মজনুর জন্য বুকটা তোলপাড় করতে লাগল তার! গাল বেয়ে নামল গভীর কষ্টের কান্না! অন্ধকার ঘরে পরম করুণাময়ের উদ্দেশে তোলা মোনাজাতে সে বলল, ইয়া হে আল্লাহ, ইয়া রাব্দুল আল আমীন, যেই পোলারে জন্ম দিয়াও আমি তার মিহি ফিরা চাই নাই, তার কথা ভাবি নাই, আমার হেই পোলাডারে তুমি ছহি ছালামতে রাইখো। অরে তুমি বাঁচাইয়া রাইখো।
.
কীরে মুকসেইদ্দা চোরা, আছস কেমুন?
লঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে নিজেকে এই প্রশ্নটা করল মুকসেদ আলী। মাওয়ার যে ঘাটে এখন লঞ্চ ভিড়ে সেটা কোনও পাকাপাকি ঘাট না। শেহের আলী পিয়নের বাড়ি বরাবর ভাঙনের দিকে আইডব্লিউটি-এর ছোট্ট একখান জেটি বান্ধা। এই জেটিতে এসে লাগে লঞ্চ। সিঁড়ি নামিয়ে দিলে যাত্রীরা নামে।
বহু বছর ধরে মাওয়ার এদিকটা ভাঙতে ভাঙতে গত কয়েক বছর হল ভাঙনটা থেমেছে। পদ্মার এদিক ওদিক চর পড়তে শুরু করেছে। একবার চর পড়তে শুরু করলে ভাঙন কমে আসে। তবে ভাঙনে ভাঙনে এলাকার সর্বনাশ যা হওয়ার অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে। কত গ্রাম, কত বসত ভিটা, কত জমি, মাঠ বিলীন হয়ে গেছে।
আজ যেখানে মাওয়ার লঞ্চঘাট আর বাজার, এই বাজার লঞ্চঘাট এখানে ছিল না। বাজার ছিল এখনকার বাজার থেকে, কালিরখিলের মাঠ থেকে বেলদার বাড়িগুলি ছাড়িয়ে। আধামাইল দক্ষিণে। শ্রীনগর থেকে গোয়ালিমান্দ্রা হয়ে হলদিয়ার দিকে চলে যাওয়া একটা খাল গোয়ালিমান্দ্রার হাটের উত্তরে কাজিরপাগলার দিকে ঢুকে গেছে। সেই খাল সীতারামপুর। হয়ে দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডলের ভিতর দিয়ে মাওয়ার বাজারের পাশ দিয়ে পদ্মায় পড়েছিল। বাজারের লগে রিশিপাড়া (মুচিপাড়া), খালের ধারে। রিশিপাড়ার দক্ষিণ দিকটায় ছিল পূজামণ্ডপ। তিনদিকে বাঁশের বেড়া, সামনেটা ভোলা আর মাথার উপর ঢেউটিন ফেলা মণ্ডপে বছরভর কোনও না কোনও মূর্তি দাঁড়িয়ে থাকত।
এই পূজামণ্ডপের ডানদিকে খালের পার ধরে একখানা রাস্তা চলে গেছে বাজারের দিকে। রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে ছোট্ট একখানা মাঠে। মাঠের উত্তরে খালের উপর কাঠের পুল। পুলের ওপারে তিন-চাইরখান টিনের ঘরে অফিস কাছারি। দক্ষিণে, মাঠের পশ্চিমকোণে হাজার হাজার ঝুরি নামানো বিশাল বটগাছের দক্ষিণ দিককার তলায় পোস্ট অফিস। পোস্ট অফিসের নাক বরাবর দক্ষিণে দুই সারি টিনের ঘরের দোকানপাট, মাঝখানকার ফাঁকা জায়গায় কাঁচা বাজার। মাছচালার লগে, পুবদিকে একখান পালকি আরেকখান মাফা (ডুগি) নিয়ে বসে থাকত উড়িয়া বেহারারা।
