হারিকেনটা ডানহাত থেকে বাঁহাতে আনল হামেদ। তার পরনে ইলাস্টিক লুজ হয়ে যাওয়া মোটা সুতি কাপড়ের হাফপ্যান্ট আর ঢলঢলা গেঞ্জি। যখন তখন ইলাস্টিক লুজ হওয়া প্যান্ট যাতে পেট গলিয়ে নীচে নেমে যেতে না পারে এই কারণে প্যান্টের দশা এরকম হওয়ার পর থেকে পেটটা সে যথাসম্ভব ফুলিয়ে রাখে। এখন হারিকেন হাত বদল। করার ফলে, ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার ফলে পেটের ফোলাটা পলকের জন্য কমল আর সেই ফাঁকে প্যান্টটা নাভির নীচ ছাড়িয়ে প্রায় লজ্জার জায়গায় গিয়ে পৌঁছাতে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে থাবা দিয়ে প্যান্ট ধরল হামেদ। জায়গামতো তুলে পেটটা ফুলিয়ে রেখে বলল, দেহচ না চাইরমিহি কেমুন ফসসা অইয়া গেছে। নাদের বলল, আসলে ফসসা হয় নাই।
তয়? তয় আমি দিহি ফসসা ফসসা দেকতাছি। উই যে উত্তর মিহি ফকিরবাড়ি, পশ্চিমে সেউলার বাড়ি তার লগেই পুরানবাড়ি। পুরানবাড়ির তালগাছটাও তো দেহা যাইতাছে।
রাইত দোফরেও চকে এমুন ফসসা ফসসা দেহা যায়।
আমাবইস্যার রাইত্রেও?
নাদের নির্বিকার গলায় বলল, হ।
এদিকে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে পেটের ফোলাটা কমছিল হামেদের আর প্যান্ট ছ্যালছাল করে পড়ে যাচ্ছিল। একহাতে হারিকেন আরেক হাতে প্যান্ট সামলাতে ঝামেলাই হচ্ছিল তার। অবস্থাটা সামাল দেওয়ার জন্য ভাইকে বলল, দাদা, হারিকেনডা ইট্ট লবি?
নাদের বাপের স্বভাব পেয়েছে। যে কোনও কাজে গা বাঁচিয়ে চলার অভ্যাস। বলল, ক্যা?
আমার পেন্টুলডা পইড়া যাইতাছে।
হের লেইগা হারিকেন আমার ধরন লাগবো ক্যা?
একহাতে পেন্টুল আরেক হাতে হারিকেন লইয়া আটতে পারি না।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও হারিকেনটা নিল নাদের। আইচ্ছা, দে।
ভাইর হাতে হারিকেন দিতে পেরে আরামের ভাব হল হামেদের। ফুর্তির গলায় বলল, ওই দাদা, তরে একহান কথা কমু?
হারিকেন হাতে হাঁটতে হাঁটতে নাদের বলল, ক।
আমার না বহুত ফুর্তি লাগতাছে।
ক্যা?
মা’র যে আবার আহুজ পড়ব!
কথাটা ভাল লাগল না নাদেরের। সে কোনও জবাব দিল না। পা চালিয়ে হাঁটার স্বভাব তার। হামেদ কিছুতেই ভাইর সঙ্গে তাল রাখতে পারে না। নাদেরের হাঁটার সঙ্গে তাল রাখতে হামেদকে হয় দৌড়াতে। এখনও দৌড়াচ্ছিল সে। একহাতে প্যান্টের লুজ হওয়া ইলাস্টিক চেপে ধরে ভাইর পাশাপাশি দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, ওই দাদা, ক তো ইবার আমগো ভাই অইবো না বইন?
