এই বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণে পুরানবাড়ি। বাড়ির দক্ষিণে বড়পুকুর, পশ্চিমে খোলা মাঠ। মাঠের পাশে খানবাড়ি থেকে কালিরখিলের দিকে চলে যাওয়া সড়ক। সড়কের পশ্চিমে বিল, বিলের পশ্চিমে গ্রাম কান্দিপাড়া, জশলদিয়া।
পুরানবাড়িতে, আলার মা-দাদিদের সীমানায় ওঠার তিনটা পথ আছে। সবচেয়ে সহজ পথ ছাড়াবাড়ির উপর দিয়ে উত্তর-পশ্চিম কোণের দিকে গেলেই দুই বাড়ির মাঝখানে পনেরো-বিশ কদমের উঁচু একটা পথ আছে সেই পথ ধরা। এই পথ নাদের হামেদ এখন ধরবে না।
আরেকটা পথ হল ছাড়াবাড়ির পুব দিককার নামায় আলতাবুদ্দিন সারেঙের যে বিশাল জমি, সেই জমি আর ছাড়াবাড়ির লগের উত্তর দিককার আলপথে খানিক গিয়ে, পশ্চিমে তোতাদের যে বাজাজমি সেই জমি ধরে পশ্চিমে গিয়ে ছাড়াবাড়ি আর পুরানবাড়ির পনেরো বিশ কাইকের পথটা ধরা।
না এই পথও নাদের-হামেদ ধরবে না। কারণ যে ভয়ের কথা মা-বাবা দুইজনে দুইভাবে বলছিল সেই ভয়টা ছাড়াবাড়ির এই কোনাটাতেই। জড়াজড়ি করে থাকা পুরানা দুইটা আমগাছ, যে গাছ আবার ছেয়ে আছে তেলাকুচ লতার গাঢ় সবুজ পাতায়, এই গাছ দুইটাতেই…
নাদের-হামেদ এখন ধরবে ছাড়াবাড়ির দক্ষিণের পথ। পথের একপাশে ছাড়াবাড়ি আরেকপাশে সমেদ খাঁ-র সরু খালের মতন পুকুর। পুকুরের ওপারে সমেদ খাঁ-র বাড়ির এক শরিক বেগমের মা’র সীমানা। এই জায়গাটুকু পেরিয়ে ওপাশে গেলেই উদাস একখানা মাঠ। মাঠের পশ্চিম দিক ঘুরে পুরানবাড়ির বড়পুকুরের পার ধরে যেতে হবে বাড়িতে। ঘুরপথ। তবু এপথেই যাবে দুইভাই।
শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পথটুকু পেরিয়ে এল নাদের-হামেদ। ওপাশের মাঠে এসে একসঙ্গে হাঁপ ছাড়ল। আকাশ ততক্ষণে আর একটু ফরসা হয়েছে। চারদিকে রোয়াইল ফলের মতো সবুজাভ আলো।
হামেদ বলল, এইবার ক দাদা।
একহাত থেকে হারিকেন আরেক হাতে আনল নাদের। আবার জিগাই, হুইন্না তুই ডরাইবি না তো?
আরে না।
ছাড়াবাড়ির ওই আমগাছ দুইডায় একজন থাকে।
কথাটা বুঝেও না বোঝার ভান করল হামেদ। কেডা, কেডা থাকে? ওই দাদা, গাছে আবার মানুষ থাকে কেমতে?
নাদের হাসল। তুই বোজচ নাই?
