কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিশাহারা ভঙ্গিতে উঠে বসলেন দেলোয়ারা। মাথার কাছ থেকে চশমা নিয়ে পরলেন। কারে ওঠার সিঁড়ির কাছ থেকে হারিকেন এনে কাঁটা ঘুরিয়ে হারিকেনের আলো বাড়িয়ে মাঝারি সাইজের আলমারিতে রাখা একটা কৌটা থেকে চাবি বের করে ছোট আলমারিটা খুললেন। খুলে দ্রুত হাতে দলিল দস্তাবেজের আড়াল থেকে বের করলেন সেই কয়েকখানা পোস্টার আর কাগজে জড়ানো ব্লকটা। হারিকেনের উসকে দেওয়া আলোয় পোস্টার খুলে বসলেন।
আজকালকার দিনের পোস্টারের মতো না পোস্টারগুলি। বইয়ের পৃষ্ঠার চেয়ে একটুখানি লম্বা, একটুখানি চওড়া। অতি সস্তা কাগজে ছাপানো বলে এত যত্নে রাখার পরও কেমন। আবছা হয়ে গেছে লেখা ছবি। ভাজ দিয়ে রাখা জায়গাটা কবে কখন আপনা আপনি ছিঁড়ে গেছে!
তবু লেখাগুলির দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলেন দেলোয়াররা, আবদুল মজিদের আবছা হয়ে যাওয়া ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই তো সেই মানুষ জীবনটা যে একেবারেই তছনছ করে দিয়ে গেছে। কেন? কী দোষ ছিল দেলোয়ারার?
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবদুল মজিদকে এসব কথা কখনও জিজ্ঞাসা করা হয়নি। আজ এতকাল পর আবদুল মজিদের প্রায় মুছে যাওয়া ছবির দিকে তাকিয়ে কথাগুলি দেলোয়ারা বলে ফেললেন। কী করছিলাম আমি? কোন দোষে আপনে আমার জীবনডা এমুন কইরা দিলেন? একবারও আমার কথা আপনে ভাবেন নাই ক্যান, একবারও মাইয়াড়ার কথা ভাবেন নাই ক্যান? আরেকজনরে লইয়া নিজে তো নিজের লাহান সুখে থাকলেন, আমারে ক্যান ঠেইলা দিলেন সারাজীবনের দুঃখে! একটা জীবন যে আমার বৃথা গেল একবারও এই কথাডা আপনে ভাবলেন না!
কোন ফাঁকে যে চশমার তলা দিয়ে চোখের পানি গড়িয়ে নামল টের পেলেন না। দেলোয়ারা। মুখ নিচু করে পোস্টারের দিকে তাকিয়েছিলেন বলে তার চোখের পানি টপটপ করে পড়তে লাগল আবদুল মজিদের আবছা হয়ে যাওয়া ছবির ওপর।
.
ভোররাতে বানেছার ধাক্কা খেয়ে চৌকির বিছানায় উঠে বসল আজিজ। ঘুমভাঙা নির্বিকার গলায় মিনমিন করে বলল, কওন লাগবো না। বুজছি।
ঘণ্টার কাছাকাছি সময় আগে বেদনা উঠেছে বানেছার। এই নিয়ে সাতবার। তবু সেই প্রথমবারের মতন, প্রতিবারের মতন এবারও শুরুতে ব্যাপারটা সে চেপে রাখার চেষ্টা করেছে। যেন চেপে রাখলে গোপনেই মিটে যাবে সব। আপছে তার মাটির বিছানায় অন্যান্য পোলাপানের পাশে এসে শোবে আরেকজন। এখন যে কোলে আছে, সময়ে অসময়ে মায়ের বুকের দুধ নিয়ে যার খাবলা খাবলি সে মন খারাপ করে চলে যাবে দূরে, নতুনটা এসে সেই জায়গার দখল নিবে।
কোনওবারই এরকম হয় না। যে আসে জানান দিয়েই আসে। বানেছা চেপে রাখতে পারে না। স্বামীকে ডাকতে হয়ই।
আজও হল।
মাটির বিছানায় দুই মেয়ে আর কোলের ছেলে নিয়ে শুয়েছিল বানেছা। এই অবস্থায় বেদম ভারী হয়ে আসা তলপেট দুইহাতে চেপে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল। চৌকির ওপর তিনছেলের মধ্যিখানে শুয়ে থাকা স্বামীকে ধাক্কা দিল।
ধাক্কা খেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই উঠল আজিজ। কথা দুইটা বলল। শুনে এই অবস্থায়ও বানেছা বেশ অবাক হল। মুখে মৃদু করুণ ধরনের গোঙানি ছিল। তবু বলল, কেমতে বুজলা?
