হামেদ ফিক করে হাসল। জানুম না ক্যা? বেবাকঐ জানি।
তয় যে আমারে কলি তুই কিছু বোজচ নাই?
তর মোক থিকা হোননের লেইগা কইছি। এই হগল হোনতে মজা লাগে।
ডর করে না?
হ ডরও করে আবার মজাও লাগে।
একটু থেমে হামেদ বলল, ওই দাদা, কনধনাইয়া বলে দিনেও দেহা যায়?
হ। কোনও কোনওদিন নিটাল দুইফরে, যহন চাইরমিহি কোনও মানুষজন থাকে না তহন গাছ থিকা নাইম্মা তারা ইট্ট চলাফিরা করে। তহন কেঐ কেঐ আতকা তাগো দেইখা হালায়।
বেগির মায় বলে বহুতবার দেখছে।
দেকতে পারে। আবার কালীসন্ধ্যায়ও তাগো কোনও কোনও সময় দেহা যায়। সন্ধ্যাকালেও তারা চলাফিরা করে। তয় তাগো সবথিকা বেশি দেহা যায় জোছনা রাইতে। ফকফইক্কা জোছনা রাইতে না, মাইটা জোছনায়। মাইটা জোছনায় চলাফিরা করতে তারা বহুত আরাম পায়।
ততক্ষণে চারদিক আরেকটু ফরসা, আরেকটু আলোকিত হয়েছে। চারপাশের গিরস্ত বাড়ির আঙিনায় জেগে উঠছে মানুষ গোরু বাছুর কুকুর বিড়াল। খোয়াড় থেকে ছাড়া পেয়েছে হাঁস মুরগি কবুতর। ওড়াউড়ি করছে কাক শালিক টুনটুনি আর দোয়েল। হাওয়ার সুরে সুর মিলিয়ে শিস দিচ্ছে দোয়েল বুলবুলি।
পুরানবাড়ির ভাঙন ছাড়িয়ে উপরের দিকে উঠতে উঠতে হামেদ বলল, দাদা, হারিকেন নিভাইয়া দে।
.
ফজর আজানের আগে আগে আজ ঘুম ভাঙল আলার মা’র।
সে শোয় খাটালের চৌকিতে। বড়ঘরটা পুবে-পশ্চিমে লম্বা। ঘরের পুব দিককার অর্ধেক জুড়ে কেবিন। কেবিনে বউ পোলাপান নিয়ে শোয় সেজোছেলে তোতা। তিন ছেলেমেয়ে তোতার। সেজোটা ছেলে। সে শোয় দাদির কাছে। দাদি-ন্যাওটা ছেলে। এই তো কেমন কুঁকড়ে মুকড়ে শুয়ে আছে দাদির বুকের কাছে।
তোতাও একদিন মা-ন্যাওটা ছিল। সারাক্ষণ থাকত মায়ের সঙ্গে সঙ্গে। আলার মা’র কোনও মেয়ে ছিল না বলে তোতা যেন ছিল অনেকটাই মেয়ের মতো। ঢংঢংও একটু মেয়েলি ধাচের। মায়ের সঙ্গে অনেক মেয়েলি কাজও সে করত। অন্য তিনভাই যখন মাঠেঘাটে চরে বেড়াত সে তখন মায়ের সঙ্গে ঘরের কোণে বাড়ির উঠান পালানে। কোনও কোনও বিকালে মেয়েলি ঢঙে বসে মায়ের মাথার উকুন পর্যন্ত মেরে দিত। বাড়ির অন্যান্য শরিক আর পড়শিরা বলত, আলার মা, তোতা তোমার পোলা না, তোতা তোমার মাইয়া। তোমার অইলো তিন পোলা এক মাইয়া।
সেই মেয়েলি ঢঙের ছেলে দিনে দিনে বড় হল। বিয়াশাদি করে ঘরগিরস্তি শুরু করল। অন্য তিনছেলে রোজগারপাতির ধান্ধায় কেউ গেল ঢাকায় কেউ ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর। বড় আলাউদ্দিন থাকে ঢাকার বংশালে। কোন সরকারি অফিসে পিয়নের কাজ করে। দেশগ্রামমুখী হয়ই না।
