বাইরে তখন আলোর রেখা ফুটছে। টিনের বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে ঘরের জমাট অন্ধকার ম্লান করে দিয়েছে সেই আলো। তবু মানুষের মুখ এই আলোয় পরিষ্কার দেখা যায় না। কিন্তু নাতির মুখটা আলার মা দেখতে চাইলে। মুখ গোঁজ করে শুয়ে আছে ছেলেটি। যেন তোতাই শুয়ে আছে। যেন সময়টা আজ না, যেন সময়টা বছর চল্লিশেক আগে। সেই বয়সের অপত্যস্নেহই যেন এই মুহূর্তে ফিরে এল আলার মা’র হাতে। গভীর মমতায় নাতির মাথায় হাত বুলাতে লাগল সে।
ঠিক তখনই দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে একটা কচিকণ্ঠ ডাকল, দাদি ও দাদি। দাদি। ওডেন। আমি আজিজ গাওয়ালের পোলা হামেদ। মা’র বেদনা উঠছে। আমাগো বাইত্তে যাওন লাগবো।
এই এতটা বয়সেও মানুষের জন্মের কথা শুনলে রোমাঞ্চিত হয় আলার মা। সেই প্রথম যৌবনে নিজে চারবার মা হয়েছে। প্রতিবারই আশ্চর্য এক ধরনের ভয় আর রোমাঞ্চে শরীর মন ভরে থাকত। বেদনা ওঠার পর থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত যে ভয়ানক। কষ্ট, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর, তার মুখখানি দেখার পর কোথায় উধাও হত সেই কষ্ট। নিজে ধরণী হওয়ার পর থেকে, অন্য নারীর সন্তান জন্মে সহায়তা করতে গিয়ে সে টের পেত সন্তান যেন অন্যের না, তার নিজেরই হচ্ছে। সে নিজেই যেন আপন গর্ভের অন্ধকার থেকে আলোকময় পৃথিবীতে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনছে একজন ছোট্ট মানুষ। তারপর সেই সন্তানের সঙ্গে দলা পাকিয়ে না পড়তে চাওয়া ফুল অনেক সময় যেন নিজেই নিজের গর্ভের অন্ধকারে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনছে, নিজেই নিজের ধরণী।
আজ হল তার অন্য অদ্ভুত এক অনুভূতি।
বানেছার আবার বাচ্চা হবে একথা সে জানে। কিন্তু বেদনা উঠেছে শুনে এই ভোররাতে আচমকাই আলার মা’র মনে হল বেদনা বানেছার না তার নিজেরই যেন উঠেছে। খানিকবাদে নিজেই যেন নিজের গর্ভ থেকে বের করে আনবে এক নতুন মুখ।
অনুভূতিটা বেশিক্ষণ থাকল না তার। কয়েক মুহূর্ত। চৌকি থেকে নামতে নামতে সে বলল, নাম না কইলেও গলার আওজ হুইন্নাঐ তরে আমি চিনতে পারতাম হামেদ। বেদনা উটছে কুনসুম?
হামেদ না নাদের বলল, আমরা আহনের ম্যালা আগে।
আইচ্ছা। তয় তরা ইট্টু খাড়। অজু কইরা নমজ পইড়া লই।
হামেদ বলল, দেরি অইয়া যাইবো দাদি। বাবায় কইছিল…
দরজা খুলে আলার মা হাসিমুখে বলল, না দেরি অইবো না। তরা বেবাকটি ভাইবইন আমার হাতে অইছচ। তর মা’র দশা আমি জানি। নমজ পইড়া যাওনেরও ম্যালা পর তর মা’র আহুজ পড়বো।
ঘরের ওটায় রাখা মাটির পুরানা ঠিলা থেকে পানি নিয়ে অজু করল আলার মা। আবার ঢুকে গেল ঘরে। চৌকিতে উঠে নামাজ পড়তে বসল।
বাইরের সাদা উঠানে নাদের আর হামেদ তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কোন ফাঁকে কাঁটা মুচড়ে হারিকেন নিভিয়েছে নাদের, হামেদ যেন তা খেয়ালই করেনি। এই বাড়িতে এলে তার নজর থাকে তালগাছের মাথায়। তালগাছের পাতায় পাতায় বাবুই পাখির বাসা। বহুকাল ধরে আছে বাসাগুলি। পুরানা হচ্ছে, ঝরে যাচ্ছে আবার নতুন বাসা তৈরি করছে বাবুইরা। গ্রামের এত বাড়িতে এত তালগাছ কিন্তু পাখিগুলি কেন যে শুধু এই গাছটাতেই বাসা বাঁধে!
