সিঁড়ি ভেঙে কুট্টি তখন উঠানে। সকালবেলার রোদ গাছপালার আড়াল আবডাল থেকে এসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে উঠানে। মৃদু একটা হাওয়া আছে। চালতাগাছের ওদিকটায় পাখি ডাকছে। সব মিলিয়ে নিঝুম নির্জন পরিবেশ। এই পরিবেশে মানুষ কি মানুষকে আপনের চেয়েও বেশি আপন মনে করে? পরিকে কি কুট্টি তাই মনে করল? নয়তো এতদিনকার চেনা ছোট্ট মেয়েটিকে কেন অতি মায়াবী চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সে। বছর আট সাড়েআট আগে চোখের সামনে জন্মানো মেয়েটি আজ যেন আচমকা কেমন বড়সড়। ছিট কাপড়ের সস্তা পুরানা ফ্রকের আড়ালে গাবের মুচির মতন দেখা দিয়েছে তার স্তনরেখা, মুখখানি যদিও বিষণ্ণ তবু তাতে লুকিয়ে আছে অন্যরকমের এক লাবণ্য। ড্যাবড্যাবে উদাস চোখ দুইটায় একটু যেন মেয়েলি লজ্জার ছোঁয়া। আহা কোন ফাঁকে এতখানি বড় হয়ে গেল মেয়েটি? যদিও কুট্টির কোনও রক্ত সম্পর্কের আত্মীয় না পরি, পরির বাপ আজিজ গাওয়ালকে কুট্টি ডাকে দাদা, গ্রাম গিরস্তের এবাড়ি ওবাড়ির মধ্যে এরকম সম্পর্ক তো থাকেই, সেই সম্পর্কে কুট্টিকে পরি ডাকে ফুবু। কুট্টি তাকে পরি বলেই ডাকে। কখনও কখনও আদর করে মা-ও ডাকে।
আজ সকালে তাই ডাকল। মুখোন হাসিতে ভরিয়ে বলল, কী গো মা, আইজ এত বিয়ানবেলা এই বাইত্তে?
পরি উদাস গলায় বলল, এমতেঐ।
কাঁধে হাত দিয়ে পরিকে কাছে টানল কুট্টি। না, এমতেঐ তুমি আহহ নাই। তোমার মনডা জানি কেমুন উড়ু উড়ু। মুকহান কেমুন হুগনা। কী অইছে গো মা?
হেমুন কিছু না। মা’র অহন আহুজ পড়বো।
শুনে কুট্টি লাফিয়ে উঠল। কও কী? এইডা তো আমোদের কথা। তুমি মন খারাপ করছো ক্যান?
পরি কথা বলল না। অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
কুট্টি বলল, বেদনা উটছে কুনসুম?
বিয়াইন্না রাইত্রে। আলার মা দাদিও আইয়া পড়ছে।
তুই যে এই বাইত্তে আইলি তর অন্য ভাইবইনরা কো?
মায় আমারে কইছিলো বেবাকতেরে লইয়া হাজামবাড়ি যাইতে। আহুজ পড়নের পর বাবায় গিয়া ডাইক্কা আনবো। জরিরে দিয়া অগো আমি পাডাই দিছি। আমি যাই নাই।
ক্যা?
ভাল্লাগছিল না।
পরির চিবুক তুলে ধরে কুট্টি আবার বলল, ক্যান গো মা?
এমতেঐ।
একটু থেমে বলল, তোমারে কয়ডা কথা জিগামু ফুবু। তুমি আমারে কইবা তো? তুমি আমার উপরে চেতবা না তো?
কুট্টি সুন্দর করে হাসল। তার আগে আমার যে আরও কথা আছে মা।
কও?
তর বড়ভাইরা কো? নাদের হামেদ? বাইত্তে না তো?
না। দাদিরে বাইত্তে আইন্না মুড়ি মিডাই খাইলো তারবাদে কোনমিহি জানি গেল গা।
তয় বাইত্তে অহন কে?
খালি বাবায়।
আইজ্জাদায় (আজিজ দাদায়) আইজ গাওয়ালে যায় নাই?