রিশিপাড়ার পূজামণ্ডপের নাক বরাবর যে পায়েচলা পথ সেটা সোজা চলে গেছে মাওয়ার বাজার হাতের ডাইনে রেখে নদীর ঘাটে। পূজামণ্ডপ থেকে কিছুদূর আগালেই ডানপাশে পথের ধারে ছিল একজোড়া জামগাছ। জামগাছের পেছনে ছোট্ট একখণ্ড শস্যজমি। বছরভর আখ জন্মে থাকত সেই জমিতে। জামগাছ দুইটার মুখ বরাবর পুবপাশেও আখের জমি, দিনেরবেলাও আবছায়া হয়ে থাকত জায়গাটা।
বাজার ছাড়িয়ে পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে খাল আর নদীর মুখে ছিল লঞ্চঘাট। তখন জেটি ছিল না। নদীতীরের চটান মাটি ভাঙনের দিকে এসে দাঁড়াত লঞ্চ, লম্বা সিঁড়ি নামিয়ে দিত। ওই সিঁড়ি বেয়ে টলমল পায়ে ওঠানামা করত যাত্রীরা।
নদীর ওইদিককার তীর ধরে মানুষের ঘরবাড়ি ছিল। আর ছিল জেলে নাও। কোনওটা ডাঙায় তোলা, আলকাতরা গাব দেওয়া হয়েছে, মেরামত হচ্ছে কোনও কোনওটা। নদীতীরে ইলিশের জাল শুকাতে দিয়েছে জেলেরা। পড়ন্ত বিকালে নদীতীরে বসে বিড়ি কুঁকছে কোনও কোনও আয়েশি জেলে।
বেশিকাল আগের কথা না এসব। স্বাধীনতার পনেরো-বিশ বছর আগের কথা। তারপর বছর বছর ভাঙন। কোথায় গেল সেই নদীর ঘাট, মাওয়ার সেই বাজার, বটতলার পোস্ট অফিস। কোথায় গেল জোড়া জামগাছ, আখের খেত, রিশিপাড়া আর তাদের পূজামণ্ডপ। বাজারের পশ্চিম কোণে, নদীতীরের দুই একটি বাড়িঘর আর বাজারখোলার মাঝখানে কানি দুই তিনেক জমিন ছিল, সেই জমিনে একবার বিশাল প্যান্ডেল বেঁধে সার্কাস হয়েছিল। এলাকার মানুষজন ভেঙে পড়েছিল সার্কাস দেখতে। কোথায় নদীর কোন অতলে তলিয়ে গেছে সেই জমি!
তারপর মাওয়ার বাজার শুধু পিছিয়েছে। কয়েক বছর একজায়গায় থাকে বাজার, পদ্মার ভাঙন শুরু হয় আর পিছাতে থাকে বাজার। আজ শেহের আলী পিয়নের বাড়ি বরাবর নদীর ঘাটে লঞ্চ থেকে নেমে সেই পুরানা লঞ্চঘাট আর মাওয়ার বাজার, রিশিপাড়া সব যেন চোখের উপর পরিষ্কার দেখতে পেল মুকসেদ। রিশিবাড়িগুলির চারপাশে ছিল কলাগাছ। খরালিকালের নদী থেকে আসা হাওয়ায় অবিরাম বুক পিঠ দেখাত কলাপাতা। সেরকম কলাপাতার ছায়ায় ছায়ায় কতদিন মাওয়ার বাজারে হেঁটে গেছে মুকসেদ।
এখনকার লঞ্চঘাটে ছোট ছোট দুইখান বিড়ি সিগ্রেট আর পানের দোকান। জের বয়াম ভরা বিস্কুট আছে, পাঁউরুটি কলা আছে দোকানে। শিশুদের দুই-চারটা প্লাস্টিকের খেলনাপাতি আছে। রাজা কনডোমের লম্বা মতন বাক্সও আছে, মায়া বড়ির বাক্স আছে। লঞ্চ থেকে নামা যাত্রীদের কারও কারও যে এসব জিনিসের দরকার সেকথা বেশ ভালই বুঝতে পারছে চতুর দোকানিরা।
বুঝতে না পারার কথাও না। দুই-চার-ছয় মাস পর পর বাড়ি ফিরে ঢাকা মুনশিগঞ্জ চাঁদপুরে চাকরিবাকরি কায়কারবার করা লোকজন। বাড়ি ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য দিকপাশ ভাববার সময় থাকে না। তখন তো এসব জিনিসের দরকার পড়বেই! তা ছাড়া দেশগেরামের মানুষ কি আর আগের মতো বলদ এখন! মানুষ গেছে বুদ্ধিমান হয়ে। বছর বছর সন্তান উৎপাদনে তাদের আজকাল আগ্রহ নাই।
