আম্বিয়া খাতুন চমকে উঠলেন। কন কী খোকার বাপ? দেলরার বিয়া আর আপনে যাইবেন ঢাকা!
হ যাইতে অইবো। ছুটি শ্যাষ। আউজকা গিয়া জয়েন না করলে চাকরি থাকবো না।
আউজকা গিয়া কেমতে জয়েন করবেন? অহন মাওয়ার ঘাট থিকা লঞ্চে উটলে ঢাকা গিয়া নামবেন বিয়ালে। অফিসে যাইবেন কুনসুম?
অফিসে যামু কাউলকা।
এইডা কোনও কথা অইলো?
কী করুম, এইডা ছাড়া উপায় নাই। চাকরি নষ্ট করতে পারুম না। আর আমি না থাকলেঐ কী? বেবাকতেঐত্তো আছে।
তারপরও নানারকমভাবে জামাইকে আটকাতে চেয়েছেন আম্বিয়া খাতুন, মেয়েকে বলেছেন জামাইকে ফিরাতে, দেলোয়ারাকে বলেছেন দুলাভাইকে ফিরাতে। কেউ পারেনি। আম্বিয়া খাতুনকে কদমবুসি করে মন্তাজউদ্দিনের বাড়ির ওপর দিয়ে পুবদিককার হালটে গিয়ে উঠলেন গিয়াসউদ্দিন সাহেব। এখান থেকে পায়ে হেঁটে মাওয়া, মাওয়া থেকে লঞ্চে ঢাকা।
স্বামীর পিছু পিছু হালট পর্যন্ত এসেছিলেন আনোয়ারা। নানারকম ভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন তাঁকে। এইডা আপনের ঠিক অইতাছে না। মাইনষে কইবো কী? জামাই আপনের পছন্দ অয় নাই, ঠিক আছে। বিয়াশাদি মাইনষের ভাইগ্যের ব্যাপার। যার ভাইগ্যে যেহানে আছে ওহানেই বিয়া অইবো। আপনে যে এইডা মাইন্না নিতাছেন না হেইডা মাইনষেরে বুজানের কাম কী? আইজ বিয়া অইয়া যাউক, আপনে কাইল যান।
স্ত্রীর কথা তোয়াক্কাই করলেন না গিয়াসউদ্দিন সাহেব। ফিরেও তাকালেন না। পা চালিয়ে মাওয়ার দিকে হাঁটতে লাগলেন।
আনোয়ারার তখন চোখ ভেসে যাচ্ছে। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে তিনি দেখলেন হজরতদের বাড়ির সামনের খালের ওপরকার ভাঙাচোরা বাঁশের সাঁকোয় চড়েছেন গিয়াসউদ্দিন সাহেব। টলমল পায়ে সাঁকো পেরিয়ে যাচ্ছেন।
বিয়েতে গিয়াসউদ্দিন সাহেব থাকলেন না ঠিকই কিন্তু বিয়ে দেলোয়ারার হল ব্যাপক ধুমধাম করে। আর সেই যে বিয়ের আগের দিন মতিউর আর মোস্তফাঁকে নিয়ে এই বাড়িতে এসে উঠলেন আবদুল মজিদ, বন্ধুকে বিয়ে করিয়ে মতিউর মোস্তফা বিয়ের দুইদিন পর ঠিকই যে যার বাড়িতে ফিরে গেল আবদুল মজিদ আর কোথাও গেলেন না। এই বাড়িতেই থান গেড়ে বসলেন।
যাবেনই বা কোথায়? যাওয়ার জায়গা বলে কিছুই ছিল না তার। যে বাড়িতে জাইগির থেকে পড়তেন সেই বাড়িতে যাওয়ার কারণ ছিল না। বড়বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। সে থাকে তার শ্বশুরবাড়ি হাতারপাড়া গ্রামে। অবস্থা ভাল। তবে ছোট দুই ভাইয়ের খবর সে রাখে না। মজিদ তো বিয়েশাদি করে পায়ের তলায় শক্তমাটি পেয়ে গেল। কিন্তু ছোটভাই হামেদ!