এখন সকালবেলার আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাসা থেকে বেরুতে শুরু করেছে পাখিরা। ক্যাচম্যাচ করে মাতিয়ে তুলছে চারদিক। কেউ বসেছে তালের পাতায় ডগায়, কেউ বাসার মুখে। কেউ কেউ ওড়াউড়ি করছে।
হামেদ মুগ্ধ চোখে পাখি দেখতে লাগল। কখন যে কিছুটা সময় কাটল টের পেল না, কখন যে নামাজ শেষ করে, ঘরের দরজা টেনে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল আলার মা, টের পেল না।
হামেদকে ওইভাবে গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আলার মা বলল, কী মিয়াভাই, বাঐ দেহনি?
কিন্তু হামেদ কথা বলবার আগেই তার মনে হল বাবুই পাখির বাসার সঙ্গে নারীগর্ভের কোথায় যেন মিল। এরকম এক বাসার ভিতরই জন্মায় মানুষ। প্রথমে ডিম, ডিম ভেঙে ছানা, চোখ ফুটতে সময় লাগে, হাত পা নাক মুখ গজাতে সময় লাগে, তারপর একদিন পরিপূর্ণ এক মানবসন্তান বেরিয়ে আসে, বাবুইয়ের বাসা থেকে যেমন করে ভোরবেলা বেরোয় পাখিরা।
তারপর আলার মা’র মনে হল দুনিয়াটাই বুঝি এক বাবুই পাখির বাসা। এক নারীগর্ভ। এই দুনিয়ার থেকে, বাবুই পাখির বাসা নারীগর্ভ থেকে একদিন বেরিয়ে যেতে হবে সবাইকে। বেরিয়ে কোথায় যেতে হবে? কোন সে অচিন দুনিয়ায়! কেমন আলো হাওয়া সেই দুনিয়ার! কেমন রং আকাশ আর নদীর, কেমন রং গাছের পাতায়! কোন সুরে সেই দুনিয়ার গান ধরে পাখিরা! কোন দুঃখ সুখে, আনন্দ বেদনায় বেঁচে থাকে মানুষেরা!
.
কুট্টি লো কুট্টি
তরে দিলাম ছুট্টি!
দোতালা ঘরের উঠানের দিককার সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসার সময় কেন যে আজ সকালে এই কথাটা মনে পড়ল কুট্টির! সেই কোন ছোটবেলার কথা। কোনও কোনওদিন দুপুরে দুই-চারদিন পর ভরপেট একদিন খাওয়া হলে সেই আনন্দে বিকালের দিকে তাদের বাড়ির গরিব উঠানে বোনদের নিয়ে বউয়াছি খেলতো কুট্টি। ছোটবোনগুলি খেলত তারচেয়ে ভাল। প্রতিবারই তাকে হারিয়ে এই কথাটা বলত বোনরা।
কুট্টি লো কুট্টি।
তরে দিলাম ছুট্টি!
এতকাল পর কেন যে আজ সকালবেলা কথাটা কুট্টির মনে পড়ল! তবে এই নিয়ে বেশি ভাববার সময় পেল না সে। তার আগেই পরিকে দেখতে পেল আমরুজ তলা দিয়ে বিষণ্ণভঙ্গিতে হেঁটে আসছে। একটু যেন উদাসও মেয়েটি। হেঁটে আসছিল আনমনা ভঙ্গিতে। কুট্টিকে দেখে কেমন যেন একটু চমকাল।
