তিনদিনের দিন দুপুরের পর মজিদকে এনে হাজির করলেন মন্তাজউদ্দিন। সঙ্গে মতিউর ছাড়াও আছে মজিদের আরেকজন দোস্ত, মোস্তফা।
আম্বিয়া খাতুন মজিদকে দেখে মুগ্ধ। বাড়ির সবার অবস্থাও আম্বিয়া খাতুনের মতোই। আনোয়ারাও পছন্দ করলেন মজিদকে, কিন্তু তার স্বামী গিয়াসউদ্দিন সাহেব কোনও কথা বললেন না।
বাড়ির মহিলারাও আড়াল আবডাল থেকে দেখছিল মজিদকে। চোখে মুখে মুগ্ধতা সবার। হাসিহাসি মুখে এ ওর সঙ্গে হাকিকি করছে। মজিদকে নিয়ে আলোচনার জন্য বিভিন্ন বয়সির বিভিন্ন দল হয়েছে। আম্বিয়া খাতুনের পাশে আছেন তাঁর দুই জা, পাশের বাড়ি থেকে এসেছেন আমিনুলের মা, তিনি আছেন দেলোয়ারার সঙ্গে। আনোয়ারাও আছে দেলোয়ারার পাশে, তার পাশে আছে হাফেজের বউ। আকতার আর ভানু গলাগলি করে হাঁটছে বারবাড়ির দিকে। গনি হামিদ ননী আছে একদলে, তাদের সঙ্গে আছে সেরু জহু। নজু। রব মোতালেব তালেব, ছানা সেন্টু জাহাঙ্গির ওদের সঙ্গে আছে এনামুল। মিলুকে কোলে নিয়ে ঘুরছে ফতির মা। দলিল মন্নাফেরা আছে গিয়াসউদ্দিন সাহেবের পাশে। মনীন্দ্র ঠাকুর এসেছেন, পুরানবাড়ির নোয়াব আলী এসেছেন, সব মিলে জমজমাট অবস্থা।
মজিদের সঙ্গে কথাবার্তা যা বলার মনীন্দ্র ঠাকুরই বলছিলেন। কথায় পটু লোক তিনি। নানারকম মারপ্যাঁচ দিয়ে কথা বলছিলেন। মজিদের ওই এক কথা, আমি লেখাপড়া করতে চাই, বিএ এমএ পাশ করতে চাই। এ ছাড়া জীবনে আমার কিছু চাওয়ার নাই। আপনারা আমার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলে বিয়ে করতে আপত্তি নেই। মেয়েও দেখতে চাই না।
মজিদের পরিষ্কার কথা শুনে আম্বিয়া খাতুনের দিকে তাকালেন মনীন্দ্র। আম্বিয়া খাতুন চোখ ইশারা করলেন। অর্থাৎ তিনি রাজি। মনীন্দ্র তবু কথার প্যাঁচটা ছাড়লেন না, চালিয়েই গেলেন। ঠিক আছে তোমার লেখাপড়ার দায়িত্ব আমরা নিমু। তুমি তোমার গার্জিয়ানগো লইয়া আসো। তাগো লগে কথাবার্তা কই।
এক পলক মনীন্দ্রর দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল মজিদ। আমার কোনও গার্জিয়ান নাই। আমি আমার গার্জিয়ান।
তোমার যে তেমুন কোনও আত্মীয়স্বজন নাই সেই খবর আমরা পাইছি। তয় তোমার তো বড় বইন আছে, বইনজামাই আছে তাগো নিয়াসো।
না তাগোও আমি আনতে চাই না।
ক্যা? অসুবিদা কী?
আমার ব্যাপারে অন্যের চিন্তা ভাবনা আমি ডিজলাইক করি।
ডিজলাইক কথাটা অনেকে বুঝল না। মনীন্দ্র ঠাকুর হাসিমুখে শব্দের অর্থটা বুঝিয়ে দিলেন। তারপর আবার মজিদকে নিয়ে পড়লেন। গার্জিয়ান ছাড়া মাইয়া তোমার কাছে আমরা কেমতে দেই, কও?
