আজিজ বলল, ক্যা? গেলে কী অইছে?
তুমি জানো না কথাডা আমি কীর লেইগা কইতাছি?
বুঝল আজিজ। বুঝেও পাত্তা দিল না। বলল, আরে না। তুমি যা কইতাছো হেইডা অহন নাই। আর অহনঐ আয়জান দিয়া দিবো। আয়জানের লগে লগে…
কথা শেষ না করে নাদের হামেদকে ঠেলে নামাল চৌকি থেকে। যা বাজান যা। দৌড়াইয়া যা। চাচিরে কবি অহন য্যান তগো লগে আইয়া পড়ে। দেরি য্যান না করে।
ততক্ষণে পরির ঘুম ভেঙেছে, পরির ছোট জরির ঘুম ভেঙেছে। মাটির বিছানায় শুধু বানেছার কোলের ছেলের ঘুম ভাঙেনি আর চৌকির ওপর ভাঙেনি কোলেরটার এক বছরের বড়ছেলে বদরুলের। আটজন মানুষের ছয়জনই জাগনা।
জরির স্বভাব হচ্ছে যে-কোনও পরিস্থিতিতেই বোনকে একটা ধাক্কা দেওয়া। এখনও দিল। কী হইছে রে বুজি? মা’র বেদনা উটছে?
কথায় কথায় বোনটিকে ধমকাবার স্বভাব পরির। এখনও ধমকাল। চুপ কর। কথা কবি না।
পরির আওয়াজ পেয়ে বানেছা কঁকাতে কঁকাতে বলল, পরি গো, উটছচ মা? উট। উইট্টা কুপিবাত্তি আঙ্গা? ঘরডা আন্দার।
পরি উঠে কুপি জ্বালাল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দরজা খুলল হামেদ। বাইরে আলোর রেখা ফুটেছে কি ফোটেনি দেখল।
না, এখনও অন্ধকার। এখনও গাছপালা ঝোঁপঝাড় আর উঠান পালানের মাটিতে ডাকছে রাতপোকা। শেষ ফাল্গুনের শীতল হাওয়া বইছে। তালুকদার বাড়ির ওদিককার কোনও এক গাছের আগডালে বসে ডাকছে কোকিল। ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় সেই ডাক ছড়িয়ে যাচ্ছে। দেশগ্রামের দিগ দিগন্তে।
বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে এই অবস্থায় হামেদ হঠাৎ করে আজ বয়সের চেয়ে অনেক বড় হয়ে গেছে। বড়ভাই নাদেরের চেয়ে বড়, মা-বাপের চেয়েও যেন বড় এমন গলায় বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, অহনতরি ম্যালা রাইত। পরি, হারিকেন আঙ্গা। হারিকেন লইয়া যাই।
সংসারের যে-কোনও কাজে পয়সার হিসেবটা আজিজ আগে করে। যে-কোনও কাজে চোখের ভিতর তার খুলতে থাকে সেই অদৃশ্য খেরোখাতা, আশ্চর্য এক হিসাবনিকাশ চলতে থাকেই। সেই হিসেবের জের ধরেই সে বলল, হারিকেন নেওনের কাম কী? চিমনি ফাডা। যুদি পুরা ভাইঙ্গা যায়? আর কেরাসিন তেলের দামও তো আইজকাল ম্যালা! দুই ভাইয়ে যাইতাছস, হারিকেন লাগবো ক্যা? মেন্দাবাড়ি ছাড়াইয়া যাইতে যাইতেঐত্তো ফসসা হইয়া যাইবোনে। আর চকে নামলে দেখবি চাইরমিহি ফকফইক্কা। হারিকেন নেওনের কাম নাই। বাজান। যা, মেলা দে।
ছেলের পক্ষ নিল বানেছা। আগের মতোই কঁকাতে কঁকাতে স্বামীকে একটা ধমক দিল। তুমি চুপ করো, তুমি কথা কইয়ো না। ওই পরি, হারিকেন আঙ্গাইয়া ভাইর হাতে দে। তাড়াতাড়ি কর।
