পালঙ্কের পায়ের কাছটায় বাদলা তখন তার কথা বিছাচ্ছে। কাঁথা বিছিয়ে বালিশ রাখল জায়গা মতো তারপর শুয়ে পড়েই বিছানো কাঁথার অর্ধেকখানেক তুলে এমন করে গায়ে দিল, অপঘাতে মরা বেওয়ারিস লাশ যেমন করে পাটি হোগলায় প্যাচিয়ে নদীতে ফেলা হয়, বাদলাকে দেখাচ্ছে ঠিক তেমন। প্যাচানো কিশোর লাশ। শরীর কাঁথার ভিতর, শুধু মুখটা বেরিয়ে আছে। সেই মুখ বাদলা ঘুরিয়ে রেখেছে দেলোয়ারার দিকে। দাঁত বের করে হাসছে। দেলোয়ারা তার দিকে তাকাতেই বলল, আইজ থিকা আমি এহেনে হুমু।
অনেকক্ষণ পর এই প্রথম কথা বললেন দেলোয়ারা। ক্যা? মায় কইছে আমি ডাঙ্গর অইয়া গেছি। ডাঙ্গর পোলাপান মা-বাপের লগে হোয় না। কয়দিন বাদে বলে আমার মোসলমানিও করাইয়া দিবো।
দেলোয়ারা কথা বললেন না। তবু বাদলা খানিক অপেক্ষা করল দেলোয়ারা বুজি কিছু বলেন কি না, বলছেন না দেখে বলল, আপনে এমনে বইয়া রইলেন ক্যা বুজি? ওডেন, ভাতপানি খান, হুইতে যান। রাইত দুইফর অইয়া গেল!
হ উডি। বলে ভারী ধরনের শরীর থেকে পা দুইখান প্রথমে নামালেন দেলোয়ারা। যেখানে বসে আছেন পালঙ্কের তলায় সেই বরাবর স্পঞ্জের স্যান্ডেল জোড়া। দুইপায়ে স্যান্ডেল পরে উঠে দাঁড়ালেন। রাবিকে ডাকলেন। ওই রাবি, খোপে আয়। ভাত দে।
খাওয়াদাওয়া সেরে মতলা তখন জায়গা মতো শুয়ে পড়েছে আর রাবি হাঁড়ি পাতিল থাল বাসন প্রায় গুছিয়ে এনেছে। দেলোয়ারার ডাক শুনে বলল, হারিকল লইয়া আপনে খোপে যান বুজি, আমি আইতাছি।
দেলোয়ারা নরম ভঙ্গিতে হারিকেনের হ্যাঁন্ডেলটা ধরলেন।
.
মেন্দাবাড়ি থেকে বেরিয়ে মিয়াবাড়ির উপর দিয়ে ঠাকুরবাড়িতে উঠেছিল দবির-হামিদা। একপাশে গুহের বাড়ি। রাস্তার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে আশপাশের ছাড়াবাড়িগুলি আর। ছাড়াবাড়ি নাই, মাটিয়ালরা দখল করে নিয়েছে। নৌকার ছইয়ের মতো বাঁশ হোগলার ছই তুলে তার তলায় রাত কাটায় চারপাশের সব ছাড়াবাড়িতে। গুহের বাড়ি, ঠাকুর চৌধুরী। বাড়ি, সব বাড়িরই একই অবস্থা। সকাল থেকে সন্ধ্যা তরি কাজ করে যে যার গোড়া হাতে ফিরে আসে আস্তানায়, তারপর কুপিবাতি জ্বেলে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয় কেউ কেউ, কেউ কেউ আয়েশি কায়দায় বসে তামাক বিড়ি টানে, কেউ কেউ গল্পগুজব হাসিঠাট্টা করে। রাত দুপুর তরি রমরমা থাকে বাড়িগুলি, লোকজনের সাড়া শব্দ আর কুপিবাতির আলোয় মুখর থাকে। সুতরাং এদিককার পথ ধরতে অসুবিধা হয়নি দবির-হামিদার।
