তখন বসন্তকাল। ফাল্গুন মাসের মন কেমন করা বিকালবেলা। আনোয়ারা স্বামী সন্তান নিয়ে দেশে এসেছে বেড়াতে। দুপুরের ভাত খেয়ে গিয়াসউদ্দিন সাহেব চলে যান ফুফাতো সম্বন্ধী দলিল মন্নাফ সাত্তার জলিলদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। এনামুল এই এত্তটুকু। বাড়ির অন্যান্য শরিকের পোলাপান ছানা সেন্টু রব মোতালেব তালেব জাহাঙ্গির এনামুলের বয়সের কাছাকাছি, তাদের সঙ্গে এনামুল চলে যায় খাইগোবাড়ির মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে। কখনও কখনও পুরানবাড়ির মাঠেও ফুটবল খেলা হয়। এই বাড়ির গনি হামিদ ননী আর আলতাবউদ্দিনের প্রথম পক্ষের মেয়ে আতবজানের তিন ছেলে সেরু জহু নজু, সমেদ খাঁ-র নাতি আইয়ূব এই ক’জন মিলে ফুটবল খেলে। এনামুলরা এই খেলাও দেখে কোনও কোনওদিন। আবার নিজেরাও পুরনা ত্যানা প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে ফুটবল বানিয়ে সেই ফুটবল নিয়ে ছুটাছুটি করে পুরানবাড়ির মাঠে। আনোয়ারার মেয়ে আকতার তখন বেশ ছোট আর মিলু তখনও কোলে। আকতারের বয়সি আনোয়ারার ছোটচাচা ইন্তাজউদ্দিনের মেয়ে ভানু। দুইজনে খুব ভাব। সারাক্ষণ গলাগলি করে আছে।
সেই বিকালে নিমতলার জোড়াচুলার পারে আমকাঠের সিঁড়ি পেতে বসেছিলেন আম্বিয়া খাতুন। মেয়ের জামাইকে তিনি ডাকেন খোকার বাপ। খোকার বাপ বিবিখানা পিঠা খুবই পছন্দ করেন। দুই চুলায় দুই খান বিবিখানা পিঠা বসিয়েছেন তিনি। বড়ঘরের দক্ষিণের ছেমায় পিঁড়ি পেতে বসেছে আনোয়ারা, তার পিঠের কাছে বসে হাফেজের বউ বিলি কেটে কেটে মাথা থেকে উকুন এনে মারছে। উকুন ধরার জন্য দুউ আঙুলের নখে একটা করে ঠোকর দেয় হাফেজের বউ আর সেই ঠোকরে আনোয়ারার চোখের ঢুলুঢুলু ভাব কেটে যায়।
দেলোয়ারা ছিল বাগানে। তার কোলে তখনও পর্যন্ত আনোয়ারার ছোটছেলে মিলু। মিলুকে খুবই ভালবাসে দেলোয়ারা। সেই বিকালে ছেলেটাকে নিয়ে নানারকম আদর সোহাগ করছিল সে। আর সেই ফাঁকে নিমতলার চুলারপারে তার বিয়ের কথা বলছিল মন্তাজউদ্দিন। পোলার বাড়ি ভাবিছাব কামারগাঁও।
পুরানবাড়ির ফতির মা এসে কিছুদিন ধরে থাকছে এই বাড়িতে। আম্বিয়া খাতুনের ফুটফরমাশ খাটে, বিনিময়ে তিনবেলার খাওয়া থাকা আর কখনও কখনও একখানা পুরনো শাড়ি। বড়ঘর থেকে কী কাজে বাইরে এসেছে সে, এসে দেখে মন্তাজউদ্দিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। দেখে নিজ গরজেই জলচৌকি এনে দিয়েছে।
জলচৌকি দেখেও সহজে বসতে পারছিলেন না মন্তাজউদ্দিন। ভাবিছাব না বললে বসেন কী করে!