দ্রুতই কাজটা করল পরি।
ঘুম ভাঙার পর একটাও কথা বলেনি নাদের। যা বলার হামেদই বলে যাচ্ছে। হারিকেন হাতে নিয়ে নাদেরকে সে বলল, ল দাদা, মেলা দেই। আয়।
নাদের তবু কথা বলল না। নিঃশব্দে হামেদের সঙ্গে উঠানে নামল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের ভিটির পিছন দিককার মটকুরা গাছের ডালপালার আড়ালে বসা একটা কাক দুইবার নরম গলায় কা কা করেই থেমে গেল।
বানেছার ব্যথা তখন আরেকটু বেড়েছে। ফলে মেজাজও খারাপ হয়েছে। ছেলেরা বেরিয়ে যাওয়ার পর আজিজ ফিকির করছিল ছোট ছেলের পাশে শুয়ে ঘণ্টা-দুই ঘণ্টার আরেকটা ঘুম দিয়ে ফেলবে। সেই ফাঁকে ছেলেরা ফিরে আসবে আলার মা’কে নিয়ে, সেই ফাঁকে উত্তরের ভিটির ভেঁকিঘরে নাড়ার উপর ছেঁড়াখোঁড়া হোগলা বিছিয়ে তার উপর আলার মা ধরণী বানেছাকে শুইয়ে গর্ভের অন্ধকার থেকে আলোকময় পৃথিবীতে টেনে হিঁচড়ে আনবে ছোট্ট নতুন একজন মানুষকে। ঘুমের তালে আজিজ কিছু টেরই পাবে না।
মতলবটা আজিজের কাজে লাগাতে দিল না বানেছা। তিরিক্ষি মেজাজে আচমকাই খ্যা খ্যা করে উঠল। আবার হুইতে চাইতাছো? ওই গোলামের পো, তর পোলাপান জন্ম দিতে বেদনায় মরি আমি আর তুই হুইয়া ঘুমাবি? উঠ, তাড়াতাড়ি উঠ। তুই নিজে গিয়া উত্তরের ঘরে আমার বিচনা কইরা দিবি। আহুজ পড়নের আগে পরের বেবাক কাম আইজ তরে দিয়া করামু আমি।
আজিজ অনুমানই করতে পারেনি হঠাৎ করে এই ধরনের আক্রমণের শিকার হবে। থতমত খেল সে, মিইয়ে গেল। শুয়ে পড়ার মতলব আর চোখের ঘুম কোথায় উধাও হয়ে গেল। মিনমিন গলায় কোনওরকমে বলল, তুমি এত চেইত্তো না। করতাছি, সব করতাছি আমি।
শিশুর মতন লেছড়ে পেছড়ে চৌকি থেকে নামল আজিজ। পরিকে বলল, পরি, কুপিডা লইয়া আমার লগে আয় মা। জরি, তুইও আয়। বেবাকতে মিলা কাম কাইজগুনি আউগাইয়া রাখি। আমরা কাম করতে করতে দেকবি আলার মা চাচিও আইয়া পড়ছে।
তিনজন মানুষ ঘর থেকে বেরুতে যাবে পরিকে বানেছা বলল, চাচি আহনের পর আমি ওই ঘরে গেলেগা তুই বেবাকতেরে লইয়া হাজামবাড়ি যাবি গা। আমার আহুজ পড়নের পর তর বাপে গিয়া তগো ডাইক্কা লইয়াইবো। তারবাদে রান্ধন বাড়ন করবি তুই। খালি আউজকার দিনডাঐ। কাইল থিকা আমিঐ আবার সব করুমনে।
পরি ধীরশান্ত গলায় বলল, আইচ্ছা।
তখনই এই ঘরের পুব-দক্ষিণ দিককার পিড়ার গর্তে মোরগমুরগির জন্য তৈরি করা খোঁয়াড়ে বসে ডাকাবুকা মোরগটা গলা খুলে বাগ দিয়ে উঠল। কুক কুরুক কুক।
.
মোবাড়ির উত্তর দিককার চকে নেমে হামেদ বলল, ওই দাদা, হারিকেনডা না আনলেও অইতো।
ঘুম ভাঙার পর, বাড়ি থেকে বেরিয়ে এতদূর আসার পর এই প্রথম কথা বলল নাদের। ক্যা?
