কিন্তু কত কাঠি জ্বালবে সে! কতক্ষণ পারবে ওভাবে টাকা খুঁজতে। ম্যাচও অর্ধেকের বেশি শেষ হওয়া। কাঠি বেশি নাই।
মুকসেদের মেজাজ খারাপ হল। ধুত্তরি! আল্লাহর কারবারই এমন। সুযোগ দিয়েও কোথায় যেন একটা প্যাঁচ রেখে দেন। হব হব করেও যেন কাজ সহজে হতে চায় না।
তারপর একটু জেদ হল মুকসেদের। যা আছে কপালে, ম্যাচের কাঠি জ্বেলেই টাকা খোঁজার চেষ্টা সে করবে, চুরির চেষ্টা করবে।
নিঃশব্দে দবির গাছির ঘরে ঢুকে গেল মুকসেদ। পকেট থেকে ম্যাচ বের করে জ্বালল। ম্যাচের ডগার ওইটুকু বারুদের জ্বলে ওঠায় তেমন কোনও কাজই হল না। অন্ধকার ঘরের মুঠ পরিমাণ জায়গা আলোকিত হল। সেই আলোয় ঘরের ভিতরকার তেমন কিছুই স্পষ্ট হল না, তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। তবু চেষ্টা মুকসেদ করতে লাগল। ঘরের একেকটা দিকে যায় আর একটা করে কাঠি জ্বালে। যতক্ষণ সম্ভব ধরে রাখে জ্বলন্ত কাঠি। হাতে যখন ছ্যাকা লাগে তখন ফেলে দেয়। এইভাবে তাক রসির শিকায় রাখা পটপাটি, চৌকির তলায় রাখা টিনের ফুলপাখি আঁকা ভাঙাচোরা সুটকেস, হাঁড়ি, মুড়ির জের এসব কোনওরকমে হাতিয়ে হাতিয়ে দেখল মুকসেদ। কোথাও একটা পাই পয়সাও পেল না। এদিকে ম্যাচের কাঠিও ফুরিয়ে আসছে। তবে এই ফাঁকে পিতলের ভারী ধরনের একটা বদনা আর মাঝারি মাপের একখান কলসি চোখে পড়ে গেল মুকসেদের। টাকা না পেয়ে সে ভাবল এই জিনিসই নিয়ে যাবে। মন্দ কী! এখন হাতে করে নিয়ে নিজেদের বাড়িতে রাখবে, দুই একদিন পর ইব্রা ঢাকা থেকে ফিরলে তাকে দিয়ে দিলে সে দিঘলির ভাঙারিদের খবর দেবে, তারা ইব্রার বাড়িতে এসে নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাবে। কম বেশি যা হোক টাকা কিছু আসবে। চুরিটা ব্যর্থ হল না।
শেষ পর্যন্ত এই কাজটাই মুকসেদ করল। ম্যাচের কাঠি যখন দুই-তিনটায় এসে ঠেকেছে তখন পিতলের কলসি বদনা হাতে নিল। গভীর অন্ধকার ঠেলে দবির গাছির ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু উঠানে নেমে মনের মধ্যে কেমন একটা কামড় দিল মুকসেদের। আচ্ছা এই গিরস্তের কোনও বড় রকমের বিপদ আপদ হয়নি তো! আচমকা খুব কাছের কারও মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সব ফেলে ছুটে যায়নি তো তারা! মৃত্যুর মতোই কোনও বিপদ এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের উপর, সেই বিপদ ঠেকাতে বাড়ির মানুষজন সবাই এতটাই উদগ্রীব হয়েছে, অন্য কোনও দিকেই আর খেয়াল নাই। শূন্য বাড়ি, দুয়ারখোলা ঘর কোনও কিছুতেই তাদের আর মন ছিল না। নাকি তারা জানে গ্রামের দাগিচোর মুকসেদ এখন জেলে। মুকসেদ গ্রামে না থাকলে শূন্য বাড়িতে দুয়ারখোলা ঘর পেয়েও আর কেউ আসবে না চুরি করতে!
