জোহরের নামাজ সে পড়ে নেয় ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় বসে, শেষ দুপুরে খাওয়ার ছুটির সময়। মাটিয়ালের কাজ নেওয়ার পর পরই অন্যান্য মাটিয়ালদের সঙ্গে তিনবেলার খাওয়ার বন্দোবস্ত আদিলউদ্দিন করে নিয়েছে। হাঁসাড়ার ওদিককার একজন যুবক বয়সি হিন্দু মাটিয়াল আছে পবন, ঠাকুর বাড়িতে অন্যান্য মাটিয়ালদের সঙ্গে নৌকার ছইয়ের মতন ছাপরা করে থাকে। ছয়জনের একটা দল আছে তার। সে ছাড়া সবাই মুসলমান। ছয়জনে একত্রে রান্নাবান্না করে খায়। একেকদিন একেকজনের রান্নার পালা। যার যেদিন রান্না থাকে সে সেদিন কাজে যায় না। সকাল থেকেই রান্নার কাজে লেগে যেতে হয়। ছাপরার সামনে থানইট সাজিয়ে চুলা তৈরি করা হয়েছে। লাকরি খড়ি ম্যাচ কেরাসিন, হাঁড়ি পাতিল সব আছে হাতের কাছে। মাছ কোটার বঁটি, মশলা বাটার পাটাপুতা, তারপরও ছয়জন মানুষের তিনবেলার রান্না সারতেই দিন কাবার। কিন্তু মুশকিল হয়েছে একটা দিন নিয়ে। সপ্তাহে তো সাতদিন, ছয়জনে না হয় ছয়দিনের রান্না চালাচ্ছে, আর একটা দিনের কী হবে! কে কাম কামাই করে ওই দিনের রান্নাটা করবে?
এই সমস্যা মিটিয়ে দিয়েছিল আদিলউদ্দিন।
পবন ছেলেটা ফুর্তিবাজ ধরনের, প্রাণবন্ত আর মানুষের জন্য মায়ামমতায় ভরা মন। এখানে কাজে আসার পর থেকেই আদিলউদ্দিনের জন্য মায়া পড়েছিল তার। যে বয়সে বাড়ির উঠানে বসে আরামের দিন কাটাবার কথা মানুষটার, ছেলেরা রোজগার করে খাওয়াবে, সেই বয়সে এই অমানুষিক কষ্টের কাজ করতে এসেছে কতটা কষ্টে পড়ে এটা প্রায়ই ভেবেছে পবন। সময় অসময়ে ছোটখাটো বিপদ আপদে আদিলউদ্দিনের পাশেও দাঁড়িয়েছে সে। যেমন নিজে অতিরিক্ত মাটি বোঝাই গোড়া মাথায় নিয়ে আদিলউদ্দিনকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে হালকা ধরনের বোঝ। আলী আমজাদকে বুঝতে দেয়নি কিছু। আবার যেদিন পবনের কাজ থাকে কোদালে মাটি কেটে গোড়ায় ভরে দেওয়ার সেদিনও খুবই সূক্ষ্মভাবে আদিলউদ্দিনের গোড়ায় সে মাটি ভরে দিয়েছে হালকা করে, অর্থাৎ কোনও কোনওভাবে লোকটিকে একটু বাঁচিয়ে নেওয়া।
এই পবনই আদিলউদ্দিনকে ডেকে নিয়েছিল তাদের দলে। তাদের একদিনের রান্নার সমস্যাও মিটে, আদিলউদ্দিনেরও তিনবেলা খাওয়ার পাকা বন্দোবস্তও হয়। বন্দোবস্তের আগে ভাত খেতে আদিলউদ্দিনকে যেতে হত মাওয়ার বাজারে। এতটা দূর যাওয়া আসা, বিরাট ঝামেলা। খাওয়াদাওয়া শেষ করে দুই-চাইর মিনিট জিরাবার সময়ও হত না।
পবন অবশ্য তাকে বলেছিল, কাকা, আপনে কইলাম আমগো লগে থাকতেও পারেন। যেই ছইয়ের নীচে আমরা ছয়জন থাকি ওহেনে আপনেও থাকতে পারেন। শীতের দিনায়খালি চাপাচুপি অইবো, খরালিতে কোনও অসুবিদা নাই। তহন তো ভোলা আসমানের তলায় নাইলে গাছতলায় হুইয়া থাকলেও রাইত কাইট্টা যাইবো।