আজিজ একটা হাই তুলল। তুমি উসপিস উসপিস করতাছিলা হেইডা আমি উদিস পাইছি।
তুমি তাইলে জাইগগা আছিলা?
না জাইগগা গেছি।
তয় ইট্টু পুরানবাড়ি যাও। আলার মা’রে লইয়াহো।
আজিজ আড়মোড় ভাঙল। বউয়ের পোলাপান হচ্ছে এটা তার কাছে এখন আর আগ্রহের ব্যাপার না। বরং সে খুবই বিরক্ত হয়। যদিও বানেছার ভয়ে মুখ খোলে না, গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সংসারে আরেকজন এল, খাদ্যে ভাগ বসাবার একজন মানুষ বাড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চোখের অনেক ভিতরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য খেরোখাতার কয়েকটা পৃষ্ঠাও ফরফর করে খুলে যায়। আশ্চর্য এক হিসাবনিকাশ চলতে থাকে।
এখনও, এই ভোররাতের আবছা আলো আঁধারি ঘরের চৌকিতে বসে থাকা আজিজের চোখের খুব ভিতরে আস্তে ধীরে খুলছিল সেই অদৃশ্য খেরোখাতা। তবু খুবই দায়সারা গলায় আজিজ বলল, বিয়াইন্না রাইত্রে গিয়া ডাইক্কা উডামু, নাকি ইট্টু দেরি করবা? ইট্টু ফসসা অইলে বাইর হই।
বানেছা মুখ ঝামটাল। এইডা কি হাগামুতা যে চাইপ্পা থাকুম? তুমি গেলে যাও নাইলে আমি পোলাগো ডাক দেই। অগো পাড়াই।
তারপরও একটু দোনোমোনো আজিজ করতে চাইল, এই অবস্থা থেকে তাকে বাঁচিয়ে দিল মেজ ছেলে হামেদ। মা-বাবার কথাবার্তায় ঘুমটা তার ভেঙে গিয়েছিল। মায়ের বেদনা উঠেছে, নতুন একজন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজির হবে সংসারে। বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বছর বছর এরকমই দেখে আসছে সে, ব্যাপারটা তার কাছে নতুন কিছু না। তবু আজ এই ভোররাতে নতুন একজন মানুষ আসছে সংসারে, বিষয়টা হামেদকে উত্তেজিত করল। বলল, বাবার যাওনের কাম নাই। আমি আর দাদায় যাই।
ছেলের কথা শুনে আজিজ বেঁচে গেল। গদগদ গলায় বলল, হ যা বাজান, যা। তরা দুই ভাইয়েঐ যা। পোলাপান বড় অইলে মা-বাপের অনেক কাম তাগো করতে অয়।
একপাশে শুয়ে থাকা বড়ছেলে নাদেরকে ডাকল আজিজ। নাদু, উঠ বাজান, উঠ। দুই। ভাইয়ে মিলা পুরানবাড়ি যা।
নাদেরেরও ততক্ষণে ঘুম ভেঙেছে। চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসল সে। কিন্তু বাগড়া দিল বানেছা। এতডু এতডু পোলা দুইডা এমুন বিয়াইন্না রাইতে ছাড়াবাড়ির সামনে দিয়া যাইবো?
