একটু থেমে মুখের মজাদার ভঙ্গি করে বলল, ভাল জিনিস একলা খাইয়া আরাম নাই, বুজলি? ভাল জিনিস বেকতে মিল্লা খাইতে অয়। তুই না আইলে খাইতাম আমরা দুইজনে। অহন খামু তিনজনে। দেকবি ভাগে কম পড়লেও খাইতে আমোদ লাগবো। আর এই বাইত্তে এতদিন ধইরা আমি কাম করি কীর লেইগা জানচ?
না।
কীর লেইগা বড়বুজানের গু-মুত ছাপ করি? এত কষ্ট করি তার লেইগা?
না।
খালি খাওনের লেইগা। খালি ভাল ভালই খাওনের লেইগা। তিনওক্ত ভরপেট খাওনের লেইগা। খিদার কষ্ট আমি সইজ্জ করতে পারি না, এর লেইগা।
হাঁড়ির পানিতে তখন বলক এসেছে। দেখে উঠে দাঁড়াল কুট্টি। তুই বয়, দুদ চিনি পাউরুডি ছাকনি চার কাপ বেবাক আমি লইয়াইতাছি।
কুট্টি যখন দোতালা ঘরের সিঁড়ির কাছে, উঠানে তখন দুইটা কাক নামছে আর একটা শালিক। কাক দুইটা তক্কে তক্কে আছে কোন ফাঁকে রান্নাঘরে ঢুকে কিছু একটা ঠোঁটে নিয়ে উড়াল দিবে আর শালিক পাখিটা উঠানের মাটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে খাবার খুঁজছে। পরি তাকিয়ে তাকিয়ে শালিক পাখি দেখছে, দোতলাঘরের সিঁড়ি ভেঙে পাঁচটা ফুটফুটা ছানা নিয়ে খুবই আয়েশি ভঙ্গিতে নেমে এল বিলাইটা। চালচলনে ধীর শান্ত ভাব কিন্তু ছানাগুলি তিড়িং বিড়িং করছে।
বিড়াল দেখে কাক দুটা উঠে গেল পশ্চিমের চালে আর শালিক পাখিটা উড়াল দিল চালতাগাছের দিকে।
ফিরে এসে দ্রুত হাতে সব গুছগাছ করে ফেলল কুট্টি। প্রথমে টিনের মগে করে আনা। দুধ ঢেলে দিল হাঁড়ির পানিতে। তারপর দিল চিনি, তারপর চা-পাতা। কোলের কাছে আদুরে ভঙ্গিতে ধরা একখান পাউরুটি। যেন বুকের দুধ খাওয়া শিশুর মতো পাউরুটিখান লেগে আছে তার বুকে। হাজার কাজের ব্যস্ততায়ও কোনও কোনও মা যেমন করে কোলের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াইয়া ব্যস্ত রাখে, কুট্টির কোলে পাউরুটি অবস্থা তেমন।
দেখতে দেখতে হাঁড়ির চায়ে বলক এল। বলকানো গরম পানিতে দুধ চিনি চা-পাতা ফেলার পর নিস্তেজ হয়েছিল পানি। পলকেই আবার নতুন করে বলকাতে লাগল। হাঁড়ির তলায় জমা চিনি গলাবার জন্য পরিষ্কার হাতায় চা-টা কয়েকবার নাড়াচাড়া করল কুট্টি। সেই ফাঁকে বলক দিতে দিতে যেন দুধের মতো উতরাইয়া (উপচে) না পড়ে চা সেজন্য হাঁড়িতে ফুঁ দিতে লাগল। কুট্টির ফুয়ে ফুয়ে হাঁড়ি থেকে উঠল চায়ের গন্ধ। নির্জন মিয়াবাড়ি মাতোয়ারা হয়ে গেল। আর এই গন্ধে পরির মন মুখ থেকে উধাও হল বিষণ্ণতা, মনের ভিতরটা চনমন করে উঠল আশ্চর্য এক আনন্দে। মুখে ফুটে উঠল মুগ্ধতার হাসি। নিজের অজান্তেই আমুদে গলায় বলল, ইস চা-র ঘেরানডা কী! ঘেরানেঐ পেড ভইরা যায়!
