আতবজানের জন্মের বছর দুয়েকের মাথায় তার মা গলায় দড়ি দিল। হয়তো শরীরের ভিতরকার অচেনা অসুখ এবং স্বামীর অবহেলার কারণে বেঁচে থাকতে ভাল লাগেনি তার।
আলতাবউদ্দিন তখন জাহাজে। কলকাতা থেকে জাহাজ এসেছে নারায়ণগঞ্জে। সেখানে বসেই খবর পেলেন। তারপর সেই যে ময়মুরব্বিদের চাপে বিয়ে করে, স্ত্রীর সঙ্গে কয়েক রাত্রি কাটিয়ে সারেঙের কাজে গোয়ালন্দ ঘাটে গিয়ে জাহাজে চড়েছিলেন, এদিকে স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছেন, যথা সময়ে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছেন, সেই কন্যা সন্তান হাঁটতে শিখে গেল, সব খবরই তিনি পেয়েছেন কিন্তু বাড়িমুখী আর হননি। না স্ত্রী না কন্যা কারও প্রতিই তার কোনও টান জন্মায়নি। কিন্তু মৃত্যু বলে কথা, তাও গলায় দড়ি দিয়ে মৃত্যু, আত্মহত্যা, তার ওপর ওইটুকু শিশুকন্যা ফেলে, এই ঘটনার পর যে মানুষের বুকের ভিতর সামান্যও মনুষত্ব আছে সে কেমন করে বাড়ি না ফিরে?
আলতাবউদ্দিনও ফিরেছিলেন। ফিরে দেখেন তাঁর মা-হারা কন্যা আহবজানকে পিতার স্নেহে বুকে তুলে নিয়েছেন মাজারো ভাই সালতাবউদ্দিন। আতবজানও সালতাবউদ্দিনকেই বাপ ডাকতে শুরু করেছে। দেখে তিনি শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।
বড়ভাইয়ের জন্য সালতাবউদ্দিনের ছিল বেজায় টান। ময়মুরব্বিদের চাপে বিয়ে করে ভাইয়ের জীবন ছেঁড়াভেড়া হয়ে গেছে ভেবে ভাইয়ের জীবন কেমন করে গুছিয়ে দেওয়া যায়, আতবজানকে কোলে নিয়ে প্রায়ই এসব ভাবতেন তিনি। তার নিজেরও ততদিনে সংসার হয়েছে। সংসারে দুইটি ছেলেমেয়ে, হাফিজুর রহমান, বাড়ির লোকে ডাকে হাবজা আর পরির মতো সুন্দর মেয়ে শাফিয়া খাতুন। আপন ছেলেমেয়ে তাঁর কাছে ভিড়তে সাহস পায় না কিন্তু আতবজান আছে তার পায়ে পায়ে। খেতখোলা দেখতে বিলবাওড়ে গেলেও আতবজানকে তিনি কোলে কাঁধে করে নিয়ে যান, মাওয়ার বাজারে ইলিশমাছ কিনতে গেলেও তার সঙ্গে আছে আতবজান।
কিন্তু বড়ভাইয়ের জীবন কেমন করে গুছিয়ে দেবেন সালতাবউদ্দিন, কেমন করে তাঁকে করবেন সংসারসুখী, এই চিন্তায় শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ভাইকে আবার বিয়ে করাবেন। গোপনে মেয়ে দেখতে শুরু করলেন। খবর পেলেন কুমারভোগের আফজাল খা-র মেয়ে আম্বিয়া খাতুনের। আলতাবউদ্দিন নিজেও দেখলেন মেয়ে, পছন্দ হল। কিন্তু এই বাড়িতে মেয়ে বিয়ে দিতে চাইলেন না আফজাল খা। আলতাবউদ্দিন বিপত্নীক তাঁর একটা মেয়ে আছে সমস্যাটা এখানে না, সমস্যা হচ্ছে বাড়িটা। আফজাল খা জেনেছেন। বাড়িটা ছিল হিন্দুদের, জোরজবরদস্তি বাড়ি দখল করে সেখানে ঘরদুয়ার তুলে হিন্দুবাড়িকে মেন্দাবাড়ি করা হয়েছে। জবরদখলকারীদের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবেন না তিনি।
কী করলে দিবেন?
