আবদুল মজিদের প্রশংসাও চলছিল এই ভাবেই, আড়ালে আবডালে।
আলতাবউদ্দিন সারেঙ তখন বেঁচে নাই, কয়েক বছর আগে গত হয়েছেন। গত হওয়ার আগে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। বদ্ধ না, আধাপাগল। দেলোয়ারার ছোট একটা ভাই ছিল, টগর। জ্বরে মাথায় বিকার হয়ে গেল। এক বিকালে কাজির পাগলার জলধর ডাক্তার এলেন দেখতে। কী একটা ইঞ্জেকশান দিলেন বিকার কমাবার জন্য। সেই ইঞ্জেকশানের পর টগরের শুধু হাই ওঠে, হাই ওঠে। ওই হাই ওঠা দেখে ডাক্তারি ব্যাগ হাতে অতিমোটা শরীর নিয়েও দ্রুত চলে গেলেন জলধর, ভিজিটও নিলেন না। তার কিছুক্ষণ পরই মায়ের কোলে মাথা রেখে গত হল টগর।
ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বাবাকে গিয়ে বলেছিলেন আনোয়ারা। চিৎকার করে কাঁদছিলেন তিনি, বিলাপ করছিলেন, সেই বিলাপের ফাঁকেই বাগানের ছায়ায় হাতলআলা চেয়ারে বিকালবেলার আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে বসে থাকা আলতাবউদ্দিন সারেঙকে আনোয়ারা বললেন, ও বাবা, বাবা, আপনে এহেনে বইয়া রইছেন আর ঐমিহি তো টগর মইরা গেছে!
হায় হায়! সব্বনাশ! টগর মইরা গেছে! বলে কয়েকবার বুক চাপড়ালেন তিনি, তারপর আবার উদাস হয়ে গেলেন।
এসবের কিছুদিন পর গত হলেন আলতাবউদ্দিন সারেঙ। জাহাজের চাকরিতে তাঁর একজন কর্মচারী ছিল, আলী আহম্মদ। ননায়াখালির লোক। আনোয়ারা দেলোয়ারার চেয়ে বয়সে বড়, এতই বাধুক আলতাবউদ্দিনের, আলতাবউদ্দিনকে ডাকত বাবা। আলতাবউদ্দিনও তাকে ছেলে হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। বাড়ি এলে সঙ্গে নিয়ে আসতেন। বলতেন, আলী আহম্মদ আমার পোলা, পালক পোলা।
সেই পালক পোলা জাহাজ থেকে একবার আলতাবউদ্দিনের জমানো সবটাকা উধাও করে দিল আর খাবারের লগে কী কী সব মিশায়া দিল তাকে মেরে ফেলার জন্য। মারা আলতাবউদ্দিন গেলেন না, গেলেন পাগল হয়ে। সেই অবস্থায় বাড়ি এসে দিন কাটালেন কিছুদিন, বাগানের ছায়ায় বসে উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, তারপর ছেলের মৃত্যুর কিছুদিন পর তিনিও ছেলের পথ ধরলেন।
সারেঙ নাই কিন্তু তাঁর নামডাকটা ছিল। সেই নামডাকের জোরে আবদুল মজিদের প্রশংসার লগে আলতাবউদ্দিন সারেঙের নামটাও উঠত। সারেঙ যেমন আলী আহম্মদকে ছেলে বানিয়েছিলেন আবদুল মজিদকে তেমন ছেলে বানিয়েছিলেন গ্রামের নিঃসঙ্গ ডাক্তার মনীন্দ্র ঠাকুর। হিন্দুর ঘরে মুসলমান ছেলে। ঠাকুর বলতেন, অর নামের লগেও আমার মিল আছে। বাপপোলার একরকমঐ নাম। আমি মনীন্দ্র ও মজিদ। দুইখান নামঐ শুরু হইছে ম দিয়া।