এরকম চুরি কি আজকের আগে কখনও করেছে মুকসেদ! মানুষজন নাই, বাড়ির ঘরদুয়ার খোলা পড়ে আছে, রাতও তেমন হয়নি, মাত্র সন্ধ্যা, সন্ধ্যারাতে চুরি সত্যি মুকসেদ করেনি। এই ধরনের চুরি কি সত্যিকারের চুরি নাকি? এই ধরনের কাজ করে একেবারেই নিচুস্তরের ছ্যাচড়া চোরেরা! পকেটমার, গোরু ছাগল মুরগিচোর, বাজার হাট গঞ্জে দোকানি। আর পাইকারদের সামান্য জিনিস হাতসাফাই করা ওসব তো উঁচড়া চোরদের কাজ! মুকসেদ কি ওই স্তরের চোর! না তো! সে তো জীবনে এতটা নীচে কোনওদিন নামেনি। চুরি সে করেছে ঠিকই সেই চুরির কাজটাও করেছে বেশ সম্মানের সঙ্গে। গিরস্তের আথাল থেকে গোরু চুরিটা বহু রকমের সুযোগ পাওয়ার পরও কোনওদিন করেনি মুকসেদ। গিরস্ত বাড়ির লাকড়িখড়ি রাখার ভাঙাচোরা ঘরে ভেড়া বরকি (ছাগল) রাখে গিরস্তে, মুরগি রাখে কাঠটিনের বাক্সের মতো খোয়াড়ে। ওসব চুরি অতি সহজ। পরিশ্রমই লাগে না। ইচ্ছা করলেই করা যায়। মুকসেদ কখনও করেনি। সে তার দলবল নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে প্রথমেই বের করেছে কোন গ্রামের কোন বাড়ি অবস্থাপন্ন গিরস্তের। কোন বাড়িতে চুরি করতে গেলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা নাই, নগদ টাকা পয়সা সোনাদানা যা পাওয়া যাবে তাতে ভালই পোষাবে। এই চিন্তার পর চুরির পদ্ধতি বের করেছে। প্রথমেই সিঁদ কাটতে হবে ঘরের। সিঁদ কেটে গায়ে চপচপে তেল মাখা একটি চোর প্রথমে ঢুকবে ঘরে, ঢুকে আস্তে করে খুলে দিবে দরজা, সেই দরজা দিয়ে অন্যরা ঢুকে টর্চ জ্বেলে জ্বেলে চুরি করবে। চুরির সময় সব চোরের গায়েই চপচপা তেল মাখা থাকবে। লুঙ্গি থাকবে শক্ত করে কাছা মারা, যাতে আচমকা লুঙ্গি টেনে না ধরতে পারে চুরির উদিস পাওয়া ঘুম ভাঙা কোনও গিরস্ত। জাপটে ধরলেও যাতে পিছলে যাওয়া যায় সেই কারণে ওরকম করে তেলমাখা থাকবে গায়ে। তারপরও ধরা বহুবার পড়তে হয়েছে মুকসেদকে। ওই যে কথা আছে ‘দশদিন চোরের একদিন সাধুর’ কথাটা সত্য। চোরদের বহুবিধ কায়দার পরও ধরা তাদেরকে কখনও না কখনও পড়তেই হয়। সেসব অন্যকথা। আসল কথা হচ্ছে এই এতদিনকার চোরজীবনে ওইসব কায়দায়ই চুরিটা মুকসেদ করেছে। আজকের মতো কখনও করেনি।
আজকেরটা কি চুরি না হ্যাঁচড়ামি! যেভাবে চুরিটা আজ মুকসেদ করছে এই চুরিতে গৌরব নাই। এই চুরি যে কেউ করতে পারে! শূন্য বাড়ি, দুয়ার খোলা, এই ধরনের বাড়িতে চুরি করতে আসল চোর লাগে না। মুকসেদ তো আসল চোর। এই ধরনের চুরি সে করবে কেন?
এইসব ভেবে মুকসেদের অহংকারে বেশ বড় রকমের একটা ঘা লাগল। তা ছাড়া যে দুইটা জিনিস সে চুরি করেছে ভাঙারিদের কাছে বেচলে কয় টাকাই বা দাম হবে! এই সামান্য জিনিসের জন্য এতদিনকার সত্যিকার চোরজীবনকে কলুষিত করবে মুকসেদ! না এই কাজ সে করবে না।
