বেশ কিছুদিন ধরে আদিলউদ্দিনকেও।
প্রথম প্রথম অচেনা ছিল মানুষটা। তখন খেউক খেউক করত। দিনে দিনে চিনা হয়ে গেছে, এখন আর তেমন করে না। আদিলউদ্দিনকে দেখলেই ছুটে এসে লেজ নাড়ায়, কুঁই কুঁই শব্দে আদুরে ভাব করে। তারপর আদিলউদ্দিন তার ঘরে ঢুকে যাওয়ার পর কুকুরটা। ফিরে যায় রহমান হালদারের সীমানায়।
আদিলউদ্দিন বাড়ি থেকে বেরোয় বিয়াইন্না রাইতে (ভোররাত), মরনি ঘুম থেকে উঠে দুয়ার খোলার অনেক আগে। দিনে আর কখনও ফিরা হয় না। ফলে এই বাড়িতে গোড়া নিতে এসে দক্ষিণের ভাঙাচোরা ছোট্ট ঘরটায় আশ্রয় পাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত দুইজন মানুষের আর দেখা হয়নি। মরনি জানে রাতেরবেলা নিজের সীমানায় সে একা না, উঠানের দক্ষিণ পাশে, বড়ঘরের মুখোমুখি ঘরটায় মাটির মতো নিঃশব্দে পড়ে থাকে আরেকজন মানুষ। রাতের আঁধারে কখন আসে সেই মানুষ, কখন যায়, সে ছাড়া আর কেউ তা জানে না। কোথায় খায় সেই মানুষ, কোথায় পেশাব পায়খানা সারে, কোথায় নাইয়াধুইয়া সাফ সুতরা হয়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে কি না কে জানে, করলে অজু করে কোথায়, নামাজ আদায় করে কোথায়, মানুষটাকে গোড়া দেওয়ার পর থেকে কখনও কখনও এই ভাবনাও ভেবেছে মরনি। তার ভাবনার কথাও সে ছাড়া আর কেউ জানে না।
তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ঠিকই করে আদিলউদ্দিন। প্রায়ই কাজা হয়, তবু করে। কাজা হয় আলী আমজাদের ভয়ে। লোকটা মানুষ না, পিশাচ। কাজের সময় ধর্মকর্ম, জীবন মরণ কিছুই বোঝে না। একটু এদিক ওদিক করলেই কোকসায় লাথথি। সে তদারকিতে থাকলে নামাজ কাজা হবেই।
হেকমত অন্যরকম। দিলে রহম একটু আছে তার, দয়ামায়া আছে। নামাজ পড়ার সময়। চাইলে দেয়। কোনওরকমে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারলেই হল, বাজান, নমজ পড়ুম।
লগে লগে একহাত থেকে ছাতা বদলে অন্যহাতে নিবে। সাবধানি চোখে চারদিক তাকিয়ে হাসিমুখে বলবে, কনটেকদার সাব মনে অয় ঘরে গেছে আর নাইলে মটরসাইকেল লইয়া গেছে মাওয়া। বাজারে বইয়া দোস্তগো লগে চা সিকরেট খাইতাছে। যান এই ফাঁকে নমজটা পইড়া হালান।
প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি আদিলউদ্দিন। নামাজের সময় হলেই, খাইগো বাড়ির মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে এলেই মাটি টানার গোড়া পথের পাশে রেখে, রাস্তার কাজের জন্য দুইপাশ থেকে মাটি কেটে তোলার ফলে যে খাল মতো হয়েছে, সেই খালের কোথাও কোথাও জমেছে টলটলা পানি, আর নয়তো পথপাশের কোনও পুকুরে নেমে গেছে অজু করতে। অজু সেরে মাজায় বান্ধা গামছা পাগড়ির মতন মাথায় প্যাচিয়ে পথপাশের কোনও ঘাসভরতি মাঠে নামাজটা সেরে নিয়েছে আদিলউদ্দিন। নামাজ পড়ার ব্যাপারেও যে নিজের স্বার্থটুকুকেই শুধু দেখতে পারে কোনও মুসলমান, ওই নিয়ে কথা বলতে পারে, বকাঝকা মাইর ধইর করতে পারে কোনও নামাজি লোককে, এটা কল্পনাও করেনি আদিলউদ্দিন। কিন্তু এরকম ঘটনাই একদিন ঘটিয়েছিল আলী আমজাদ।