চুলারপারে রাখা লুচনি দিয়ে চায়ের হাঁড়ি নামাল কুট্টি। মিষ্টি করে হাসল। খাইতে দেকবি কেমুন লাগে। এক চুমুকেঐ কম্মো সারা।
উঠানে তখন মা বিড়ালের সঙ্গে পাঁচটি ছানা। পুবদিক থেকে আসা রোদ রান্নাঘর ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে পড়েছে। রান্নাঘরের ছেমায় অনেকখানি জায়গা ছায়াময়। বিড়ালটি আয়েস করে সেই ছায়ায় গা এলিয়েছে আর পাঁচটি ছানা তার কোলের কাছে দলা পাকিয়ে এ ওকে ধাক্কা দিয়ে দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে। বিড়ালটি প্রথমে খানিক উদাস হয়ে রইল তারপর কোনও কোনও ছানার ঘাড়মাথা চেটে দিতে লাগল।
চুলারপারে তিনটা মগ আগেই এনে রেখেছিল কুট্টি। একটা মগের পাশে কোরা রঙের পাতলা একটুকরা কাপড় ছিল। এটা ছাঁকনি। চুলা থেকে চায়ের হাঁড়ি নামাবার আগেই কাপড়ের টুকরাটা একটা মগের মুখে যত্ন করে মেলে দিয়েছিল। এখন দুইহাতে হাঁড়ি ধরে পরিকে বলল, ছাকনিডা ধইরা রাখ। চায় ঢালি।
পরি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধরতে গিয়েছিল, তারপরই ভয় পেল। আমার হাতের মইদ্যে আবার চা ঢাইলা দিবা না তো?
কুট্টি হাসল। আরে না ছেমড়ি।
কুট্টির কথামতনই ছাঁকনিটা ধরল পরি। নিপুণ হাতে চা ঢালল কুট্টি। একে একে তিনটা মগেই ঢালল। তবে প্রথম মগটায় একটু বেশি। তারপর ছাঁকনিতে জমা চায়ের পাতাসহ ছাঁকনি দলামোচড়া করে চায়ের খালি হাঁড়িতে রেখে দিল। কোল থেকে নামাল পাউরুটি।
তখুনি নিঃশব্দে, ছায়ার মতো চালতাতলার দিক থেকে রান্নাঘরের সামনে হেঁটে এল আলফু। কোন ফাঁকে কাক দুইটা আবার এসেছিল উঠানে, শালিক পাখিটা নেমেছিল। মাথায় কদমছাট চুল, লুঙ্গির ওপর মাজার কাছে গামছা বাঁধা, তাগড়া জোয়ান কালোপানা শরীর চকচক করছে ঘামে, এমন একজন মানুষকে হেঁটে আসতে দেখে পাখিগুলি ভয়ার্ত ভঙ্গিতে উড়াল দিল। কিন্তু বিড়ালটি নির্বিকার, সে নড়লই না। ছানাগুলিও গা করল না। তারা তাদের মতো খাদ্যের সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে রইল।
আচমকা আলফুকে দেখবে ভাবেনি কুট্টি। কিন্তু দেখে ভাল লাগল। শরীর আর মনের ভিতর আজকাল যখন তখন হওয়া কাঁপনটা হল। চোখের তারা নেচে উঠল, মুখে ফুটে উঠল লাজুক মিষ্টি হাসি। একপলক আলফুর মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ নামাল। বড় একখানা থালায় পাউরুটি রেখে, পাউরুটির উপরকার পাতলা কাগজ ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, আপনে কেমতে আইলেন?
আলফু বলল, ক্যা হাঁইট্টা আইলাম।
কুট্টি আবার যেন লজ্জা পেল। না আমি মনে করছিলাম আপনে চাউলতা তলায় আছেন। আপনেরে গিয়া ডাইক্কা আনুম।
কীর লেইগা? কাম আছেনি?
না।
তয়?
চা বানাইছি। পাউরুডিও আছে। পরিরে লইয়া খামু। মনে করলাম আপনেরেও ডাক দেই। আপনেও আমাগো লগে খান।
