হামিদা বলল, বোজলাম তোমার কথা। তয় মরনি বুজির বাইত্তে গিয়া যুদি মাইয়া না পাও?
পামুঐ। ওই বাইত্তেঐ আছে মাইয়া। মরনি বুজির লাহান আদর গেরামের অন্য কেঐ তোমার মাইয়ারে করে না। জান দিয়া অইলেও তোমার মাইয়ারে হেয় বাঁচাইবো। এইডা জানে দেইক্কাঐ তোমার মাইয়ায় ওই বাইত্তে গেছে।
এইডা তোমার অহন মনে অইতাছে ক্যা? আগে মনে অই নাই ক্যা? তাইলে মওলানা সাবের বাইত্তে, মোবাইত্তে আমগো যাওনঐ লাগতো না। সোজা মরনি বুজিগো বাইত্তে গিয়া মাইয়াডারে লইয়াইতাম।
মেয়ের জন্য হামিদার এই টান আজ বিকাল থেকেই টের পাচ্ছে দবির। পেয়ে মনটা কীরকম এক ভাল লাগায় ভরে যাচ্ছে! ইচ্ছা করছে দু’হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে হামিদার মাথা। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলে, আমার মাইয়াডারে তুমি এত আদর কর এইডা আমি জানতাম নাগো। আমি তোমার উপরে খুব খুশি, খুব খুশি।
কিন্তু বুকে হামিদার মাথাটা জড়িয়ে ধরল না দবির, চৌধুরীবাড়ির পশ্চিমের সীমানা ছাড়িয়ে নামার দিকে নামতে নামতে, একপাশে রঙ্গু দারোগার বাড়ি, আরেক পাশে ইন্নতদের বাড়ি, মাঝখানকার উঁচু রাস্তার ঘুটঘুটা অন্ধকারে পিছনে দিকে হাত বাড়িয়ে হামিদাকে টেনে আনল কাছে, তার একটা হাত ধরল। আমারে একখান কথা দেও তুমি?
স্বামীর আচরণে হামিদা থতমত খেয়েছে। প্রথমে মনে হয়েছে দিনের আলোয় যেন এরকম খোলামেলা জায়গায় দবির তার হাত ধরেছে, হোক সে তার স্বামী, স্বামী হয়েছে বলেই কি রাস্তাঘাটে হাত ধরতে পারে! লজ্জাশরম নাই মানুষের! ঝটকা মেরে হাত ছাড়াতে চেয়েছে হামিদা, মুখে প্রায় এসে গিয়েছিল, করো কী তুমি? মাইনষে দেকলে কী কইব? তারপরই মনে হয়েছে, এখন রাত, অন্ধকার চারদিক, কেউ তাদেরকে দেখছে না।
তবু হাত ছাড়িয়ে নিল হামিদা। বলল, কও দিহি হুনি, কী কথা?
করুণ অনুনয়ের গলায় দবির বলল, মাইয়াডারে তুমি কিছু কইবা না! মারবা ধরবা না। অরে!
একথা শুনে হামিদার গলা রুক্ষ হল। এই হগল আল্লাইদ্যা প্যাচাইল অহন পাইরো না। তাড়াতাড়ি আডো, ম্যালা রাইত অইছে। ওই বাইত্তে মাইয়া না পাইলে চিন্তায় মইরা যামু আমি।
দবির আর কোনও কথা বলল না। দ্রুত হেঁটে দুইজন মানুষ তারপর মজনুদের সীমানায় উঠল। পাটাতন ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াল।
রাত বলতে গেলে এখনও তেমন হয়ইনি। তবু শীতের রাত বলে সন্ধ্যারাতই গভীর রাত। গ্রাম গিরস্তের বাড়িঘর নিঝুম হয়ে গেছে। মজনুদের দিকটা যেন নিঝুম হয়েছে একটু বেশি। অবশ্য দিনেরবেলাও এদিকটা নিঝুমই থাকে। বোনপো মজনুকে নিয়ে দুইজন মানুষের সংসার মরনির বহুদিনের। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে মজনুকে নিয়েই আছে। এই মজনুও এখন নাই। কয়েক মাস হল খালাকে ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে খলিফাগিরি শিখছে। বাড়িতে এখন মরনি একা। কথা বলার মানুষটা পর্যন্ত নাই। সুতরাং নিঝুম তো এদিকটা হবেই!