আলী আমজাদের কথায় বইতে পারার তুলনায় বেশি মাটি ভরে দিয়েছিল একজন আদিলউদ্দিনের মোড়ায়। ভারে ঘাড় বেঁকা হয়ে আসছিল লোকটির, বেশির ভাগ পাকা দাড়িগোঁফের আড়ালে ফেটে পড়তে চাইছিল মুখ, গলার দুইপাশে আঙুলের মতন ফুলে উঠেছিল রগ, আর চোখ বেরিয়ে আসতে চাইছিল ঠিকরে। তবু টলমল পায়ে সেই বোঝা বয়ে নিচ্ছিল আদিলউদ্দিন।
তখন শীতকালের খাড়া দুপুর। রোদ ছিল তেজালোলা। অতিরিক্ত ভার মাথায় ছিল বলে বয়সি শরীর ফুটা করে আদিলউদ্দিনের বেরুচ্ছিল নুনঘাম। জায়গা মতো মাটি ফেলার। সঙ্গে সঙ্গে খাইগোবাড়ির মসজিদ থেকে ভেসে এসেছিল জোহরের আজান। মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের ললিত গলার আজান শুনেই খানিক আগে মাথায় চেপে থাকা অতিরিক্ত ওজনের কষ্ট ভুলে গিয়েছিল আদিলউদ্দিন। মোড়া পথের পাশে রেখে মতলেব মুদির বাড়ির দক্ষিণের পুকুরে নেমেছিল অজু করতে।
রাস্তার ধারের হিজলগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণচোখে আদিলউদ্দিনকে দেখছিল আলী আমজাদ। শুরু থেকেই বুঝতে পারছিল কী উদ্দেশ্যে পুকুরের দিকে যাচ্ছে সে। তখনও কিছু বলেনি। অজু সেরে মাজার গামছা মাথায় দিয়ে পশ্চিম দিককার নামার মাঠে মাত্র। নামাজে দাঁড়াবে আদিলউদ্দিন, পিছন থেকে এসে ঘেঁটি চেপে ধরল আলী আমজাদ। কী রে চুতমারানির পো, কামের টাইমে চুদুর বুদুর?
মুখ ফিরিয়ে ভয়ার্ত চোখে আলী আমজাদের দিকে তাকিয়েছে আদিলউদ্দিন। নমজের সময় অইছে বাজান, নমজ পড়তে খাড়ইছি।
গর্জে উঠেছে আলী আমজাদ। এইডা তর নমজ না, এইডা তর ইতরামি!
কন কী বাজান? কীয়ের ইতরামি?
ওই যে তর গোড়ায় বেশি মাডি দেওয়া অইছে, একবার ওই বোজা টাইন্নাঐ আরামের আশায় ইতরামি কইরা নমজের ভং ধরছস।
না বাজান না। আমি অমুন মানুষ না। আল্লার কাম লইয়া ইতরামি করুম না। যুদি করি আল্লার এই মাড়িতে আমার কব্বর অইবো না। আপনে আমার কথা বিশ্বাস করেন, আমি কোনও ভং করি নাই।
তবু আদিলউদ্দিনকে একটা ধাক্কা দিয়েছিল আলী আমজাদ। আইজ তরে আমি ছাইড়া দিলাম। আর কোনওদিন যুদি দেহি আমার কাম হালাইয়া তুই কোনও চুদুর বুদুর করতাছস তাইলে তরে আমি খাইছি।
তারপর থেকে আলী আমজাদ ধারেকাছে থাকলে সময় মতো নামাজ পড়া হয় না আদিলউদ্দিনের। ফজরের নামাজ সে মরনির বাড়িতে পড়ে বেরোয়। জোহর আছর কোনও কোনওদিন মাগরিবের নামাজ পর্যন্ত কাজা পড়তে হয়। যেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার পরও মাটি কাটা শেষ করতে চায় না আলী আমজাদ, হ্যাঁজাক জ্বালিয়ে কাজ চালিয়ে যায়, সেদিন মাগরিবের নামাজও সময় মতো পড়া হয় না আদিলউদ্দিনের।
