প্রশ্ন করল নূরজাহান। ও মা, চাইম্মা উকুন কারে কয়?
ততক্ষণে মেয়ের মাথায় তেল দেওয়া শেষ করেছে হামিদা। এখন দাঁতভাঙা কাঁকুই দিয়ে যত্ন করে মাথা আঁচড়ে দিচ্ছে। এই অবস্থায় বলল, কোনও কোনও মাইনষের শইল্লের চামড়ায় এক পদের উকুন অয়। লালটা লালটা (লালচে)। হেইডিরে কয় চাই উকুন। চামড়ার লগে থাকে দেইক্কা এমুন নাম। তয় চাইম্মা উকুন অওন ভাল না। ময়মুরব্বিরা কয় চাইম্মা উকুন অয় বালা মসিবত দেইক্কা। যাগো শইল্লে অয় তাগো কপালে খারাপি থাকে।
আমার শইল্লে মনে অয় চাইম্মা উকুন অইছে।
হামিদা আঁতকে উঠল। নিজের অজান্তে হাত থেমে গেল তার। নূরজাহানের মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে আর্তগলায় বলল, কী কইলি? চাইম্মা উকুন অইছে?
নূরজাহান মজার মুখ করে হাসল। মনে অয়।
কেমতে মনে অয়, দেকছসনি?
