প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে কে যেন কাকে হাকিকি করে কী বলল চারদিক গভীর নির্জন বলে, ঘরে মরনি ছাড়া অন্য কেউ আছে কি না আন্দাজ করবার জন্য কান খাড়া করে রাখার ফলে হাকিহুকিটা পরিষ্কারই শুনতে পেল হামিদা। শুনে তীব্র উত্তেজনায় বুক ফেটে গেল। তার। দবিরের একটা হাত ধরল সে। আছে, এই ঘরেঐ আছে আমার মাইয়া।
দবিরও শব্দটা খেয়াল করেছে। সেও সমান উত্তেজিত। নিচু গলায় বলল, কেমতে বুজলা?
অর গলা হুনছি আমি। হাকিকি কইরা মরনি বুজিরে কইল, আমার বাপে আইছে।
তখনই সাড়া দিল মরনি। কেডা? গাছি নি?
হ বুজি।
খাড়ও দুয়ার খোলতাছি।
কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তবু এই সময়টুকুর অপেক্ষা যেন সহ্য হয় না দুইজন মানুষের। মনে হয় অনন্তকাল ধরে যেন তারা এক বন্ধঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যে ঘরের ভিতর বন্দি হয়ে আছে তাদের সাত রাজার ধন এক মানিক।
দরজা খোলার আগে ঘরের কোণ থেকে হারিকেন হাতে নিয়েছে মরনি, নিবুনিবু আলো খানিকটা উসকে দিয়েছে। এখন দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে হারিকেন থেকে তেড়েফুড়ে আসা আলো ঘরের ছেমা পুরাটা আলোকিত করে ফেলেছে। সেই আলোয় দবির-হামিদার উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পেল মরনি। দেখে বুকটা হু হু করে উঠল তার। আহা রে মেয়ের চিন্তায় মরতে বসেছে দুটি মানুষ!
দবির-হামিদা কিছু বলবার আগেই মরনি বলল, তোমরা এত রাইত কইরা আইলা ক্যা? আমি তো মনে করছি দোফর নাইলে বিয়ালে আইবা! হারাদিন খালি তোমগো পথ চাইলাম, তোমরা আইলা না। আইলা রাইত দুইফরে! আহো, ঘরে আহো।
দবির দিশাহারা গলায় বলল, নূরজাহান আছে আপনের কাছে?
শুনে মরনি কিছু বলল না, মুখ ঝামটাল হামিদা। বুজির কথা হোননের পরও তুমি তারে জিগাইতাছো? সরো।
দবিরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে, উঁচু ভিটিতে ছানাপোনা চরতে দেওয়া মুরগি আকাশে আততায়ী চিল দেখে যেমন করে লাফিয়ে উঠে ডানার আড়ালে লুকাতে চায় ছানাদের ঠিক সেই ভঙ্গিতে লাফ দিয়ে মজনুদের পাটাতন ঘরে উঠে গেল হামিদা, চৌকির কাছটায় ছুটে গেল।
মা-বাবার সাড়া পেয়েই মুমূর্ষ ভঙ্গিতে বিছানায় উঠে বসেছিল নূরজাহান। মাজা তরি দলামোচড়া করা কাঁথা। এইসব কাঁথা কাপড়ের মধ্যে যেন ঝাঁপ দিয়ে পড়ল হামিদা। দুইহাতে পাগলিনির মতো জড়িয়ে ধরল নূরজাহানকে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, এইডা তুই কী করছস মা? এইডা তুই ক্যান করছস! নিজে তো মরলিঐ আমাগোও মাইরা হালাইলি!