আম্বিয়া খাতুন বিবিখানা পিঠা নিয়ে ব্যস্ত। তবু এক ফাঁকে চোখ তুলে তাকালেন মন্তাজউদ্দিনের দিকে। আগের মতোই ধীর শান্ত গলায় বললেন, বহো।
মন্তাজউদ্দিন বিগলিত ভঙ্গিতে বসল। হাসিহাসি মুখ করে বলল, কামারগাঁওয়ের পোলা। আমাগো মতিউরের দোস্ত। দুই বছর আগে দোস্তালি পাতাইছে।
পোলাগো জাতবংশ কেমুন?
ভাল, বহুত ভাল। নামকরা বংশের পোলা। তয় এতিম। বাপ-মা কেঐ নাই। তিনভাই। বইন। বড় বইনের বিয়া অইছে হাতারপাড়া। ছোড ভাইডার নাম হামেদ আর পোলার নাম মজিদ। আবদুল মজিদ।
চিন্তিত চোখে মন্তাজউদ্দিনের দিকে তাকালেন আম্বিয়া খাতুন। বাপ মা নাই, বইনের বিয়া অইয়া গেছে, পোলাগ সংসার তাইলে চলে কেমতে?
মন্তাজউদ্দিন তার স্বভাবসুলভ হাসিমুখে বললেন, আপনের লগে মিছাকথা আমি কমুনা। বিয়াশাদির সমন্দে একখান মিছাকথা কইলে হেই একখান মিছা ঢাকতে দশখান মিছা কইতে অয়। তার বাদেও চাইপা রাখন যায় না কিছু। মিছা একদিন ধরা পড়েই।
হ মূইল্যবান কথা কইছো।
পোলাগ ভাবিছাব বাড়িঘর সংসারমংসার কিছু নাই। আত্মীয়স্বজনও নাই। এক বাইত্তে জাইগির থাইক্কা মেট্রিক পাশ করছে। ছোডভাই থাকে আরেক বাইত্তে। হেই ভাইও মনেঅয় লেখাপড়া করে। মজিদ ছাত্র ভাল। দেখতে শোনতে ভাল। লেখাপড়ার বেদম ইচ্ছা। ঢাকায় থাইক্কা কলেজে পড়তে চায়। যে অর পড়ার খরচা চালাইবো হেই বাইতে বিয়া করবো। মাইয়া বোবা কানা অইলেও আপিত্তি নাই। আল্লার রহমতে আমাগো দেলরা তো বোবাও না, কানাও না। মেন্দাবাড়ির রূপবতী মাইয়া। আর আপনে অইলেন লেখাপড়ার সমজদার। এতিম মিসকিন পোলা অইলে আপিত্তি নাই আপনের। আপনি খালি চান পোলাডা দেকতে ভাল আর বিদ্যান। আনোরার জামাইও তো অমুন। এতিম। দুইন্নাইতে কেঐ নাই। দেকতে ভাল আর মেট্রিক পাশ। এর লেইগাঐ মাইয়া বিয়া দিয়া জামাই আপনে এই বাইত্তে লইয়াইছেন। মজিদরেও এমনেঐ লইয়াহেন। দুই মাইয়ার দুই জামাইঐ ঘরজামাই।
মন্তাজউদ্দিনের কথা মনে ধরল আম্বিয়া খাতুনের। মন্তাজউদ্দিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন, কথা বুজলাম। তয় আমার অইলো এক কথা। আগে পোলা দেহান লাগবো আমারে। পোলা দেইক্কা যুদি পছন্দ হয় তাইলে আর কথা নাই। ঢাকায় রাইক্কা কলেজে তারে আমি পড়ামু। কোনও অসুবিদা নাই। তুমি খালি পোলাডারে লইয়াহো। আমারে দেহাও।
একথা শুনে ফুর্তিতে আর বাঁচেন না মন্তাজউদ্দিন। জলচৌকি ফেলে লাফিয়ে উঠলেন। থালভরতি মুড়ি, নারকেল কোরা মিশানো অতি স্বাদের খেজুরে গুড় আর দুধের সর ভাসানো চা কোনওটাই যে জোটেনি সেই দুঃখের কথা ভুলে গেলেন। উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, কাইলঐ মতিউররে আমি খবর দিতাছি। দুই-চাইর দিনের মইদ্যেঐ মজিদরে লইয়াইতে কইতাছি।