মেজো আর ছোট ছিল দিনাজপুরে। কাটা কাপড়ের দোকান দিয়েছিল দুই ভাই মিলে। বনিবনা হল না। শেষমেশ ভাগাভাগি হয়ে গেল দোকান। ছোট ছেলে দোকান রেখে ভাইয়ের ভাগের টাকা বুঝিয়ে দিল। সেই ভাই চলে গেল দিনাজপুর থেকে আরেকটু দূরে, ঠাকুরগাঁও। সেখানে গিয়ে দোকান করল। দুই-চার বছরে বউ পোলাপান নিয়ে কখনও কখন দেশগ্রামে আসে। এমনিতে মায়ের কোনও খোঁজখবর রাখে না। ক্কচিৎ কখনও বাড়ি এলে একটা-দুইটা সুতির মোটা ধাঁচের অল্প দামি শাড়ি, শীতকালে চাদর স্যান্ডেল এসব নিয়ে আসে। যে মা নয়মাস দশদিন গর্ভে রেখে পৃথিবীর আলো হাওয়ায় আনল, বেঁচে থাকতেও সেই মা এখন দূরের মানুষ।
তোতা ছাড়া অন্য ছেলেদের কথা ভাবলেই আলার মা’র কখনও কখনও মনে হয় সে যেন আসলে মানুষ না, সে যেন আসলে এক পাখি। তার আঙিনার তালগাছের মা বাবুই পাখি যেন সে। পুরুষ পাখির সঙ্গে মেলামেশার ফলে যৌবন বয়সে মা হয়েছিল। চারটা ডিম ফুটে চারটা ছানা হয়েছিল। একসময় পাখনার আড়ালেই ছিল তারা। ঝড় বৃষ্টি রোদ হাওয়া থেকে তাদেরকে সে রক্ষা করেছে। উড়তে শিখার পর অচেনা আকাশে উড়ে গেল তিনটা ছানা। আর ফিরে এল না। দুর্বলটা রয়ে গেল পাখনার তলায়। একটু বেশি বয়সে বিয়াশাদি করে সে চলে গেল আরেক নারীর আঁচলের তলায়। এও একরকমের আকাশ পাথালে উড়াল দেওয়া। এক চালার তলায় থেকেও বউ নিয়ে খাটাল আর কেবিনের মাঝখানকার দরজা বন্ধ করে সে হয়ে গেল দূরের মানুষ। আরেকজনের।
এও তো এক পাখিরই জীবন, বাবুই পাখির জীবন। যেন বা একগাছেই বাসা বেঁধেছে তারা কিন্তু কেউ কারও না।
আর সেই যে পুরুষ পাখিটি! পুরুষ বাবুইটি! সেও তো উড়ালই দিল! সেও তো আর ফিরে এল না! দুই-তিন কানি ধানের জমি, চারটা ছেলে আর পাঁচ শরিকের এই বাড়ির কয়েকগন্ডা ভিটামাটি, একটা চৌচালা বনেদিঘর, একটা রান্নাচালা আর রান্নাচালার মুখোমুখী একখান তালগাছ, যে তালগাছ জুড়ে বাবুই পাখির বাসা, এসব ফেলে পুরুষ পাখিটি উধাও হল। আর ফিরে এল না। আজ চল্লিশ বছর।
আজ রাতে ঘুম ভাঙার পর কেন যে এসব কথা মনে পড়ছিল আলার মা’র! জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা কত ছোটখাটো ঘটনা, কত দুঃখ বেদনার কথা যে মনে পড়ছিল!
মানুষটা ছিল ধার্মিক। ইমামতি করতে গিয়েছিল মতলবের ওদিককার এক গ্রামে। সেখানেই থাকত। ছয় মাস নয় মাসে একবার বাড়ি আসত। একবার, চল্লিশ বছর আগে, রোজার ইদের পর পর বাড়ি এল, ছোট ছেলে তখন পেটে। সেই শেষ আসা। মাসখানেক থেকে বিদায় নিল। তারপর আর কোনও খোঁজখবর নাই। মাসে-দুই মাসে একটা দুইটা পত্র আসত তার, চাচাতো ভাশুরের ছেলে খবিরকে দিয়ে সেই পত্রের জবাবও দিত আলার। মা। সেবার যাওয়ার পর পাঁচ মাস কেটে যায় চিঠিপত্রের নামগন্ধ নাই। খবিরকে দিয়ে দেড়-দুইমাসের মধ্যে তিন-চারখানা পত্র লেখাল আলার মা। তোতা হল। ছেলের জন্মের কথা জানানো হল, তবুও খবর নাই মানুষটার। বছর ঘুরে এল।