নয়-দশ বছর বয়সেই বেদম পাকা পাকছে হামেদ। নাদের এখন যে কথা বলবে কথাটা সে বেশ ভাল করেই জানে। গাছে কে থাকে, কী বিত্তান্ত গ্রামের অন্য সবার মতো সেও সবই জানে। মা-বাবা কথা বলবার সময়ই বুঝেছে। বুঝে যে ভয় পায়নি তা নয়, ধারণা ছিল বাইরে এখন আর অন্ধকার নাই, ফরসা হয়ে গেছে চারদিক, এই অবস্থায় দুইভাই মিলে জায়গাটা পেরিয়ে যেতে পারবে। আমগাছে যে থাকে আজানের পর তার আর থাকার ক্ষমতা থাকবে না। আল্লাহর নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে লোকালয় থেকে উধাও হতে হয়। তাদের। এটা আল্লাহর কুদরত।
তখনও যে আজান হয়নি, দুই ছেলেকে ভরসা দেওয়ার জন্য, নিজের গা বাঁচাবার জন্য আজিজ যে আজানের নামেও মিথ্যা বলেছে খানিক আগে আজান হওয়ার পর দুইভাইয়েই তা বুঝেছে। বুঝে নাদেরের মনে কী হয়েছে কে জানে, হামেদের মনে হয়েছে, ভাইগ্য ভাল হারিকেন বুদ্দি কইরা লইয়াইছিলাম। লগে আগুন থাকলে তারা সামনে আইতে পারে না।
এতকিছু জেনে বুঝেও একেবারেই নাদান অবুঝ সেজে রইল হামেদ। সরল, বোকা গলায় বলল, না আমি বুজি নাই দাদা। তুই ক।
খোলামাঠ থেকে পুকুরপারে উঠল নাদের। গলা খাঁকারি দিল, বহুত পুরানা জিনিস হেয়। বহুতদিন ধইরা ওই গাছে থান লইছে।
বোজলাম। তয় জিনিসটা কী?
কনধনাইয়া (স্কন্ধকাটা)।
শব্দটা শুনেই গা কাঁটা দিল হামেদের। এমন যে হবে তা সে জানত। তবু এই ভয়ের মধ্যে কেমন যেন রোমাঞ্চ আছে। ভয় লাগে ভালও লাগে।
ইলাস্টিক লুজ হওয়া প্যান্ট দুইহাতে টেনে মাজার অনেক উপরে তুলল হামেদ। লুঙ্গির কায়দায় প্যান্টটায় দুইটা গোঁজ দিল। ফলে নাভির কাছে হাতের মুঠার মতন দলা পাকিয়ে রইল প্যান্ট। এখন আর পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নাই। এখন আরামছে হাঁটা যাবে, আরামছে কথা বলা যাবে ভাইর সঙ্গে। প্যান্টের জন্য পেট ফুলিয়ে রাখতে হবে না।
ইস এই বুদ্ধিটা কেন যে আগে আসেনি মাথায়!
প্যান্ট সামলাতে গিয়ে দুইকাইক পিছনে পড়েছিল হামেদ। এখন একদৌড়ে ভাইয়ের পাশে চলে এল। অবাক বিস্ময়ের গলায় বলল, কনধনাইয়া?
হ। কনধনাইয়া কারে কয় জানচ?
জানি। কল্লামাথা কিছু নাই। খালি শইলডা। আর শইলভরা আনরসের লাহান চক্কু।
হ। রাইত বিরাইত চলাচল করে হেয়। এক পাও দেয় এই বাড়ির আমগাছ দুইহানের মাথায় আরেক পাও দেয় বিলেরবাড়ির শিমইল গাছটায়। দুই পাও দুই জাগায় দিয়া চেগাইয়া খাড়ইয়া থাকে। ওই টাইমে কেঐ যুদি হের পায়ের নীচ দিয়া মেলা দেয়, তাইলে আর রক্ষা নাই। দুই পাও দিয়া চাইপ্পা ধরে তারে। হেই চাপে কইলজা গইল্লা পানি অইয়া যাইবো। হেই পানি নাকমুখ দিয়া উকালের (বমির) লাহান বাইর অইয়া মরবো মানুষটা।
হামেদের গা আগের মতনই কাঁটা দিচ্ছে, আগের মতনই রোমাঞ্চ শরীরের পরতে পরতে। তবু সে বলল, আমি হুনছি আলার মা-দাদির তালগাছেও বলে কোনও কোনও রাইত্রে পাও দিয়া খাড়য় হেয়। হেই রাইত্রে বলে বাঐ (বাবুই) পাখিগুলি আর ঘুমায় না। খালি ক্যাচম্যাচ ক্যাচম্যাচ করে।
মুখ ঘুরিয়ে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল নাদের। মুখ পরিষ্কার দেখতে পেল না। তবু বলল, ওই বান্দর, তয় বলে তুই কিছু জানচ না?