নাদের বিরক্ত গলায় বলল, কইতে পারি না।
আমার মনে হয় বইন।
চুপ কর। যা ইচ্ছা অউক গিয়া।
হামেদ বুঝল আলোচনাটা নাদের পছন্দ করছে না। কিন্তু তার যে কথা বলতে ইচ্ছা। করছে। এরকম শুনশান চক পাথালে হেঁটে যাচ্ছে ছোট ছোট দুটি ভাই, চুপচাপ না হেঁটে কথা বলতে বলতে হটাটা ভাল না! শুরুতে ঠিক বুঝতে পারেনি, অতি উৎসাহে বাপের কাজের ভার আগ বাড়িয়ে নিয়েছিল হামেদ, তখন ডরভয় জিনিসটা বুঝে উঠতে পারেনি কিন্তু বাড়ি থেকে বেরুবার পর থেকেই গা ছমছম করছে। মনের ভিতর থেকে থেকে চমকে ওঠার ভাব। যদিও গ্রাম গিরস্তের বাড়িতে বাগ দিতে শুরু করেছে মোরগ। খানবাড়ির মসজিদ থেকে খানিক আগে ভেসে আসছিল আজানের সুর। সেই সুরে আবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল গ্রামপ্রান্তর। ফজরকালের আকাশ গাছপালা, শস্যের চকমাঠ আর মানুষের উঠান পালান, জলাভূমি বিরানভূমি সবই যেন মগ্ন হয়ে গিয়েছিল সেই সুরে। গিরস্তবাড়ির খোয়াড়ে বাগ। দিতে ওঠা মোরগেরা স্তব্ধ হয়েছিল, গাছপালার আড়ালে গলা খুলতে শুরু করা কাক, উঠোন পালানে চড়তে নামা দোয়েল পাখিরা মৌন হয়েছিল। ফাগুন রাতের শেষপ্রহরের উদাস হাওয়া বইতে বইতে যেন থেমে গিয়েছিল। যতক্ষণ সেই মহান সুর জেগেছিল ততক্ষণ ডরভয় কিছু ছিল না হামেদের। যখনই শেষ হয়েছে আজান তারপরই ভয়টা আবার শুরু হয়েছে। দুইভাইয়ে মিলে কথা বললে ভয় কাটত।
নাদের কথা বলতে চাচ্ছে না। দুইজন মানুষের একজন কথা না বললে আরেকজন বলে কেমন করে! একা একা কি কথা বলা যায়? নাকি একটা গান ধরবে হামেদ। কয়দিন আগে শিখা,
আমার সোনার ময়না পাখি
কোন দেশেতে গেলি উইড়ারে
দিয়া মোরে ফাঁকি রে
আমার সোনার ময়না পাখি!
এসময় গান গাওয়া কি ঠিক হবে!
আচ্ছা ভাইবোনের কথা না হয় না বলল নাদের, অন্যকথা কি বলবে না? ওই যে মা বাবা যে বিষয় নিয়ে কথা বলছিল সেই বিষয়ে কি বলবে না?
হামেদ খুব যেন চিন্তিত হয়েছে এমন গলায় বলল, ওই দাদা, তরে একহান কথা জিগামু?
নাদের গম্ভীর গলায় বলল, কী?
আমরা আহনের আগে মায় যে বাবারে কইলো, পোলা দুইডা এমুন বিয়াইন্না রাইতে ছাড়াবাড়ির সামনে দিয়া যাইবো, হুইন্না বাবায় কইলো…
হামেদের কথা শেষ হওয়ার আগেই নাদের বলল, তুই বোজচ নাই?
যেন কিছুই জানে না হামেদ, যেন কিছুই বোঝে না এমন গলায় বলল, না।
সত্যঐ বোজচ নাই?
সত্যঐ বুজি নাই। তুই আমারে বুজাইয়া ক।
কইতে পারি। ডরাইবি না তো?
গা ছমছম করে উঠল হামেদের। গোপনে একটা টোক গিলল। কোনওরকমে বলল, না ডরামু ক্যা? ডরের কী আছে?
আছে। তয় অহন নাই। আয়জান অইয়া গেছে। ফজরের আয়জান অইয়া গেলে ডরের কিছু থাকে না।
একথা শুনে ভরসা পেল হামেদ। তয় আর কী? ক।
খাড়ো, ছাড়াবাড়ি ছাড়াইয়া লই। এই বাড়ির সামনে দিয়া যাইতে যাইতে কমু না।
আইচ্ছা।
দুইভাই পা চালিয়ে হাঁটতে লাগল। তাদের সামনে বিশাল সব গাছপালা আর ঝোঁপঝাড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নোয়াব আলী পঞ্চায়েতের ছাড়াবাড়ি। দিনের বেলায়ই গা ছমছমে পরিবেশ বাড়িটার, আর রাতেরবেলা তো কথাই নাই। বাড়ির দিকে তাকালেই মনের ভিতর তৈরি হয় ভয়।
