মুদিদোকান দুইটার পাশে একখান চায়ের দোকানও আছে। এই দোকানের সামনে। দাঁড়িয়ে পলকের জন্য নিজের ছেলেটার কথা মনে পড়ল মুকসেদের। নিজের ঔরসে জন্মেও যে হয়ে গেছে অন্যের সন্তান।
এই নিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ল না মুকসেদের। দোকানিকে এককাপ চা দিতে বলে উদাস হয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। পকেটে সিজার্স সিগ্রেটের প্যাকেট আছে, চা খেয়ে সিগ্রেট ধরাবে সে।
তখন শেষ বিকালের রোদে পাকা মিষ্টি কুমড়ার রং ধরেছে। পদ্মার পানি আর নদীতীরের চটান মাটি থেকে একটু একটু করে সরে যাচ্ছে রোদ। শেহের আলি পিয়নের বাড়ির গাছপালা আর ঘরদুয়ারের আড়ালে আবডালে জমছে হালকা অন্ধকার। চা খেতে খেতে সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল মুকসেদ।
দোকানের ভিতর দিকে বসা একজন লোক চোখ সরু করে মুকসেদের দিকে তাকাল। আপনেরে চিনা চিনা লাগে! বাড়ি কই?
ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটার দিকে তাকাল মুকসেদ। মেদিনমণ্ডল।
মেদিনমণ্ডল কোন বাড়ি?
কইলে চিনবেন?
চিনুম না ক্যা?
আপনের বাড়িও মেদিনমণ্ডল?
না, কুমারবুগ।
কুমারবুগ কোন বাড়ি?
পিয়ার খাঁ-র বাড়ির দক্ষিণের বাড়িঐ আমগো।
আর আমগো বাড়ি অইলো মান্নান মাওলানার বাড়ির লগে। হের বাড়ি থিকা তিন-চাইর কাইক (পা)।
নাম কী আপনের?
চা শেষ করে সিগ্রেট ধরাল মুকসেদ। চায়ের পয়সা দিতে দিতে বলল, আসল নাম কইলে চিনবেন?
লোকটা হাসল। থাউক, কওনের কাম নাই। আমি আপনেরে চিনছি। আইলেন কই থিকা?
মুনশিগইঞ্জ থিকা।
লোকটা আবার হাসল। বুজছি।
তারপর লঞ্চঘাটে আর দাঁড়ায়নি মুকসেদ। বাজারের দিকে হাঁটা দিয়েছে। পরনে উঁচু করে পরা নীল সাদায় মিশানো লুঙ্গি আর মরাপাতা রঙের ফতুয়া। মুখে কাঁচা পাকায় মিশানো ঘন দাড়ি মোচ। মাথার চুলও দাড়ি মোচের মতোই, কাঁচা পাকা, তবে এই বয়সেও বেজায় ঘন। বহুদিন কাচি পড়েনি চুলে, লম্বা হয়েছে বেশ। জেল থেকে বেরিয়েই সেলুনে যাওয়া উচিত ছিল। সময়ের অভাবে যাওয়া হয়নি। আধঘণ্টার মধ্যে ঢাকার লঞ্চ এসে লাগবে মুনশিগঞ্জ ঘাটে। সেই লঞ্চ পদ্মা ধরে লৌহজং হয়ে যাবে ভাগ্যকূল, মাঝখানে থামবে মাওয়ার ঘাটে। এই লঞ্চ ধরতে পারলে আজ সন্ধ্যায়ই বাড়ি যাওয়া যায়। আর নয়তো আজকের বাকি দিনটা রাতটা মুনশিগঞ্জে কাটাতে হয়।
ইব্রাহিম অবশ্য অন্য একটা বুদ্ধি দিয়েছিল। বলেছিল, লও আগে কোনও হইটালে বইয়া। ভাত খাই। তারবাদে আমার লগে লও ঢাকা। কলতাবাজারে আমার সমন্দির বাসা। হেই বাসায় আউজকা রাইতটা থাইক্কা কাইল বিয়ানে সদরঘাট থিকা লঞ্চে উইট্টো। ঢাকার টাউনে হারা রাইত সেলুন খোলা থাকে। ওহেন থিকা খেরি অইয়া (চুল কাটানো, ক্ষৌরিকর্ম অর্থে) লইয়ো।
শুনে মুকসেদ বলেছে, এত হাঙ্গামার কাম নাই। আমি অহনকার লঞ্চটাই ধরি। তুই ঢাকা যা, তর কাম সাইরা আয়। বুদ্ধি পরামর্শ যা করনের তারবাদে করুম নে। টেকা পয়সার হিসাবও পরে অইবো নে। অহন তিনশো টেকা দিয়া যা আমারে।
ইব্রাহিমের কাছ থেকে তিনশো টাকা নিয়ে লঞ্চে চড়েছিল মুকসেদ।
এখন বিকাল শেষ হয়ে গেছে। মাওয়ার বাজারে এখন কি নাপতাদের কাউকে পাওয়া যাবে! খেরিটা আজই করা দরকার। মোচ দাড়ি আর রাখবেই না। একেবারেই কামিয়ে ফেলবে। চুলটাও করবে কদমছাট যাতে লোকে চট করে দেখেই তাকে আর চিনতে না পারে। এবার মনের ভিতর অন্য রকমের একটা চিন্তা আছে তার। দেখা যাক রূপ বদলে সেই চিন্তা কাজে লাগানো যায় কি না!
