শেষ পর্যন্ত খবিরকে পাঠানো হল মতলবের সেই গ্রামে। সঙ্গে আলাও গেল। আলার তখন দশ-বারো বছর বয়স।
তারা ফিরে এল শুকনা মুখে। সেই গ্রামে মানুষটা নাই। সেই যে বাড়ি এসেছিল তারপর সেখানে নাকি আর ফিরেই যায়নি।
হায় হায়, তা হলে গেল কোথায়?
বছরখানেক আগে উধাও হয়ে যাওয়া মানুষ, এতদিন পর তাকে খুঁজবেই বা কোথায়? তবু ঢাকার টাউন থেকে শুরু করে যেখানে যত আত্মীয়স্বজন ছিল, এমনকী লতাপাতার আত্মীয়রাও যে যেমন করে পারে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেছে। না, হদিশই পাওয়া গেল না। উধাও তো উধাওই। আজ চল্লিশ বছর।
এখনও কোনও কোনও রাতে নির্জনে একা থাকবার সময় মানুষটার কথা মনে পড়ে। ছোটখাটো ফরসা রঙের মানুষটি। ফতুয়া আর লুঙ্গি পরে থাকত সব সময়। মাথায় টুপিটা থাকতই। হাসিমুখে নরম গলায় কথা বলত। নাকের তলাটা সুন্দর করে কামানো, গালভরতি সুন্দর চাপদাড়ি। চোখে অদ্ভুত এক উদাসীনতা ছিল তার। কারও মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলবার সময়ও মনে হত যার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে আসলে সে তার মুখের দিকে তাকিয়ে নাই, তার চোখ যেন অন্যত্র, দূরে কোথায়, বহুদূরের কোন অচিনলোকে যেন চলে গেছে তার চোখ। সে যেন এই দুনিয়ার কিছুই দেখছে না, সে যেন দেখছে অন্য দুনিয়ার কোনও দৃশ্য।
আর কী মায়া মানুষের জন্য! কথায় আচরণে কাউকে দুঃখ দেওয়ার লেশমাত্র নাই। তখনও তোতা হয়নি, বাড়ি এসে ছেলে তিনটিকে যে কী ভালবাসত, কী যে আদর করত! বিলের তিন-চার কানি জমি ছিল বর্গা দেওয়া। বর্গাদাররা ধানপাটের অর্ধেকটা দিত, ইমামতির টাকা জমিয়ে জমিয়ে বেশ কিছু থোক টাকা বাড়ি আসার সময় নিয়ে আসত মানুষটা। তাতে দিন চলে যেত। খুব সুখ স্বাচ্ছল্যের জীবন ছিল না, আবার দুঃখকষ্টেরও ছিল না।
দুঃখকষ্ট শুরু হল মানুষটা উধাও হয়ে যাওয়ার পর। জমির আয়ে দিন চলে না। কোলেরটা নিয়ে চারটা এইটুকু এইটুকু ছেলে। বড়টা কাজিরপাগলা হাইস্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ে। মেজো আর সেজো স্লেট পেনসিলে অ আ লেখে। ওইটুকুই। তারপর সব বন্ধ হয়ে গেল।
সংসার আলার মা চালায় কী করে? ভাশুর দেবর যে দুইজন এই বাড়ির অন্য শরিক তারা আছে তাদের নিয়ে। পাটাভোগে বাপের বাড়ি আলার মা’র। মা-বাবা দুইজনেই তখনও বেঁচে। ভাইরা সংসার চালায়। বোন দুইটার বিয়ে হয়েছে একজনের কোরহাটি আরেকজনের রাড়িখাল। সবাই সবাইকে নিয়ে আছে, আলার মা’র দিকে তাকায় কে?