দবিরও ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে মা-মেয়ের সামনে। তারও চোখ ভেসে যাচ্ছে কান্নায়। কোনওরকমে মা-মেয়ের পাশে বসে সেও এক হাতে জড়িয়ে ধরেছে নূরজাহানকে। নূরজাহান কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বড় রকমের অন্যায় করে ফেলা শিশুর মতো আধো আধো গলায় বলছে, আমি বুজি নাই মা। আমি কিছু বুজি নাই। কাশেম কাকারে দেইক্কা আমার জানি কেমুন লাগলো। এর লেইগাঐ, এর লেইগাঐ ছ্যাপ আমি ছিডাইছি। হুজুরের মোকে গিয়া যে লাগবো আমি বোজতে পারি নাই মা।
নূরজাহানের কথা শুনে হামিদা কোনও কথা বলল না, কাঁদতেই লাগল। কথা বলল দবির। হাউমাউ করা কান্নার গলায় বলল, এমুন বিপদ ক্যান ঘটাইলি তুই? আল্লায় ক্যান তরে দিয়া এই কামডা করাইলো? কী অন্যায় আমরা করছি তার কাছে? কী অন্যায় তুই করছস তার কাছে?
তিনজন মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে ঘরের ভিতরকার শীতরাত্রি। অদূরে এই ফাঁকে দরজার খিল তুলে সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মরনি, হাতে এখনও ধরা হারিকেন। তিনজন মানুষের গভীর কষ্ট আর অসহায়ত্বের কান্না দেখে বুক ফেটে যেতে চাইছে তার। মানুষের দুঃখকষ্ট কান্নাকাটি একদমই সহ্য করতে পারে না সে। যে কারও। দুঃখকে তার মনে হয় নিজের দুঃখ, কষ্টকে মনে হয় নিজের কষ্ট। অন্যের কান্নাকাটিতে তারও চোখ ভেসে যায়, অন্যের কান্নায় মরনি নিজেও কাঁদে। এখনও সেই কান্নায় বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল সে। ইচ্ছে করছিল সেও গিয়ে দাঁড়ায় তার চৌকিতে বসা তিনজন অসহায় মানুষের পাশে। নিজের চোখ মুছে সান্ত্বনা দেয় তাদেরকে। দবির হামিদাকে বলে, কাইন্দো না, কাইন্দো না তোমরা। মাইয়ার মিহি চাও, মাইয়ারে বাঁচানের চেষ্টা করো। না বুইজ্জা কামডা ও করছে ঠিকঐ, তারবাদে তো মরতে বইছে। জ্বর আইয়া পড়ছে মাইয়ার। কাইপ্পা কাইপ্পা জ্বর আইছে। অহন যাও, তাড়াতাড়ি বাইত লইয়া যাও মাইয়ারে। ভাতপানি খাওয়াইয়া আগে এই দশা থিকা বাঁচাও। তারবাদে কপালে যা আছে তাঐ অইবো। আল্লায় যুদি বাঁচায় তাইলে অরে আর মারবো কে?
কিন্তু এসব কথার একটিও বলা হয় না মরনির। হারিকেন হাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদে সে। ওদিকে মানুষের এই কান্নাকাটি আর হারিকেনের উসকে ওঠা আলো দেখে পলোর ভিতর উঠে দাঁড়িয়েছে চিলের মুখ থেকে আঙিনায় এসে পড়া সেই মুরগি ছানাটি। গলা টানা দিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চাইছে। কুন কুন করে দুই-তিনবার শব্দও করল।
.
আদিলউদ্দিন বাড়ি ফিরে রাত অনেকটা হয়ে যাওয়ার পর।
মরনি তখন গভীর ঘুমে। বাড়ি নিঃসাড়, নিস্তব্ধ। চারদিকে শুধুই ঝিঁঝিপোকা ডাকে, কীট পতঙ্গ ডাকে। কখনও কখনও মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় রাতচরা বাদুড়। রহমান হালদারের সীমানায় আছে শেয়াল রঙা একখান কুকুর। খুবই নিরীহ স্বভাবের নির্জীব ধরনের কুকুর। মরদা কিন্তু বয়স হয়ে যাওয়ার ফলে যৌবনকালের তেজটা আর নাই। গা ভরতি ঘা, খানে খানে লোম উঠে চোয়া হয়ে গেছে। পিঠের উপর শিড়দাঁড়ার হাড় পরিষ্কার ফুটে আছে। তবু কুকুর। প্রভুভক্ত জীব। রাতেরবেলা তিন শরিকের যে কারও সীমানায় মানুষের পায়ের শব্দ পেলে ধুলামাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা কুকুরটা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। সামর্থ্য অনুযায়ী ছুটে এসে দেখে কে এল।
