আধঘণ্টা পর দুলালের দোকান থেকে অন্য চেহারার মানুষ হয়ে বেরুল মুকসেদ।
কোনও কোনও মানুষ টাকি মাছের মতন। বিপদ আপদের হাত থেকে খালি পিছলে যায়, খালি পিছলে যায়। বিপদ এসে থাবা দিয়ে ধরে ঠিকই, ধরার লগে লগে থাবার ফাঁক ফোকর দিয়ে ছাট করে পিছলে যায়। অবিকল টাকি মাছ।
গ্রাম দেশে শীতকালের খাল বিল পুকুর ডোবায় হাতিয়ে মাছ ধরার নিয়ম আছে। মাজা পানিতে নেমে উপুড় হয়ে, থুতনি পানিতে ছুঁই ছুঁই, এই অবস্থায় পানির তলায় দুইহাতে ঠাওর করে করে মাছ ধরা। যেসব মাছ কাদায় থাকে হাতিয়ে হাতিয়ে সেই মাছগুলিই শুধু ধরা যায়। যেমন শিং মাগুর কই ভেদা টাকি। কখনও কখনও পুঁটি ট্যাংরা খলিসা বাইল্লা ফলি পাবদা এসব মাছও পাওয়া যায়। হাতিয়ে হাতিয়ে কোনও মাছ ধরার ক্ষেত্রেই কোনও অসুবিধা নাই, অভ্যস্ত হাতে আরামছে ধরা যায়। সমস্যা করে শুধু টাকিমাছ। মুঠ করে ধরার পরও পিছলে যায়। বিপদের হাত থেকে জীবনভর যেমন করে পিছলাচ্ছে। মুকসেদের তিরিশ-চল্লিশ বছরের চোরজীবনের সঙ্গী সীতারামপুরের ইব্রা জোলা। আজতক যতবার ধরা পড়েছে মুকসেদ ঠিক ততবারই ধরা পড়ার কথা ইব্রার, কিন্তু ধরা সে পড়েনি। দারোগা পুলিশ ঠিকই তার বাড়িতে গিয়ে হানা দিয়েছে হানা দিয়ে কোনও লাভ হয়নি তাদের। না কোনও চোরাইমাল তারা পেয়েছে, না পেয়েছে ইব্রা জোলাকে। মাল সামানসহ কেমন কেমন করে যেন উধাও হয়ে গেছে ইব্রা। দারোগা পুলিশ আসার খবর কেমন করে পেয়েছে, কোথায় চোখের পলকে উধাও হয়ে গেছে এই রহস্য ইব্রা ছাড়া কেউ জানে না। মুকসেদ দুই-চারবার জানতে চেয়েছে, ইব্রা কোনও জবাব দেয়নি। মিটিমিটি হেসেছে।
ইব্রার পুরা নাম ইব্রাহিম। সীতারামপুরের লোক। সীতারামপুরের বেশির ভাগ লোক তাঁতি, কারিকর। ইব্রাহিমও তাই। কিন্তু নামের সঙ্গে তার লেগে আছে ‘জোলা’ কথাটা। এলাকার লোক ইব্রাহিমকে বলে ইব্রা জোলা, মুকসেদকে যেমন বলে মুকসেইদ্দা চোরা।
বিক্রমপুর অঞ্চলে জোলা কথাটা গালের পর্যায়ে। সুধীজনরা জানেন হিন্দু ধর্মের যারা কাপড় বোনার কাজ করে অর্থাৎ তাঁতের কাজ করে তাদেরকে বলে ‘তাতি’ আর মুসলমান যারা এই কাজ করে তাদেরকে বলে ‘জোলা’। শব্দটা কী এমন দোষ করেছে যে কারণে এটা গালের পর্যায়ে চলে গেছে একথা কেউ ঠিকঠাক বলতে পারবে না। তবে শ-দেড়শো বছর আগ থেকেই এই অঞ্চলের জোলারা নিজেদেরকে ‘কারিকর’ বলতে পছন্দ করছে। বলে আসছেও। দেশগ্রামে কখনও কখনও এমনও হয়েছে কারিকরদের কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে জোলা বলেছে কেউ, সঙ্গে সঙ্গে তুলকালাম হয়ে গেছে। সীতারামপুরের লোকেরা। লাঠি সড়কি নিয়ে বেরিয়েছে। গ্রামের চেয়ারম্যান মেম্বাররা, মাতব্বররা বিচার সালিশ করে সেই ঝগড়া মিটিয়েছে। হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়া একটি শব্দের এ কেমন অপরাধ কে জানে!
