অন্ধকারে দবির গাছির ঘরের খোলা দুয়ার আন্দাজ করে মুকসেদ আবার ভিতরে ঢুকল, ঢুকে কলসি বদনা পায়ের কাছে রেখে প্রথমে ম্যাচ জ্বালল তারপর জিনিস দুইটা জায়গা মতন রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। উঠানে এসে বেশ একটা আরাম পেল সে। যাক ঠিক কাজটাই শেষ পর্যন্ত করেছে। মুকসেদের ইচ্ছা করল সিগ্রেট ধরাতে। বুকপকেটে হাত দিয়ে সিগ্রেটের প্যাকেট আর ম্যাচ বেরও করতে গেল তখনই মানুষের পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। দুই-তিনজন মানুষ যেন হেঁটে আসছে এই বাড়ির দিকে। নিশ্চয় দবির গাছি আর তার বউবেটি হবে। এই অবস্থায় সিগ্রেট ধরাতে পারল না মুকসেদ। কেউ টের পাওয়ার আগেই বাড়ির পিছনে দিক দিয়ে চকে নামল। দ্রুত পা চালিয়ে কিছু দূর এসে হালটে উঠল, উঠে সিগ্রেট ধরাল। বুক জুড়ে মুকসেদের বেশ একটা স্বস্তির ভাব।
২.৩ সন্ধ্যাবেলায় নূরজাহান
সেই যে সেদিনের সেই সন্ধ্যাবেলায় নূরজাহানকে এই বাড়িতে খুঁজতে এসেছিল দবির হামিদা সেই সন্ধ্যা থেকেই ঘুরেফিরে বহুকাল পিছনে ফেলে আসা একটা জীবনের কথা যখন তখন মনে পড়ে দেলোয়ারার। একজন মানুষের কথা মনে পড়ে।
সেই মানুষের নাম মজিদ, আবদুল মজিদ।
কতকাল আগের কথা! কতকাল আগে তাকে ছেড়ে চলে গেছেন সেই মানুষ। সৈয়দপুরের ওদিকে আরেক বিয়ে করে সংসার পেতেছেন, সেই সংসারের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। কিন্তু দেলোয়ারার সঙ্গে তালাক বলতে যা বোঝায় তা হয়নি। প্রকৃত অর্থে দেলোয়ারা এখনও তার বৈধ স্ত্রী। এই স্ত্রীর কাছে আর কখনও ফিরে আসেননি তিনি। পলকের তরেও আর দেখা হয়নি দুইজন মানুষের। আজ পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর।
সেদিনের পর থেকে এসব কথা খুব মনে পড়ে দেলোয়ারার। আবদুল মজিদ যে বেঁচে আছেন একথা জানেন তিনি। ঢাকায় বাসাবাড়ি নিয়ে থাকেন, পুরনা জীবনের কোনও কোনও মানুষের সঙ্গে পথেঘাটে কখনও কখনও দেখাসাক্ষাৎ হয়, দুই-চারটা কথা হয়, দুই-দশ বছরে সেসব কথা কখনও কখনও কানেও এসেছে দেলোয়ারার। শুনে কোনও কথা বলেননি তিনি, গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন।
কেন তাঁর সঙ্গে এমন করেছিলেন মানুষটি? কী দোষ ছিল তাঁর? কোন অপরাধে তার জীবন এমন তছনছ করে চলে গেলেন তিনি! নিজে ঠিকই গুছিয়ে নিলেন জীবন, দেলোয়ারাকে ঠেলে দিয়ে গেলেন বোনের সংসারে। পরের ঘরের সন্তানসন্ততিকে ঠিকই বুক দিয়ে আগলে বড় করলেন, শুধু প্রথম সন্তানটিকে ফেলে দিয়ে গেলেন মায়ের সঙ্গে। স্ত্রীর দিকে না হোক মেয়েটির দিকে তো ফিরে তাকাতে পারতেন! দূরে থেকেও তো কোনও না কোনওভাবে থাকতে পারতেন মেয়ের পাশে। অন্তত মেয়ের বিয়ের দিন তারও পরে কোনও না কোনওদিন তো এসে দাঁড়াতে পারতেন মেয়ের সামনে। মাফিনের জামাই ডালু হোসেন ভাল ছেলে। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে খুবই সুখের জীবন এখন মাফিনের। মেয়ের জামাই কেমন হল, নাতি নাতকুড়রা কেমন হল, এইসব অছিলায়ও তো কোনও না কোনওদিন এসে দাঁড়াতে পারতেন মেয়ের সামনে। মেয়ে কি একটিও কটুকথা বলত তাকে। তেমন বেয়াদপ মেয়ে কি দেলোয়ারা জন্ম দিয়েছেন!
