আর আরেক মানুষ হল ইব্রার বউ জহুরা। তিন মেয়ের বিয়া হওয়ার পর সেও গেছে সংসার উদাসী হয়ে। বাড়িতে, নিজের ঘরে বলতে গেলে সে থাকেই না। দিনভর পড়ে থাকে মেয়েদের জামাই বাড়িতে, তাদের ঘরে। মেয়েদের ঘরের নাতিনাতনিরা হচ্ছে তার জান। সারাদিন তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। শুধু রাতেরবেলা এসে নিজের ঘরে শোয়। নাতিনাতনির বাইরে যে তার কোনও আপনজন আছে, স্বামী ইব্রাহিম যে এখনও জীবিত সে-কথা যেন তার মনেই থাকে না। মুকসেদকে ছাড়াবার কাজে দিনের পর দিন যে মুনশিগঞ্জে পড়ে থাকে, বাড়ি যে ফিরে না, তাও যেন টের পায় না। কোনও কোনও সময় যে ঢাকায় জহুরার বড় ভাইর বাসায় গিয়েও থাকছে ইব্রাহিম সে-কথাও জানে না জহুরা, জানার কোনও আগ্রহও যেন তার নেই। সব মিলে অদ্ভুত সম্পর্ক। একসঙ্গে থেকেও দুইজন মানুষ যেন একসঙ্গে নাই, দুইজন মানুষ যেন আলাদা। ইব্রা জোলা আছে মুকসেদকে নিয়ে, জহুরা আছে তার মেয়ে আর নাতি-নাতকুড়দের নিয়ে।
দুলালের সেলুন থেকে বেরিয়েই ইব্রা আর তার সংসারের এসব কথা আজ মনে পড়ল মুকসেদের! কোন মুহূর্তে কোন কথা যে মনে পড়ে মানুষের মানুষ নিজেও তা জানে না। নিজের এই দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মুকসেদ জেনেছে মানুষের শরীরের ভিতর যেখানেই লুকিয়ে থাক মন, মন এক গভীর রহস্যময় বস্তু। মন চিন্তা করবে মনের মতো। শাসন মানতে চায় না।
পকেট থেকে সিজার্স সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল মুকসেদ, ম্যাচ বের করল। সিগ্রেট ধরিয়ে ভাবল কোন পথে এখন বাড়ি যাবে সে। ঢাকা থেকে উঁচু হয়ে আসা সড়ক ধরবে, নাকি কালিরখিলের ওদিককার পথ!
তারপর অবশ্য কালিরখিলের পথ ধরেই গ্রামের দিকে হাঁটা দিয়েছে মুকসেদ। এদিক দিয়ে গেলে নিজেদের বাড়ি একটু ঘুরপথ হয়, তবু এই পথটাই মুকসেদ ধরল। সিগ্রেট টানতে টানতে মাঘ সন্ধ্যার অন্ধকার গ্রাম পথে হাঁটতে হাঁটতে আশ্চর্য রকমের এক আনন্দে ডুবে যাচ্ছিল সে।
দবির গাছির বাড়ির সামনে এসেই মনের আনন্দময়তায় চিড় ধরে গেল মুকসেদের। এরকম সন্ধ্যারাতে কুপি বাতির আলো নাই কেন বাড়িতে! শীতকালের সন্ধ্যা অনেকখানি হয়ে যাওয়ার পর নিশ্চয় গাছবুরা শেষ করে বাড়ি ফিরে দবির। কাঁধের ভার উঠানে নামিয়ে বাড়ির লগে ডোবায় গিয়ে হাত-পা ধুয়ে ঘরে এসে ঢোকে। খোলা দরজার সামনে বসে তামাক খায় বউবেটির লগে গল্প করে। তাদের মাঝখানে তখন কুপিও জ্বলে। সন্ধ্যার অন্ধকারে কুপি বাতি না জ্বাললে দোষ (অকল্যাণ অর্থে) হয় গিরস্তের। দবিরের বউ নিশ্চয় তা জানে! তা হলে বাড়িটা আজ এমন অন্ধকার কেন? এমন নীরব নিঝুম হয়ে আছে কেন? বাড়িতে কি লোকজন নাই?