এই বাড়ির বউ হয়ে আসার পর থেকেই বাড়ির বউঝিদের পোলাপান হওয়ার সময় গভীর একটা উৎসাহ নিয়ে আহুজ ঘরে (প্রসব ঘরে) ঢুকত সে। গভীর আগ্রহ নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত মানুষের জন্মমুহূর্তের রহস্য। এই করে করে কখন যে নিজের অজান্তেই কাজটার মধ্যে জড়িয়ে গেল, ধরণীর কাজটা শিখে ফেলল টের পেল না।
সেই দুর্দিনে এই কাজটাই শেষপর্যন্ত তার সহায় হয়ে দাঁড়াল। গ্রামের এবাড়ি ওবাড়ি, চারপাশের গ্রামের এবাড়ি ওবাড়ি, দুই দশদিন পরপরই তো মানুষ জন্মাচ্ছে। নিজগ্রাম ছাড়িয়েও আলার মা’র ডাক পড়তে লাগল। গরিব গিরস্তে একটাকা-দুইটাকা, অবস্থাপন্নরা পাঁচ-দশটাকা পর্যন্ত দেয়। আবার বাচ্চার মাথা ঘোয়ানির দিন (সাতদিনের দিন বাচ্চার মাথার চুল ন্যাড়া করে গোসল করানো। এটা একটা উৎসব) মেজবানির দাওয়াত খাওয়ায় চার ছেলেসহ, বিদায়বেলায় দেয় একখান সুতিশাড়ি।
পেশাটা লেগে গেল আলার মা’র। আর সুনাম এত ছড়াল, আল্লাহর কুদরতই কিনা কে জানে, আলার মা’র হাতে মরেই না। মায়েরা আরামে স্বস্তিতে প্রসব করে। সব মিলিয়ে দিন আস্তে ধীরে ঘুরতে লাগল।
তখনও আশায় আশায় দিন কাটে, মানুষটা হয়তো ফিরে আসবে। হায়রে মানুষের আশা!
আলার মা চেয়েছিল নিজের যত কষ্ট করতে হয় করবে কিন্তু ছেলে চারটাকে মানুষ করবে। লেখাপড়া শিখিয়ে শহরে বন্দরে চাকরিবাকরিতে পাঠাবে। আর স্বভাবচরিত্রে তারা যেন হয় তাদের বাপের মতো, ধার্মিক মায়াবী ভালমানুষ।
একজনও তেমন হল না। ফাইভ-সিক্সের পর আর পড়লই না আলা। পাটাভোগে গিয়ে মামাদের কাছে পড়ে থাকত। লায়েক বয়সে কাকে কাকে ধরে যেন ঢাকায় গিয়ে চাকরি নিল। বংশালের এক খাস ঢাকাইয়া বাড়িতে বিয়ে করল। মা-ভাইদের কথা ভাবলই না, ফিরেও তাকাল না কারও দিকে। নিজের ভাগের সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা নিয়ে গেল।
এমন বাপের এমন স্বার্থপর ছেলে!
কথায় আছে বড় যে পথে যায় ছোটও যায় সেই পথে! আলার মা’র চার ছেলের ক্ষেত্রেই তাই হয়েছে। একটা সময়ে বড়ভাইয়ের পথ ধরল মেজো আর ছোট ছেলে। তারাও তাদের ভাগের জমি বিক্রি করে কাটা কাপড়ের ব্যাবসা করতে চলে গেল দিনাজপুরে। সেখানেই বিয়েশাদি করে আবার ভাগও হয়ে গেল দু’ভাইয়ে।
শুধু তোতা থেকে গিয়েছিল মায়ের কাছে। সঙ্গে তার ভাগের কানির ওপর ধানপাটের জমি। খুবই বৈষয়িক ছেলে সে। গিরস্তি করে, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জমি কিছু বাড়িয়েছে। ধরণীর কাজ করে মায়ের জমানো টাকাপয়সা ছলচাতুরি করে নিয়েছে, নিয়ে নিজের আখের মোটামোটি গুছিয়ে ফেলেছে।
তবে এই নিয়ে দুঃখ নেই আলার মা’র। আর যাই হোক এই একটা ছেলে তো তাকে ছেড়ে যায়নি। বউ নিয়ে দূরের মানুষ হয়েও তো কাছেই আছে। একই চালার তলায় তো আছে। এই বা কম কী! আর নিজে যেমন করে একদিন মা’র বুকে লেগে ছিল তেমন করেই তো তার ছেলেটিকে দিয়ে দিয়েছে মা’কে। এই তো তার বুক জুড়ে আছে সেই ছেলে!