কামারগাঁও না ভাগ্যকুল কোন গ্রামে যেন স্বচ্ছল এক গৃহস্থ বাড়িতে কাজ করত মজিদের ছোটভাই আবদুল হামেদ। কাজ করত আর স্কুলে পড়ত। একবার দেলোয়ারাদের বাড়িতে সে এসেওছিল। সেই আসাটা ছিল এক আশ্চর্য যোগাযোগ। যে বাড়িতে সে কাজ করত সেই বাড়ির কারও খুব অসুখ হয়েছিল। অসুখের কথা বলে ওষুদ নিতে অতদূর গ্রাম থেকে হামেদকে তারা পাঠিয়েছিল মনীন্দ্র ঠাকুরের কাছে। হামেদের পরনে ছিল ঢলঢলা একটা। হাফপ্যান্ট আর ছেঁড়া ময়লা নোংরা স্যান্ডো গেঞ্জি। মনীন্দ্র ঠাকুরের ঘরে ঢুকে ওষুদের আশায় বেঞ্চে বসেছিল। মনীন্দ্র ঠাকুরের স্বভাব ছিল অচেনা মানুষের সঙ্গে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কথা বলা। অসুখের কথা জানার ফাঁকে ফাঁকে হামেদের কথাও জানার চেষ্টা করছিলেন। তিনি।
কথায় কথায় হামেদ বলে ফেলল এই গ্রামে তার ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। শুনে তীক্ষ্ণচোখে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়েছেন ঠাকুর। তাকিয়ে দেখতে পেলেন মজিদের সঙ্গে চেহারার খুব মিল। যা বোঝার বুঝে গেলেন। রোগীর ওষুধ না দিয়ে হামেদকে নিয়ে এলেন দেলোয়ারাদের বাড়ি।
তখন পড়ন্ত বিকাল। শ্বশুরবাড়ির বড়ঘরের বারান্দায় চেয়ারে বসে মজিদ তখন শাশুড়ির রান্না করা মুরগির রান খাচ্ছিলেন। মনীন্দ্র ঠাকুরের সঙ্গে হামেদকে দেখে খুবই বিরক্ত হলেন। আপন ছোট ভাইর সঙ্গে ব্যবহারটা করলেন এমন যেন সে কোনও মানুষই না, সে যেন কুত্তা বিলাই। মজিদের ব্যবহারে হামেদ অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে রইল আর মনীন্দ্র ঠাকুর এবং আম্বিয়া খাতুন রইলেন হতবাক হয়ে।
তারপরও দুইদিন এই বাড়িতে হামেদকে রেখে দিয়েছিলেন আম্বিয়া খাতুন। মাওয়ার বাজার থেকে নতুন হাফপ্যান্ট আর শার্ট কিনে এনে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন হামেদও তার ভাইর সঙ্গে এই বাড়িতে থেকে যাক। থাকতে হামেদ রাজিও হল। তবে যে বাড়িতে সে থাকে সেই বাড়িতে ওষুদটা পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে আর তাদেরকে বলে আসতে হবে।
সেই যে ওষুধ পৌঁছাতে আর বলে আসতে গেল হামেদ, ইহজনমে আর মেদিনীমণ্ডল গ্রামে ফিরল না। নিশ্চয় ভাইয়ের ব্যবহারে বুকটা পুড়ে তার কয়লা হয়ে গিয়েছিল। গিরস্ত বাড়ির রাখাল হয়ে থাকা ভাল, তবু এরকম ভাইয়ের মুখ দেখা উচিত না।
আর মজিদের বড়বোনের ক্ষেত্রে ঘটেছিল অন্য ঘটনা। সেই বোন জানতই না মজিদ এভাবে বিয়ে করেছে। আত্মীয়স্বজনরাও কেউ জানত না। এসব ঘটনা দেলোয়ারাদের কানে। এল বিয়ের অনেকদিন পর। ততদিনে মজিদ ঢাকায় গিয়ে কায়দে আজম কলেজে ভরতি হয়ে গেছে। হস্টেলে থাকে। তবে কলেজ সে করেই না, শ্বশুরবাড়িতে এসে পড়ে থাকে। গনি হামিদ ননীর সঙ্গে দুস্তি, সেরু জহু নজুও আছে। পুরানবাড়ির খবির দবির আছে। সমবয়সিদের নিয়ে নাটক ফাংশান করে মজিদ। খানবাড়ির ছেলেরা ‘প্যারাডাইস ক্লাব’ করল দেখে দেলোয়ারাদের বাড়িতে সে করল ‘মুকুল সমিতি’। মুকুল সমিতির উপদেষ্টা আবদুল মজিদ নিজে আর সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন গনি।