এই সুপুরুষ সুশীল, মানুষের প্রশংসা আর ভালবাসায় ডুবে থাকা মজিদের ভিতর ছিল আরেকজন মানুষ। বাইরের মানুষটির সঙ্গে তার কোন মিল নাই। আলী আহম্মদের মতো, উপরে এক ভিতরে আরেক। স্বার্থের কারণে হাতের মুঠায় বিষ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দেলোয়ারার জন্য মজিদের সম্বন্ধ এনেছিল কামারগাঁওয়ের মতিউর, মতিউর রহমান। লতায় পাতায় দেলোয়ারাদের সে আত্মীয়। আলতাবউদ্দিন সারেঙের বেশ দূর সম্পর্কের ফুফাতো বোনের ছেলে। মজিদ ছিল মতিউরের বন্ধু। প্রস্তাবটা মতিউর দিয়েছিল তার মামা মন্তাজউদ্দিন শেখকে। মেন্দাবাড়ির পুব-দক্ষিণ কোণে মন্তাজউদ্দিনের এক ঘরের ছোট্ট বাড়ি। আগে জাহাজের ইঞ্জিন মিস্ত্রিরির হেলপার ছিলেন, ঘটনার কিছুদিন আগে স্ত্রীর প্ররোচনায় ওই কাজ ছেড়ে বাড়ি এসে গিরস্তি শুরু করেছেন। গোয়ালে দু’খানা দুধেল গাই গোরু, উত্তরের ভিটায় কাশের শুকনো পাতা আর পাটখড়ির চাল বেড়া দেওয়া। ছোট্ট রান্নাঘর। পশ্চিমের ভিটায় টিনের দোচালা ঘর, এক চিলতে উঠান আর একটি মাত্র ছেলে আমিনুল এই নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সংসার মন্তাজউদ্দিনের। তখনও তার মেয়ে হামিদা জন্মায়নি। অতি বিনয়ী সরল আর ভাল মানুষ তিনি। মতিউরের প্রস্তাবের পর আগে মজিদের যত রকমের খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব নিলেন। তারপর দেলোয়ারার মা আম্বিয়া খাতুনের কাছে গিয়ে এক বিকেলে পেশ করলেন, ভাবিছাব, দেলরার লেইগা একখান সমন্দ আনছি।
আম্বিয়া খাতুন ছোটখাটো একহারা গড়নের, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন, সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলা মানুষ। চিঠিপত্র লিখতে জানতেন, বাংলা পড়তে পারতেন। আলতাবউদ্দিন সারেঙের দ্বিতীয় স্ত্রী। মেন্দাবাড়ির বড় সারেঙের বউ হয়ে আসার সময় চামড়ায় বাঁধানো বিষাদ সিন্ধু’ বইখানা গভীর মমতায় বুকে জড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন। আজার সময়ে বইখানা। তিনি পড়তেন। বিষাদ সিন্ধু’র পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা মুখস্থ ছিল। কুমারভোগের খ-বাড়ির মেয়ে। বাবা আফজাল খাঁ পেশায় বনেদি দরজি। গ্রামের বাড়িতে স্ত্রীকে রেখে নিজে থাকতেন গাইবান্ধায়। ছয় মাসে-এক বছরে বাড়ি আসতেন। স্ত্রীর গর্ভে ছেলেমেয়ে আসত প্রায়ই, বাঁচত না। এসব কারণেই কি না কে জানে শেষ পর্যন্ত গাইবান্ধার পাট চুকিয়ে। গ্রামে ফিরে এসেছিলেন তিনি, মাওয়ার বাজারে দরজি দোকান খুলে বসেছিলেন। আশ্চর্য ব্যাপার তারপর তাঁর দুইটি ছেলেমেয়ে হল, আম্বিয়া আর আবেদীন, আল্লাহর রহমতে দুইজনেই তারা বেঁচে গেল।
এদিকে আলতাবউদ্দিন সারেঙের প্রথম বিয়ে হয়েছিল এই কুমারভোগ গ্রামেই। বিয়েতে তিনি একেবারেই রাজি ছিলেন না। কারণ পাত্রী তার পছন্দ ছিল না। তিনি নিজে সুন্দর পুরুষ। একটু মোটা ধাচের শরীর, গায়ের রং পাকা শবরিকলার মতো আর পাত্রী রীতিমতো কালো, অসুখে ধরনের রোগাপটকা শরীর, মুখে লাবণ্য নাই, হাসি নাই, যেন সারাক্ষণই দুনিয়ার ওপর বিরক্ত হয়ে আছেন। তবুও বিয়ে তাঁদের হয়েছিল, বছর দেড়েকের মাথায় একটি মেয়েও জন্মাল। সেই মেয়ের নাম আতবজান বিবি। দেলোয়ারারা ডাকে ‘আতবি বুজি’।
