মুকুল সমিতি প্রতিষ্ঠার দিনটি এখনও স্পষ্ট মনে আছে দেলোয়ারার। ২৭ মার্চ ১৯৫৭ সাল। সেদিন পুরানবাড়ির মাঠে উদ্বোধনী সভার আয়োজন হল। প্রধান অতিথি শেখ মুজিবুর রহমান। সব ব্যবস্থা মজিদই করলেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব আসতে পারলেন না। যুক্তফ্রন্টের আমল। কী কাজে শেখ সাহেব গেছেন করাচিতে। তার জায়গায় অতিথি হয়ে এলেন কোরবান আলী সাহেব। গ্রামে সাড়া পড়ে গেল।
এসব পছন্দ করছিলেন না আম্বিয়া খাতুন। দেলোয়ারারও ভাল লাগছিল না। তাঁরা চাইছিলেন যে কথা বলে বিয়ে করেছেন মজিদ সেই কাজটাই তিনি ঠিকঠাক মতন করুন। পড়াশুনা। মাঝেমধ্যে এসব নিয়ে মজিদের সঙ্গে কথাও বলতেন আম্বিয়া খাতুন, দেলোয়ারাও বলতেন। কিন্তু কারও কথাই তেমন পাত্তা দিতেন না মজিদ। গিয়াসউদ্দিন সাহেবের সঙ্গেও ততদিনে সম্পর্ক সুন্দর করে নিয়েছেন মজিদ। মিষ্টি করে দুলাভাই ডাকেন। তাঁকে, আনোয়ারাকে ডাকেন আপা। গিয়াসউদ্দিন সাহেবের ছেলেমেয়েরা মজিদকে খালু ডাকে না, ডাকে মামা। মজিদ মামা। গিয়াসউদ্দিন সাহেবের মেজোছেলে মিলুকে খুবই আদর করেন মজিদ। ঢাকায় থাকা অবস্থায় মিলুর টানে হস্টেল ফেলে কখনও কখনও জিন্দাবাহারের ওই একরুমের বাসায় গিয়েও অনেকদিন থেকেছেন।
এসবের ফাঁকে হাতারপাড়ার সেই বোনের বাড়িতে একবার যেতে হয়েছিল দেলোয়ারাকে। দুইদিন থাকতে হয়েছিল স্বামীর বড়বোনের বাড়িতে। বোন পালকি পাঠিয়েছিলেন। ছোটভাইর বউর জন্য যা যা করার সব করেছিলেন। বেদম স্নেহমমতা, আদরযত্ন।
আজও পরিষ্কার মনে আছে সেই দুইটা দিনের কথা। শ্বশুরবাড়ি বলতে যা বোঝায়, পালকি চড়ে প্রকৃত শ্বশুরবাড়িতে কখনও যাওয়া হয়নি দেলোয়ারার, যাওয়া হয়েছিল ননাসের বাড়িতে। সেই যাওয়াই সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে আছে দেলোয়ারার। এত দুঃখময় জীবনের পরও সেই দুইটা দিনের কথা ভেবে এখনও অভিভূত হন তিনি। এখনও মনটা অন্যরকম হয়।
বিএ পড়ার আগ থেকেই মজিদ ঝুঁকে গিয়েছিলেন ছাত্র রাজনীতির দিকে। হস্টেলের এক বন্ধুর সঙ্গে একবার কী এক গন্ডগোল হল। বন্ধু তাঁর নামে কেস দিল ঢাকার কোতোয়ালি থানায়। ষোলো-সতেরো দিন জেল খেটে এলেন মজিদ। সেই সময় গিয়াসউদ্দিন সাহেব একদিন ছোট্ট মিলুকে নিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে গেলেন ভায়রাকে দেখতে। জেলের গরাদ ধরে এমন কান্না কাঁদলেন মজিদ, এমন অনুরোধ করলেন গিয়াসউদ্দিন সাহেবকে, যেমন করে থোক জেল থেকে যেন তাকে ছাড়ানো হয়।
ইস, কী উৎকণ্ঠার দিন সেইসব। জেল থেকে আসামি ছাড়াবার জন্য যে যা বলছে তাই শুনছেন আম্বিয়া খাতুন, তাই শুনছেন আনোয়ারা দেলোয়ারা। টাকাপয়সা যেখানে যা ছিল নিয়ে আম্বিয়া খাতুন ঢাকায় এসে বসেই রইলেন ছোট জামাইকে ছাড়াবার জন্য।