না। মা’র আহুজ পড়তাছে আর বাবায় যাইবো গাওয়ালে? তাইলে কি বাবার আর রক্ষা আছে!
আজিজ যে খুবই মেউন্না (মেনিমুখো) পুরুষ একথা গ্রামের সবার মতো তার ছেলেমেয়েরাও জানে। তবু মেয়ের মুখে বাবাকে নিয়ে এই ভঙ্গিমার কথাটা ভাল লাগল না কুট্টির। এই নিয়ে পরিকে সে কিছু বলল না। কথা অন্যদিকে ঘুরাল। তুই অহনতরি খাচ নাই কিছু?
হ খাইছি।
কী খাইছ?
মুড়ি মিডাই।
আমি কিছু খাই নাই। খালি বড়বুজানরে খাওয়াইয়া ঘর থিকা বাইর অইছি, দেহি তুই।
বড়বুজানরে কী খাওয়াইলা ফুবু?
পাউরুডি আর দুদ। দুদের মইধ্যে চিনি মিশাইয়া পাউরুডি ভিজাইয়া ভিজাইয়া খাওয়াইলাম।
পাউরুডি পাইলা কই?
ঢাকা থিকা মাজরো বুজানে পাড়াইছে। পরি, পাউরুডি খাবি?
পাউরুটির কথা শুনে চোখ চকচক করে উঠল পরির। উদাস বিষণ্ণ মুখে গভীর আগ্রহ দেখা দিল। বুজানের পাউরুডি তুমি আমারে খাওয়াইবা কেমতে?
হেইডা তর চিন্তা করন লাগবো না। তুই আমার লগে রান্নঘরে আয়। পাউরুডির লগে। আরেকহান জিনিসও তরে আমি খাওয়াইতাছি।
কুট্টির পিছন পিছন রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে পরি বলল, কী জিনিস?
চা। বুজানের খাওনের দুদ থিকা অনেকহানি দুদ আইজ আমি হামলাইয়া রাকছিলাম। হেই দুদ দিয়া ঘন কইরা চা বানামু। দুইমুঠ চিনি দিয়া কড়া মিষ্টি করুম চা। তারবাদে হেই চায়ে পাউরুডি ভিজাইয়া ভিজাইয়া তরে খাওয়ামু আমি খামু আর….
কথা শেষ না করে থামল কুট্টি।
কথাটা ধরল পরি। আর?
কুট্টি একটু আমতা আমতা করল। তারপর বলল, আর ওই যে আলফুদাদায় আছে না, আলফুদাদায়, এই বাড়ির কামলা, তারে ইট্টু দিমু।
কুট্টির আমতা আমতা করার কারণ বুঝল না পরি। সরল গলায় বলল, হেয়ও অহনতরি কিছু খায় নাই?
রান্নাঘরে ঢুকে কুট্টি ততক্ষণে মাটির চুলায় আগুন জ্বেলেছে। অ্যালুমিনিয়ামের ছোট্ট হাঁড়িতে গরম পানি চড়িয়েছে। এইসব কাজ করতে করতেই বলল, খাইছে। খাইয়া ঘর থিকা বাইর অইছে।
কী খাইছে?
পান্তাভাত আর পিয়াইজ।
তুমি বিয়ানবেলা কী খাও ফুবু?
আমিও পান্তাভাত খাই।
আইজ খাও নাই ক্যা?
রোজ রোজ একপদের জিনিস খাইতে ভাল্লাগে না। আইজ বিয়ানে বুজানরে পাউরুডি আর দুদ খাওনের সময় আমারও ইচ্ছা করছে ওই জিনিস খাইতে। তয় দুদ অতো পামু কই? যেডু দুদ হামলাইয়া রাকছি তাতে চা অইবো। ঘন দুদের চা’র লগে পাউরুডি খাইতেও খুব সাদ।
তয় এত পাউরুডি তুমি পাইবা কই? আমারে লইয়া তিনজন মাইনষে খাইবো?
কুট্টি আবার হাসল। হেই চিন্তা তর করন লাগবো না। একলগে আষ্টহান পাউরুডি পাড়াইছে মাজারো বুজানে। পয়লা দিনঐ একহান আমি হামলাইয়া রাকছি। আইজ হেইডা বাইর করুম।