ইব্রাহিমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্যরকম। আড়ালে আবডালে এমনকী সামনাসামনিও যে লোকে তাকে ইব্রা জোলা বলে ডাকে, ইব্রাহিম রাগ বিরক্ত কোনওটাই হয় না। সে তার মতো আছে। তাঁতি জোলা কারিকর কোনওটাতেই যেন কিছুই এসে যায় না তার। বাড়িতে সাতখান তাঁত। আপন আর চাচাতো ভাই বেরাদররা সবাই, এমনকী বাড়ির বউঝিরা তরি তাঁত চালায়। প্রতি মঙ্গলবার গোয়ালিমান্দ্রার হাটে গিয়ে শাড়ি লুঙ্গি গামছা বিক্রি করে আসে। ইব্রার ছেলে থাকলে তারাও নিশ্চয় এতদিনে এই পেশায়ই ঢুকে যেত। হয়তো বাপের চুরির মালসামান রাখার আর বিক্রি করার পেশাটাও ধরত। সেই পেশা আড়ালে আবডালে। লোকের চোখের সামনে তাঁতই চালাত! প্রথম জীবনে ইব্রাও তাই করেছে। দিনভর তাঁতের কারবার, রাতভর মুকসেইদ্দা চোরার চুরির মাল সামলানো। দিঘলির চোরাইমাল কিনাবেচার মহাজনদের সঙ্গে যোগাযোগ টাকা পয়সার লেনদেন। ছেলে থাকলে। ছেলেরাও নিশ্চয় তাই করত। ছেলে ইব্রার নাই। আছে তিনটা মেয়ে। জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই। বিয়া হয়েছে মেয়েদের। বড় তো তাদের নিজের বাড়িরই বউ। বড়চাচার মাজারো পোলা ইউনুসের বড়পোলা রমজানের লগে বিয়া হইছে। মেয়ের নাম ফরিদা। বাড়ির লোকে ডাকে ফরি। প্রথমে একটা ছেলে হয়েছে ফরির, তারপর যমজ মেয়ে। পোলাপান সামলেও স্বামী শ্বশুরের কাপড় বোনার কাজে হাত লাগায় সে। খুবই পরিশ্রমী স্বভাবের মেয়ে।
অন্য মেয়ে দুইটা আরজু আর গুনাই। ইব্রা জোলার বাড়ির দুই-তিন বাড়ি এদিক ওদিক বিয়া হয়েছে। একটা দুইটা পোলাপান দুইজনেরই আছে। সংসার তারা ভালই করছে। তবে ছোটমেয়ে গুনাই ছোটবেলা থেকেই রোগাভোগা। শরীর কোনওদিনই ভাল থাকে না। আজ এটা কাল ওটা লেগেই আছে। জামাইটার নাম ফইজু। খুবই নির্বিরোধ ধরনের সোজা মানুষ। রোগা বউ নিয়েই বেদম সুখে আছে।
তিন মেয়ের বিয়া হয়ে যাওয়ার পর ইব্রা গেছে ঝাড়া হাত-পা হয়ে। সংসারে মন নাই। মুকসেদের সঙ্গে লেগে থাকা ছাড়া কোনও কাজও করে না। মুকসেদ জেলে গেলে উকিল মোক্তার ধরে তার জামিনটামিন করানোর কাজটা গুরুত্ব দিয়ে করে। বহুদিন ধরে এই একই কাজ করছে বলে মুনশিগঞ্জ কোর্টের বেশির ভাগ উকিলই তার পরিচিত। কোর্টের কর্মচারীরাও পরিচিত। ফলে কাজটা সে ভালভাবেই করতে পারে। মুকসেদের টাকাপয়সা তো তার কাছেই থাকে। থাকলে হবে কী, ইচ্ছামতো খরচাটা ইব্রা কখনও করে না। খুবই হিসাবি মানুষ সে। চোরের শাগরেদ হয়েছে বলেই যে অসৎ চরিত্রের হবে তা না। একটা পয়সাও এদিক ওদিক করার অভ্যাস নাই। টাকাপয়সা নিয়ে এই এতগুলি বছরে ইব্রার সঙ্গে মুকসেদের কখনও গন্ডগোল হয়নি। ইব্রার হিসাবে আজ পর্যন্ত কোনও গরমিল মুকসেদ পায়নি। চোর হয়েও যে নীতিবান হতে পারে কেউ ইব্রা তার প্রমাণ।