মুকসেদের মনের ভিতর তিরিশ-চল্লিশ বছরের পুরনো চোরটা আড়মোড় ভাঙল। জেলখানায় এতদিন শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে ছিল চোর। এইমাত্র যেন ঘুম ভেঙেছে তার, হাই তুলে আড়মোড় ভাঙতে শুরু করেছে।
হাতের সিগ্রেট ফেলে মুকসেদ দবির গাছির বাড়িতে এসে উঠল। উঠে বেদম খুশি। সত্যি বাড়িতে কেউ নাই! নিটাল বাড়ি, বড়ঘরের দুয়ারও ভোলা।
এই দেখে মনের ভিতর আড়মোড় ভাঙা চোরটি মুকসেদের উঠে বসল, পুলকিত হল। এরকম নিটাল বাড়ি পড়ে আছে, তার ওপর দুয়ার ভাঙার কষ্টও নাই, দুয়ার আছে খোলা, এই ধরনের সুযোগ সমগ্র চোরজীবনেই কম পেয়েছে মুকসেদ। জেল থেকে বেরিয়েই গ্রামে যেদিন ফিরল সেদিনই এরকম সুযোগ, মুকসেদের মনে হল দেশগ্রামের ময়মুরব্বিরা যে বলে ‘আল্লায় যারে দেয় তারে ছাপ্পড় ফাইড়া দেয়’ কথাটা একদম সত্য। গ্রামে আসার দিনই মুকসেদের মতো চোরকে আল্লাহ আজ ছাপ্পড় ফেড়েই দিচ্ছেন। আল্লাহর কাছে সব মানুষই সমান। চোর সাধু সবাই। সবাইকেই তিনি দেন।
দবির গাছি গরিব মানুষ। কী এমন সম্পদ আছে তার ঘরে যে মুকসেদ চুরি করবে! রস বেচা দুই-চারশো টাকা হয়তো আছে, পিতল কাঁসার দুই একটা থাল বাসন, গেলাস, লোটা বদনা কলসি, অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি গামলা, লোহার কড়াই এসব ছাড়া আর কী থাকে এই ধরনের গিরস্ত ঘরে! বউবেটির সোনা রুপার গহনা থাকবার কথা না। থাকলেও নাকফুল কানের মাড়কি (মাকড়ি)। সেসব জিনিস ঘরে নিশ্চয় সাজিয়ে রাখে না গরিব গিরস্ত বাড়ির বউঝিরা, সেসব থাকে অঙ্গে। সুতরাং এই বাড়ি থেকে আজকের এই সন্ধ্যারাতে কী চুরি করবে মুকসেদ! পিতল কাঁসার টুমটামের চেয়ে নগদ টাকাটা পেলে ভাল হত। কোঁচড়ে নিয়ে ঝাড়া হাত-পায়ে বাড়ি গিয়ে উঠতে পারত।
টাকাটা মুকসেদ পাবে কোথায়? খুঁজবে কেমন করে? চুরির কাজে টর্চ লাইট জরুরি। মুকসেদের সঙ্গে থাকেও। আজ নাই। থাকবে কী করে! জেলখানায় কি চুরি করার অস্ত্র সঙ্গে রাখতে দেয়! ইচ্ছা করলে টর্চ একটা জোগাড় করতে পারত মুকসেদ। ইব্রা যে তিনশো টাকা দিয়েছে সেই টাকা থেকে ছোট্ট একটা টর্চ কিনতে পারত। কিনা হয়নি মনে ছিল না বলে। তা ছাড়া আজই যে টর্চের দরকার হবে তাই বা কে জানত!
ইস এখন টর্চ লগে থাকলে সেই জিনিসের বোতাম টিপে টিপে ঘরের পটপাটি আনাচ কানাচ ব্যাগ সুটকেস বা ট্রাঙ্ক জাতীয় জিনিসগুলি ঘেঁটে ঘেঁটে দেখা যেত নগদ টাকা দবির কোথায় রেখেছে!
তারপরই মুকসেদের মনে হল পকেটে সিগ্রেট ধরাবার ম্যাচ আছে, ম্যাচের কাঠি জ্বেলে জ্বেলে কি চুরির কাজটা সারা যায় না!