দিনেরবেলা তবু শব্দ কিছু থাকে। মরনির সংসারকর্ম, গাছগাছালিতে পাখপাখালির ডাক, উঠান পালানে চরে বেড়ানো মোরগ মুরগির কোনও কোনওটির হঠাৎ হঠাৎ ডেকে ওঠা এসব তো আছেই, তার উপর আছে উত্তরের শরিক ভাসান গাছির পোলাপান বউঝিদের হাঁকডাক, কাইজ্জাকিত্তন, হাসি কান্না ছুটাছুটি। গোয়াল থেকে আচমকা হাম্বা দিয়ে নির্জনতা ভাঙে কোনও কোনও গাই গোরু। ভাসান গাছির বড়পোলা হিরু বাড়িতে থাকলে দুপুরের পর কখনও কখনও আড়বাঁশিতে একটুখানি বিচ্ছেদের সুর তোলে। সব মিলে নির্জনতা তখন কমই।
ওদিকে উত্তর-পশ্চিমের শরিক রহমান হালদার সারাদিন ব্যস্ত খেতখোলা আর গাই গোরু চরানোর কাজে। সংসার আগলাচ্ছে বউ আর বুড়িমা। পোলাপান অনেক রহমানের, বউটা চুপচাপ ধরনের, পোলাপানরা পাত্তা দেয় না মা’কে। তাদেরকে সামলায় রহমান হালদারের মা। বুড়ি খুবই দাপুটে ও দজ্জাল ধরনের। যখন তখন কিলচড় লাগাচ্ছে নাতি নাতকুড়দের, বকাবাজি করে শাসন করছে। চিলের মতো তীক্ষ্ণ গলা তার, অবিরাম সেই গলায় চিৎকার করে যাচ্ছে। মজনুদের সীমানা থেকে সারাক্ষণই শুনা যাচ্ছে তার চিল্লাবিল্লি শব্দ।
কিন্তু সন্ধ্যা হলেই সব শুনশান, সব নিঝুম। কোথাও কোনও শব্দ নাই, শুধু ঝিঁঝিপোকার ডাক।
মজনুদের দিকটায় ঝিঁঝিপোকা যেন আজ একটু বেশি ডাকছে। বেশি ডেকে নিঝুম ভাবটা যেন বেশি গাঢ় করে ফেলছে। এই গাঢ় নিঝুমতায় দুইজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে। মজনুদের পাটাতন ঘরের সামনে। দবির-হামিদা। বুক জুড়ে দুইজনেরই অদ্ভুত এক আশা ও শঙ্কা। নূরজাহান কি এই ঘরে আছে! যদি থাকে তা হলে তো ভালই, যদি না থাকে তা হলে এই শীতের রাতে গ্রামের কোথায়, কোন বাড়িতে তাকে আবার খুঁজতে যাবে দিশাহারা মা-বাবা! কোথায় পাবে তারে!
ঘরের ভিতর নিবুনিবু করে বুঝি হারিকেন জ্বালিয়ে রেখেছে মরনি। পাটাতন ঘরের ফাঁক ফোকর দিয়ে সেই আলোর অতি ক্ষীণ একটা রেখা এসে পড়েছে গাঢ় অন্ধকারে। এই আলোর রেখাটুকুর দিকে তাকিয়ে হামিদা বলল, কী অইলো, খাড়ই রইলা ক্যা? ডাক দেও মরনি বুজিরে। দেহ ঘরে মাইয়া আছেনি।
এই ঘরের সামনে এসে একটু আনমনা হয়েছিল দবির। কী করবে না করবে বুঝতে পারছিল না। হামিদার কথায় বুঝতে পারল। টিনের বেড়ায় শব্দ করে দুই-তিনটা থাবড় মারল। বুজি, ও বুজি, ঘুমাইছেননি? বুজি।
