মুকসেদ এসে দুলালের সেলুনে ঢুকল।
খরিদ্দার দেখলে খুবই পুলকিত হওয়ার স্বভাব দুলালের। মুকসেদকে দেখেও হল। তড়াক করে লাফিয়ে উঠেই হাসিমুখে সালাম দিল। আছোলামালাইকুম।
সালামের জবাব দিল না মুকসেদ। দুলালের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমারে চিনো?
দুলাল আগের মতোই হাসিমুখে বলল, না।
মুকসেদ হাঁপ ছাড়ল। তয় ঠিক আছে।
তারপর চেয়ারটায় গিয়ে বসল। দুলাল এসে দাঁড়াল তার পিছনে। সামনে রাখা আয়নার ভিতর দিয়ে মুকসেদের মুখের দিকে তাকাল। মুখ বানাইবেন? দাড়িমোচ ছাঁটবেন?
না হালাই দিমু।
পুরা হালায় দিবেন?
হ।
আইচ্ছা। মাথার চুলও তো লাম্বা অইছে। খেরি করবেন?
হ। চুল এক্কেরে গিনি গিনি (অতিছোট অর্থে) কইরা দিবা।
দুলাল আর কথা বলল না। নাপলি কাজের সাদা কাপড় মুকসেদের গলা থেকে হাঁটু তরি নামিয়ে দিল, তারপর গলার কাছে গিঁটটু দিয়ে বেঁধেই চিরুনি আর কেঁচি হাতে নিল। আগে খেরিডা করি তারবাদে মোক বানামুনে।
আইচ্ছা। তয় চুল একদোম ছোড করবা। কদমছাঁট।
দুলাল হাসল। আইচ্ছা।
তারপর খুটখুট করে কাঁচি চালাতে লাগল।
মুকসেদের স্বভাব হচ্ছে ক্ষৌরকর্মের সময় ঘুমানো। চেষ্টা করেও চোখ বেশিক্ষণ খোলা রাখতে পারে না। এখন এই চেয়ারে বসার পর পরই, দুলাল তার মাথায় কাঁচি লাগাবার পর পরই চোখ টানতে শুরু করেছে। তারপরও মুকসেদের খুব ইচ্ছা করছে দুলালের সঙ্গে কথা বলার। কারণ লোকটাকে সে চিনতে পারছে না। এই এলাকায় সেলুন দিয়ে বসেছে অথচ মুকসেদ চিনে না, এ কেমন কথা! না হয় বছরখানেক পর নিজের এলাকায় এসেছে। সে, এই এক বছরে সড়কের কাজে ম্যালা নতুন লোকজন এসে থান গাড়ছে এলাকায়, নাপিতও সেইরকম কেউ কি না বোঝা দরকার।
মুকসেদ বলল, নাম কী তোমার?
দুলাল তার স্বভাব মতো হাসিমুখে বলল, দুলাল। সেলুনে ঢোকনের আগে সাইনবোর্ড দেহেন নাই? দুলাল সেলুন। আমার নামঐ দুলাল।
বাড়ি কই?
পুব কুমাড়বুগ। চন্দ্রের বাড়ির মাডের দক্ষিণে।
ইন্দু না মোসলমান?
দুলাল আবার হাসল। মোসলমান।
দোকান দিছো কবে?
বেশিদিন না। সাত-আষ্ট মাস অইছে। আগে দোকান আছিল না। জলচকি লইয়া শিমইল্লা (শিমুলিয়া) বাজারে বইতাম। ওই মিহি কাম কাইজ কম। অহন কাম কাইজের জাগা অইল মাওয়া। রাস্তার কামে মানুষজনের আকাল নাই এই মিহি। নাইলে দেহেন না, দ্যাশ গেরামে রাইত্রে নাপতের দোকান খোলা থাকেনি?
হ ঠিকঐ কইছো।
আপনেগো বাড়ি কোন গেরামে? এই দ্যাশের মানুষ তো? নাকি অন্য কোনওহান থিকা আইছেন?
আয়নার ভিতর দিয়ে দুলালের মুখের দিকে তাকাল মুকসেদ। হাসল। তোমার কী মনে অয়?
মুকসেদকে হাসতে দেখে দুলালও হাসল। বোজতে পারতাছি না।
কথা হুইন্নাও বোজতাছো না?
হ হেইডা বোজতাছি।
কী বোজতাছো কও তো?