আজ গভীর রাতে ঘুম ভাঙার পর এসব কথা মনে পড়ল দেলোয়ারার।
ক’দিন ধরে রাত দুপুরে, ভোররাতে হঠাৎ হঠাই ঘুম ভেঙে যায় দেলোয়ারার। তারপর কিছুতেই আর ঘুম আসে না।
ভোররাতে ঘুম ভাঙলে ঘুম আর এলেও অসুবিধা নাই। খাটালে রাখা বালতিতে অজুর পানি থাকে। বদনা থাকে। উঠে অজু করে কেবিনে বসে ফজরের নামাজ পড়েন। তখনও ভোরের আলো ফোটে না। শেষ মাঘের ভোর থাকে কুয়াশায় মোড়া। কুয়াশা ভেঙে আলো আসতে সময় লাগে। নামাজ শেষ করার পরও অনেকটা সময় হাতে থাকে। দেলোয়ারার। সময়টা তিনি কোরান শরিফ পড়ে কাটান। রেহালের ওপর কোরান শরিফ রেখে, পাশে উসকে দেওয়া হারিকেন, হারিকেনের আলোয় পবিত্র কোরানের বাণী তাঁকে পৌঁছে দেয় অন্য এক জগতে। সেই ফাঁকে কখন ফুটে ওঠে দিনের আলো দেলোয়ারা টের পান না।
দুপুররাতে ঘুম ভাঙলে বড় কষ্ট। সময় কাটতেই চায় না। তখন মনে পড়ে জীবনের ফেলে আসা দিনের কথা। আবদুল মজিদের কথা।
আজও মনে পড়ল।
আবদুল মজিদ খুবই সুপুরুষ ছিলেন। লম্বা সুন্দর স্বাস্থ্য, গমগমে গলার আওয়াজ, মাথা ভরতি ঘন কোকড়া চুল, গোঁফদাড়ি নিখুঁতভাবে কামানো। চোখ যাত্রার নায়কদের মতো টানাটানা। সেই চোখে সহজে পলক পড়ত না। তার চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যেত না। আবদুল মজিদের গায়ের রং ছিল কালোর দিকে। কথা বলতেন সুন্দর করে। কথার সঙ্গে মধুমাখা তো তাঁর ছিলই, আর ছিল মন ভুলানো হাসি। যে কারও সঙ্গে কথা বলার সময় ফাঁকে ফাঁকে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে বুঝিয়ে দিতেন তিনি খুবই শিক্ষিত মানুষ, অন্যের সঙ্গে তাঁর অনেক ব্যবধান। ময়মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিনয়ে গলে পড়তেন। আলতাবউদ্দিন সারেঙের ছোটমেয়ে দেলোয়ারার স্বামী হয়ে তিনি যখন মেন্দাবাড়িতে এসে উঠলেন, দশদিকের আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে গ্রামের প্রায় সবাই আবদুল মজিদকে দেখে মুগ্ধ, তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে তো লোকে আর লোকের প্রশংসা করতে পারে না, সেটা শোভনও না, করতে হয় আড়ালে আবডালে। আরে ও মিয়া, হোনছো, জামাই পাইছে একখান মেন্দাবাড়ির বড় সারেঙে। চাম্পিয়ান। জামাই। আমাগো গেরামে এইরকম জামাই আর কেঐর নাই।