আফজাল খা শর্ত দিলেন প্রকৃত মালিকের কাছে থেকে ন্যায্য দামে বাড়ি রেজিস্ট্রি করে নিতে হবে আর তাঁর মেয়েকে রাখতে হবে অতি সম্মানে, মেয়ে যা চাইবে তাই হবে। তার কোনও অমর্যাদা হতে পারবে না।
শর্ত মেনে নেওয়া হল। বাড়ির আসল মালিকের সঙ্গে সমঝোতা করে তাকে কিছু টাকাপয়সা দিয়ে লৌহজঙের সাব রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে বাড়ি রেজিস্ট্রি করা হল আলতাবউদ্দিন সালতাবউদ্দিন আর ইন্তাজউদ্দিন এই তিন ভাইয়ের নামে। তারপর দ্বিতীয় বিয়ে হল আলতাবউদ্দিনের। আম্বিয়া খাতুন এই বাড়ির বড়বউ হয়ে এলেন। এসে নিজগুণে। স্বামী আর বাড়ির কর্তৃত্ব নিয়ে নিলেন নিজের হাতে। স্ত্রী প্রেমে মশগুল হয়ে গেলেন আলতাবউদ্দিন। আগে বছরের পর বছর যে মানুষ বাড়ি ফিরতেন না সেই মানুষই তারপর থেকে বছরে তিন মাস থাকেন বাড়িতে। একটার পর একটা সন্তান হতে লাগল তার। বেশির ভাগই আহুজ ঘরে মারা যেত। শেষ পর্যন্ত টিকল তিনজন, আনোয়ারা দেলোয়ারা আর টগর। সাত-আট বছর বয়সে টগরও চলে গেল।
স্বামী-সন্তানের শোক সামলেও নিজের মাথাটা ঠিক রাখতে পেরেছিলেন আম্বিয়া খাতুন, ব্যক্তিত্বটা ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এজন্য মন্তাজউদ্দিনের প্রস্তাব শুনেই লাফিয়ে উঠলেন না। ধীর শান্ত গলায় বললেন, কোন গেরামের পোলা?
আম্বিয়া খাতুনের আচরণে মন্তাজউদ্দিন ধাক্কা খেলেন। তাঁর ধারণা ছিল মেয়ের জন্য সম্বন্ধ এসেছে শুনে ভাবিছাব একেবারে লাফিয়ে উঠবেন। কাছেপিঠে যাকেই পাবেন তাকেই ডেকে বলবেন, তাড়াতাড়ি জলচকি আন। ছোডমিয়ারে বইতে দে। তারপর একথাল মুড়ি দিবেন, বাড়িতে তৈরি নারকেল কোরা মিশানো অতি স্বাদের খাজুইড়া মিঠাই (খেজুরে গুড়) দিবেন মুঠ পরিমাণ। গুড় না থাকলে নারকেলের তোয়াক (রসের তৈরি ঝোলাগুড়) দিবেন মুড়ির ওপর ছড়িয়ে। জলচৌকিতে বসে আরামসে সেই মজাদার জিনিস খেতে খেতে পাত্রের নাড়িনক্ষত্রের হিসাব দিবেন মন্তাজউদ্দিন আর সেই ফাঁকে ভাবিছাব নিজ হাতে, অতিযত্নে তার জন্য তৈরি করবেন আগিলা দিনের মগের মতো কাঁচের কাপের এককাপ দুধ চা। কী স্বাদ সেই চায়ের দুধের পুরু সর ভাসে চায়ের উপর। মুখে দিলে মনে হয় এই জীবনে এত স্বাদের জিনিস আর কখনও খাওয়া হয়নি, হবেও না কোনওদিন।
মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক।
দেলোয়ারার বিয়া নিয়ে ভাল রকমের উৎকণ্ঠায় আছেন আম্বিয়া খাতুন। বড়মেয়ে আনোয়ারার বিয়ের ঘটকালি করেছিল কাজির পাগলার মেছের ঘটক। সেই লোকটাকে লাগানো হয়েছে দেলোয়ারার জন্য পাত্র খুঁজে বের করবার কাজে। বেশ কয়েক মাস ধরে বিক্রমপুরের গ্রামে গ্রামে পাত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে সে, আসতে যেতে টাকাপয়সা নিচ্ছে, কিন্তু উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান পাচ্ছে না, এসব কথা মন্তাজউদ্দিন জানতেন। জানতেন বলেই তার ধারণা হয়েছিল সম্বন্ধর কথা শুনে আম্বিয়া খাতুন পাগল হয়ে যাবেন। মন্তাজউদ্দিনের জন্য কী রেখে কী করবেন দিশা পাবেন না।