কথা হুইন্না তো আমগো দ্যাশের মানুষঐ মনে অয়।
হ তোমগো দ্যাশের মানুষঐ আমি।
কোন গেরামের?
গ্রামের নাম বলল মুকসেদ।
শুনে দুলাল বলল, মেদিনমণ্ডলের মানুষ আপনে, তয় আপনেরে তো কোনওদিন দেহি। নাই। দ্যাশ গেরামে থাকেন না?
না।
তয় থাকেন কই?
নানান জাগায়।
করেন কী?
বিজনিস আছে আমার, বিজনিস।
কীয়ের বিজনিস?
নানান পদের। যহন যেই বিজনিসে সুবিদা অয় ঐডা করি।
কথা অন্যদিকে ঘোরাল মুকসেদ। তুমি ইন্দু না মোসলমান জিগাইছি দেইখা কিছু মনে করো নাই তো?
দুলাল তার মতো করে হাসল। না মনে করুম ক্যা? এতে মনে করবার কী অইলো?
তয় আমারে জিগাও, ক্যান কথাডা আমি জিগাইলাম?
লোকটার কথাবার্তার ধরন বেশ মজার। কথা বলতে ভাল লাগছিল দুলালের। কথাটা জিজ্ঞাসা করবার আগে মুকসেদের নাম জানতে চাইল সে। নামটা বলল মুকসেদ। তারপর দুলালের জিজ্ঞাসা করার ধার না ধেরে বলল, আমগো দ্যাশে আগে নাপলি করতো ইন্দুরা। তোমার নাম হইল দুলাল। দুলাল কইলাম ইন্দু মোসলমান দুই জাতের মাইনষের নামঐ হইতে পারে।
হ ঠিকঐ কইছেন।
এর লেইগাঐ জিগাইছি। আমগো দ্যাশ তো আগিলা দিনে ইন্দুতে ভরা আছিলো। কালিরখিল, কুমারবুগ মেদিনমণ্ডল বেবাকঐ আছিলো ইন্দু গেরাম। এই মাওয়ার বাজারে জলচকিতে বইয়া নাপতালি করতে নিতাই। ধোয়া লুঙ্গি আর সাদা শার্ট ফিনতো। কথাবার্তা ভদ্রলোকের লাহান। আর দেখতে যে কী সোন্দর আছিল নিতাই! যাত্রা সিনামার হিরুগো লাহান। নিতাইয়ের মিহি চাইলে খালি চাইয়া থাকতে অইতো। চক্ক ফিরান যাইতো না। নিতাইয়ের লাহান সোন্দর পুরুষোেলা জিন্দেগিতে আমি দেহি নাই।
দুলাল বলল, হেয় কো অহন? মইরা গেছেনি?
আরে না মিয়া। আমগো থিকা বম্বে (বয়সে) কম। বাইচ্চাঐ আছে।
থাকে কই?
এই দ্যাশে আর থাকে না। কইলকাত্তা গেছে গা। দুইবার এই দ্যাশ থিকা ইন্দুরা ইন্ডিয়ায় গেছে। একবার অইলো পার্টিশনের সময় আরেকবার অইলো স্বাধীনতা যুইদ্ধের সময়। নিতাই গেছে স্বাধীনতা যুইদ্ধের সময়। তয় কইলকাত্তায় ভালঐ আছে। তোমার লাহান সেলুন দিছে।
আপনে হোনলেন কার কাছে?
আমগো গেরামের বহুত মানুষ আছে যারা ফুটুর ফুটুর কইলকাত্তা যায় আর আহে। বেলাকার (ব্যাকার)। বেলেক করতে যায়। নিতাইয়ের লগে তাগো দেহা অয়। দ্যাশের মাইনষেরে বহুত খাতির করে নিতাই। এই বেলেকারগো মোখেঐ আমি নিতাইয়ের কথা হুনছি।
মুকসেদের মাথার চুলে কদমছাটটা তখন পুরাপুরিই দিয়ে ফেলেছে দুলাল। চুলে কদমছাট পড়ার ফলে চেহারা অনেকখানিই বদলেছে মুকসেদের। এখন দাড়িমোচ কামানো হলে পুরাপুরিই বদলাবে। এই বদলটা দেখবার জন্যই দুলালের লগে কথা বলে চোখের টানটা সরিয়ে রাখতে চাইছে মুকসেদ! কিছুতেই ঘুমাতে চাইছে না!