আগিলা দিন হলে সন্ধ্যার পর এই পথ মরে গেলেও ধরত না মেদিনীমণ্ডলের কোনও লোক। ওই যে যে বছর ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধ হল সেইবছর বর্ষাকালে মনীন্দ্র ঠাকুর আর ধীরেন্দ্র চৌধুরী খুন হওয়ার পর বাড়িটা গেল ছাড়াবাড়ি হয়ে, অন্ধকার হয়ে। এমনিতেই গাছপালার অভাব ছিল না বাড়িতে, ছাড়াবাড়ি হওয়ার পর গেল জংলা হয়ে। ঝোঁপজঙ্গল গাছপালায় এমন অবস্থা হল, দিন দুপুরেও একা এবাড়ির দিকে পা ফেলত না লোকে। অনেকগুলি দিন কেটেছে এইভাবে। স্বাধীনতার পরও বেশ কতগুলি বছর ছাড়াই পড়ে ছিল বাড়িগুলি। তার আগ থেকেই জলিল ভেন্ডার চেষ্টা তদবির করে বাড়িগুলি লিজ নেওয়ার চেষ্টা করছিল, মাওয়ার ওদিককার নিজামউদ্দিন সাহেবও চাইছিলেন লিজ নিতে, এখনও বোধহয় মামলা মোকদ্দমা চলছে বাড়ি নিয়ে, দবির পুরাপুরি জানে না এইসব মামলা মোকদ্দমার কথা, তবে রাস্তার কাজ শুরু হওয়ার পর ছাড়াবাড়িগুলি যে বসত বাড়ির চেহারা নিয়েছে এতে সে খুব খুশি। এই যে এখন রাতেরবেলা ঠাকুরবাড়ির উপর দিয়ে মেয়ে বিচড়াতে যাচ্ছে, লোক বসতি না হলে কি এটা সম্ভব হত!
কিন্তু যাচ্ছে কোন বাড়িতে দবির?
ঠাকুরবাড়িতে উঠে ঠিক এই প্রশ্নটাই তাকে করল হামিদা। কোনমিহি মেলা দিলা?
পা চালিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দবির বলল, তুমি বোজো নাই?
হ বুজছি। মনেঅয় মরনি বুজির বাইত্তে যাইতাছো।
ঠিক কইছো। আমার মনেঅয় মাইয়া তোমার ঐ বাইত্তেঐ আছে।
আমারও মনেঅয়। মরনি বুজি ছাড়া হারাদিন অরে হামলাইয়া থোওনের আর কোনও মানুষ নাই এই গেরামে।
ক্যা? তোমার মাইয়ার লগে তো গেরামের বেবাক মাইনষেরঐ খাতির, বেবাক বাইত্তেঐত্তো যায়! মরনি বুজি ছাড়া অরে কেঐ জাগা দিবো না ক্যা?
হেইডা আমি কইতে পারুম না। তয় আমার মনে অইলো।
হামিদার সঙ্গে কথা বলতে বলতে দবির টের পেল দেলোয়ারা বুজির সঙ্গে কথা বলে আসার পর থেকে নূরজাহানকে নিয়ে উৎকণ্ঠা কমে আসছে। মনে হচ্ছে নিশ্চয় দেলোয়ারা বুজি মাওলানা সাহেবকে বলবেন, দরকার হলে এনামুলকে দিয়ে বলাবেন, আর তাঁদের কথা ফেলবার ক্ষমতা নিশ্চয় মওলানা সাহেবের নাই। ক্ষমতা থাকলেও এখন তিনি তাদের কথা ফেলবেন না নিজের স্বার্থে। এনামুল সাহেব মসজিদ করবেন, সেই মসজিদের ইমাম হবেন তিনি। এসব ভেবে বুকে এখন অনেক বল পাচ্ছে দবির, ভরসা পাচ্ছে। ঠাকুরবাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে চৌধুরীবাড়ির দক্ষিণের পুকুর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, একখান কথা আইজ আমি বুজছি, এমনে দেকবা মাইনষের লগে অনেক মানুষ, সুখের দিনে, আমদের দিনে দেকবা মাইনষের আকাল নাই, বিপদ আপদের দিনে দেকবা, হায় হায়। তোমার লগে দিহি কেঐ নাইকা। শয়ে শয়ে মাইনষের দুই-একজন কোনওমতে আছে তোমার লগে। ওই টাইমে যারা থাকলে তারা অইলো তোমার আসল দরদী। আউজকা আমগো এই বিপদে দরদী খালি দেলরা বুজি, দরদী খালি মরনি বুজি।