আদিলউদ্দিন হাসিমুখে বলেছে, না বাজান, থাকনের জাগা আমার আছে।
এই পবনদের সঙ্গে খেতে শুরু করার পর থেকেই দুইটা পয়সার মুখ আদিলউদ্দিন দেখছে। সাতজন মানুষ একসঙ্গে খায় বলে খরচাটা কম। বাজারের হোটেলে তিনদিন খেলে যে খরচা সেই খরচায় পবনদের সঙ্গে পুরা সপ্তাহ খাওয়া যায়। খাওয়াও ভাল, একদম ঘরবাড়ির বউঝিদের হাতের রান্নার মতো। খাওয়ার পর কয়েকদণ্ড জিরানোনাও যায়। সব মিলিয়ে মাস দেড়েক ধরে ভালই আছে আদিলউদ্দিন। হাতে পাঁচ-সাতশো টাকাও জমেছে।
এই টাকা দিয়ে কী করবে আদিলউদ্দিন? কাকে দিবে? কে আছে তার?
এসব ভেবেই আজ রাতে মরনির বাড়ি ফিরেছিল সে। ভেবেছিল মরনিকে ডেকে তুলে তার সঙ্গে একটু পরামর্শ করবে। টাকাটাও জমা রেখে দিবে তার কাছে। সে মাটিয়াল মানুষ, মাজায় বান্দা তবিলে টাকা রেখে দিয়েছে ঠিকই কখন কোন অঘটন ঘটে যাবে, অন্ধকারে বাড়ি ফিরার পথে কে কবে ছিনিয়ে নিবে টাকাটা। তারচেয়ে মরনির কাছে থাকলে নিরাপদে থাকবে।
মরনির ঘরের সামনে আজ রাতে এসে দাঁড়াবার পর আদিলউদ্দিন টের পেল ঘরের ভিতর কারা যেন কান্নাকাটি করছে। পাটাতন ঘরের ফাঁকফোকর দিয়ে এসে পড়েছে হারিকেনের আলো।
কারা এসেছে আজ মরনির ঘরে? মিলিত স্বরে এমন দুঃখবেদনার কান্না কাঁদছে কারা!
গ্রামে ঘটে গেছে আজ অদ্ভুত এক কাণ্ড। নূরজাহান নামের একটা কিশোরী মেয়ে মান্নান মাওলানা সাহেবের মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছে পুলিশ দারোগার সামনে। মাওলানা সাহেবের বাড়ির পুরানা গোমস্তা মাকুন্দা কাশেম গোরু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। সব মিলিয়ে ভালরকম ভজঘট।
কিন্তু মরনির ঘরে এভাবে কাঁদছে কারা?
আদিলউদ্দিনের ইচ্ছা হল দরজায় ধাক্কা দিয়ে মরনিকে সে ডাকে, জিজ্ঞাসা করে কে কাঁদে, কী হয়েছে। কিন্তু এ করতে গেলেই তো ঘরের ভিতরকার লোকেরা জেনে যাবে আদিলউদ্দিনের কথা, মরনি একটা বিপাকে পড়বে।
এসব ভেবে মনের ইচ্ছা মনে চেপে রাখে আদিলউদ্দিন। বাড়িতে এসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রহমান হালদারের কুকুরটা এসে আহ্লাাদ জানাতে শুরু করেছে। কুকুরটাকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে এসে ঢুকল আদিলউদ্দিন, দরজা বন্ধ করল। পবনদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া সেরেই অজু করে নিয়েছিল। এখন ঘুটঘুইট্টা অন্ধকার বিছানায় নামাজে দাঁড়াল সে। নামাজের শেষ পর্যায়ে, পরম করুণাময়ের উদ্দেশে মোনাজাতের জন্য দুইহাত তুলেই। একজন মানুষের কথা মনে পড়ল আদিলউদ্দিনের। তার প্রথম ঘরের সন্তান মজনু। কেমন। আছে সে?