.
মাওয়ার বাজারে ঢোকার মুখে পথের ধারে দুলালের সেলুন।
হাত তিন-চারেক লম্বা কালো রঙের সাইনবোর্ডে সাদা অক্ষরে লেখা দুলাল সেলুন’। মাথার উপর চার-পাঁচখান ঢেউটিন ফেলে, চারদিকে বাঁশের বেড়া, সস্তা ধরনের কাঠের নড়বড়ে দরজা, ভিতরে ঠিক দরজা রঙের কাঠের বাক্স, বাক্সের উপর হাত দুয়েক লম্বা এবং চওড়া মুখ দেখার আয়না লাগানো, তার সামনে হাতআলা চেয়ার, মুখ দেখার আয়নার তলায় ক্ষুর কচি বিভিন্ন রকমের চিরুনি, ছোট্ট অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে রাখা সাবান, সাবানের পাশে বহু ব্যবহারে ম্লান হয়ে যাওয়া মুখ কামানোর কাজে ব্যবহার করার বুরুশ ব্রাশ), বুরুশের পাশে অর্ধেক খালি হওয়া ডেটলের শিশি, বড় এক টুকরা ফিটকিরি, ঘাড়ে লাগিয়ে গোড়া থেকে চুল ছেটে তোলার হ্যাঁন্ডেলঅলা একখান যন্ত্র, পুরানা (তোয়ালে) আর কামাবার সময় খরিদ্দারের (খদ্দেরের) গায়ে জড়িয়ে রাখার সাদা সস্তা ধরনের কাপড়, এই হচ্ছে দুলালের সেলুন। মাটির মেঝের একপাশে দুই-তিনজন লোক বসতে পারে এমন একখান বেঞ্চ আছে। বেড়ার গায়ে পুরনো খবরের কাগজ আঠা দিয়ে খুবই যত্ন করে সঁটা হয়েছে। বেড়ার একদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রঙিন পোস্টার পাশাপাশি লাগানো। তার তলায় সাদা লম্বা কাগজে বড় বড় করে লেখা রাজনৈতিক আলোচনা নিষেধ।
দুলালের সেলুনে এখন পুরনা হ্যাঁজাক জ্বলছে। বাতিটার একদিককার ভাঙা কাঁচে সাদা কাগজ লাগিয়ে রাখা হয়েছে। তাপে তাপে কাগজটা হলুদ বর্ণ হয়ে গেছে। ভিতরে ম্যান্টেলের এককোনা খুলে পড়েছে। শো শো শব্দ আছে বাতিটার। তবু এই বাতির আলোয় দুলালের সেলুন আলোকিত। আলো পছন্দ করা কয়েকটা পোকা এসে ওড়াউড়ি করছে হ্যাঁজাক বাতির চারপাশে। এই বাতির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বেঞ্চে বসে আছে দুলাল। তার পাশে রাখা কালো রঙের ছোট্ট টেপ রেকর্ডার। তাতে সাবিনা ইয়াসমিনের গান হচ্ছে ‘এই মন তোমাকে দিলাম।