সেই ফাঁকে এক দুপুরে পাশের ঘরের তালেব আলী পুলিশ বিশটা টাকা খেয়ে ফেলল আম্বিয়া খাতুনের। পুলিশের পোশাক পরে ডিউটি থেকে ফিরে আচমকা বলল, কোন এক বড় সাহেবকে এখনই গিয়ে নগদ বিশটাকা ধরিয়ে দিলে আজ বিকালেই মজিদ ছাড়া পেয়ে যাবে।
গিয়াসউদ্দিন সাহেব তখন অফিসে।
আম্বিয়া খাতুন সরল বিশ্বাসে বিশটাকা দিয়ে দিলেন। অফিস থেকে ফিরে কথাটা শুনে ওই উৎকার দিনেও হাসলেন গিয়াসউদ্দিন সাহেব। শাশুড়িকে বললেন, টাকা কুড়িটা পানিতে গেছে।
হলও তাই। সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফিরে তালেব আলী বলল, টাকা খেয়ে চেষ্টাটা সাহেব ঠিকই করেছেন কিন্তু কাজ হয়নি।
সবাই বুঝল টাকাটা আসলে তালেব আলী নিজেই খেয়েছে।
আজ রাতে এসব কথা একটার পর একটা মনে পড়ছিল দেলোয়ারার।
এখন কত রাত কে জানে! দেলোয়ারা শুয়ে আছেন কেবিনে, লেপের তলায়। তার পায়ের দিকে দুইখানা আলমারি। একটা মাঝারি সাইজের আর একটা ছোট। কারে ওঠার সিঁড়ির কাছে টিমটিম করে জ্বলছে হারিকেন। ম্লান একখানা আলো ফুটে আছে কেবিনে। নিরীহ ধরনের বয়স হওয়া একটা বেড়াল আছে দেলোয়ারার। সাদা রঙের। দেলোয়ারার পায়ে পায়েই থাকে। দেলোয়ারা যখন কেবিনে ঢোকেন, বিড়ালটাও ঢোকে। ঘুমায়ও দেলোয়ারার গা ঘেঁষে। এখন শুয়ে আছে দেলোয়ারায় বাঁপাশে, লেপের উপর। আরামে ঘরঘর শব্দ করছে। ঘুমন্ত বিড়ালের এইটুকু শব্দ ছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নাই। খাটালে ঘুমাচ্ছে বাদলা, বারান্দায় রাবি আর মতলা। কারও কোনও শব্দ নাই। বাইরে একটা রাতপাখিও ডাকে না কোথাও, গিরস্ত বাড়ির কুকুররা ঘেউ দেয় না, শিয়াল ডাকে না। শেষ হয়ে আসা শীতের আমেজে সবকিছুই চুপচাপ। শব্দ পাওয়া যায় শুধু ঝিঁঝির। অবিরাম ডেকে যাচ্ছে।
এই অবস্থায় হঠাৎ করেই দেলোয়ারার মনে পড়ল আর একটা ঘটনা। তাঁর বিয়া হল। ছাপ্পান্ন সালে, সেটা বোধহয় আটান্ন সালের ঘটনা। নিজেকে হঠাৎ করেই ছাত্রনেতা বলতে শুরু করলেন আবদুল মজিদ। শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকাপয়সা নিয়েও বিএ পরীক্ষা না দিয়ে, নানা রকমের তালবাহানা, নিজের মেয়েকে গলা টিপে ধরা ইত্যাদি ইত্যাদি সেরে আচমকাই ছাত্রনেতা বনে গেলেন। নিজের ছবির ব্লক করে ছোট্ট একটা পোস্টার ছাপালেন। সেই পোস্টারের কারণেই কিনা পুলিশ তাঁকে খুঁজতে লাগল। কয়েকখানা পোেস্টার আর ব্লক হাতব্যাগে ভরে মজিদ চলে এলেন শ্বশুরবাড়ি।
এই ঘটনা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেপের তলায় দেলোয়ারা কেমন কেঁপে উঠলেন। সেবার বাড়ি ফিরে সেই কয়েকখানা পোস্টার আর কাগজে জড়ানো ব্লকটা দেলোয়ারার কাছে। রাখতে দিয়েছিলেন মজিদ। অতিযত্নে জিনিসগুলি কেবিনের তালাবন্ধ ছোট আলমারিটার। নীচের তাকে বাড়ির পুরনা দলিল দস্তাবেজের সঙ্গে রেখে দিয়েছিলেন দেলোয়ারা। এই এতগুলি বছরে আর কখনও খুলে দেখা হয়নি। আজও সেই জায়গাটাতেই আছে।