মাইয়া তো আপনেরা দিতাছেন না। মাইয়া এই বাইত্তে থাকবো। আমি আমার স্টাডির লেইগা চইলা যামু ঢাকায়। মাঝে মাঝে শ্বশুরবাড়িতে আসবো।
মজিদের এই ধরনের কথা অনেকের কাছেই ভাল লাগছিল না। একে নিজের বিয়ের সব কথা নিজেই বলছে তার ওপর শ্বশুরবাড়িতে থাকাটাকা ইত্যাদি কেমন যেন শোনাচ্ছিল। এই ধরনের কথা সবচেয়ে অপছন্দ গিয়াসউদ্দিন সাহেবের। তিনি খুবই চাপা স্বভাবের মানুষ। তবে তাঁর মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেছে। দলিল মন্নাফের পাশ থেকে নিঃশব্দে উঠে বাগানের দিকে চলে গেলেন তিনি। স্বামীকে ওভাবে চলে যেতে দেখে আনোয়ারা ব্যাপারটা বুঝলেন। তিনিও গেলেন পিছু পিছু। গিয়াসউদ্দিন সাহেবের তামাক খাওয়ার অভ্যাস। আনোয়ারা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনেরে তামুক সাইজ্জা দিমু?
গিয়াসউদ্দিন সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, দেও।
আনোয়ারা তামাক নিয়ে আসার পর স্ত্রীকে বললেন, এমুন একখান বেদ্দপের কাছে মাইয়া বিয়া দেওনের লেইগা আম্মায় পাগল হইয়া গেছে ক্যা? তোমার বইনের কি বিয়া অইবো না?
আনোয়ারা বললেন, যার মাইয়া হেয় যুদি দিতে চায় আমগো অসুবিদা কী? দেউক।
অসুবিদা আছে।
কীয়ের অসুবিদা?
বেদ্দপটা আমার ভায়রা অইবো।
তখনই ফতির মা এসে ডাকল আনোয়ারাকে। ওই আনোরা, তর মায় তরে ডাক পাড়ে। জামাইরেও যাইতে কয়।
হুঁকা রেখে তারা বড়ঘরে গিয়ে ঢুকেছে। মজিদের সঙ্গে দেলোয়ারার বিয়ে ততক্ষণে পাকা। কাল দুপুরে বিয়ে হবে। মজিদ তার দুই বন্ধুসহ এই বাড়িতেই থাকবে আজ। কাল দুপুরে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর কয়েকদিন এই বাড়িতে থেকে ঢাকা যাবে কলেজে পড়তে।
বেশ একটা সাজ সাজ রব পড়ল বাড়িতে। বিয়ের আয়োজনে যে যার মতো ব্যস্ত হল। মাওয়ার বাজারে গিয়ে সেই রাতেই হ্যাঁজাগবাতি নিয়ে এল গনি হামিদ ননী। সেরু জহু খাসি কিনে আনল দোগাছির এক গিরস্ত বাড়ি থেকে। মশলা বাটতে বসে গেল বাড়ির মহিলারা। হাজামবাড়ির অজুফা এসে বসল পিঁয়াজ কাটতে। মনীন্দ্র ঠাকুর কাজির পাগলা থেকে মাইক নিয়ে এলেন গানবাজনার জন্য। কিছু বমও আনলেন। রব মোতালেবরা ঠাসঠুস করে ফোঁটাতে লাগল সেইসব বম। হ্যাঁজাগের শো শো শব্দ আর ফকফকা সাদা। আলোয় মেন্দাবাড়ির চেহারা বদলে গেল।
এসবের মধ্যে কেবল বিষণ্ণ হয়ে আছেন একজন, গিয়াসউদ্দিন সাহেব। মজিদকে তাঁর পছন্দ হয়নি। একমাত্র শালির এরকম বিয়ে তার ভাল লাগছে না। সারারাত হ্যাঁজাগবাতির পাশে বসে মাইকে ‘নিমাই সন্ন্যাসীর পালা’ শুনলেন চুপচাপ আর মাঝে মাঝে নিজেই সাজিয়ে তামাক খেলেন। তারপর সকালবেলা ব্যাগ হাতে আম্বিয়া খাতুনের সামনে গিয়ে। দাঁড়ালেন। আমার যে ঢাকা যাইতে অয় আম্মা!
