এই অবস্থায় এনামুল করেছিল একটা অদ্ভুত কাজ। বাড়িতে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে নতুন পুকুর থেকে উঠে এসেছে। পরনে ভিজা ইংলিশপ্যান্ট। ঘরে এত লোকজন দেখে খালি গায়ে তার বোধহয় লজ্জা হয়েছিল। শরীর মোছার কথা ভুলে, ভেজা প্যান্ট বদলাবার কথা ভুলে শুকনা একটা হাওয়াই শার্ট পরে নিয়েছে। তাড়াহুড়ায় বোম লাগাতে ভুলে গেছে। ততক্ষণে ঘটনাটাও পুরা সে জেনেছে। ঘরভরতি মানুষজন তখন এইসব আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত, অজ্ঞানের ভান করে মজিদ পড়ে আছেন চৌকিতে, তাঁর দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। এনামুল করল কী, টেবিলের উপর থেকে ঘুড়ির একটা কামিনী নিল, নিয়ে কেউ যেন না দেখতে পায় এমন ভঙ্গিতে সেই কামিনী দিয়ে মজিদকে একটা বাড়ি দিল। এনামুলের কচিমুখে তখন অদ্ভুত এক রাগ ক্রোধ খেলা করছে। ওই একই কায়দায় বেশ কয়েকটা বাড়ি সে মজিদকে দিয়েছিল। অদূরে দাঁড়িয়ে পাঁচ-ছয় বছরের মিলু এই দৃশ্য দেখে ফিক ফিক করে হাসছিল।
দবির-হামিদার মুখ থেকে নূরজাহানের কথা শুনে আজ অনেকদিন পর বহুকাল পিছনে ফেলে আসা সেই দিনটির কথা মনে পড়ল দেলোয়ারার। সেই মর্মান্তিক দুপুরবেলাটির কথা মনে পড়ল। তার বুকে ভয়ে চিৎকার করছে মাফিন আর মাফিনকে চেপে ধরে রাখা বুকের অনেক ভিতরে দেলোয়ারা টের পাচ্ছিলেন মৃদু একটা ভয়ের কাঁপন। ঘোরতর বর্ষার দিনে তেলাকুচ পাতার উপর যখন টপটপ করে ঝরে আকাশভাঙা বৃষ্টি, সেই বৃষ্টির তোড়ে যেমন করে কাঁপে তেলাকুচের অসহায় পাতা, দেলোয়ারার বুকের কাঁপন ছিল তেমন। যে পিতা জন্ম দিয়েছেন মেয়ে, বার্মিজ সুন্দরী মেয়েদের মতো যার নাম রেখেছেন মাফিন, সেই পিতাই সামান্য টাকাপয়সার কারণে গলা টিপে ধরেন ওইটুকু অবুঝ মেয়ের! মেরে ফেলতে চান তাকে!
দেলোয়ারা সেদিন কাঁদতেও পারেননি। সেই দুপুরে তিনি আর নরম নিরীহ চুপচাপ ভাবুক ধরনের দেলোয়ারা নন। সেই দুপুরে স্বামীকে সন্তানের মৃত্যুদূত হিসাবে দেখে, ডিম ঘিরে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা কালজাত যেমন ধারেকাছে শত্রুর সাড়া পেলে কচুপাতার মতো ফণা তুলে হিসহিস করে, যেন ধারেকাছে যাকে পাবে তাকেই ছোবল দিবে, তেমন ফণা তোলা এক কালজাত যেন সেদিন দেলোয়ারা। মা কালজাতের ডিম আগলাবার মতো করেই মাফিনকে সেদিন আগলে ছিলেন তিনি।
নূরজাহানের কথা শুনে আজ সেই সময়ের অনুভূতি যেন ফিরে এল দেলোয়ারার। যেন নূরজাহান তাঁর সেই সেদিনের ছোট্ট মাফিন, মেয়েটিকে যেন মজিদের মতো করে গলা টিপে ধরেছেন মান্নান মাওলানা। তার দশ আঙুলের চাপ থেকে যেমন করে হোক নূরজাহানকে তার বাঁচাতে হবে।
তবে সেদিনের মতো তেজালো ভাব এইসব ভাবনার পরও নিজের ভিতর জেগে উঠতে দেখলেন না দেলোয়ারা। অনুভূতিটা কীরকম যেন মনের ভিতর, স্মৃতিসত্তার ভিতর উঠেই মিলিয়ে গেল। সেদিনকার মতো ফুঁসে উঠতে পারলেন না তিনি। আসলে নিজের সন্তান। আর অন্যের সন্তানের মধ্যে দুস্তর এক ব্যবধান সৃষ্টিকর্তার বিধানেই তৈরি হয়েছে। ইচ্ছা করলেও মানুষ সেই বিধান ভাঙতে পারে না।
তবু দবির-হামিদাকে আশ্বস্ত করলেন দেলোয়ারা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এত ঘাবড়াইছ না তরা। রাখে আল্লায় মারে কে! আল্লায় যুদি তগো মাইয়ারে বাঁচায় তাইলে দুইন্নাইর কেঐ অরে মারতে পারবো না। আমি মাওলানা সাবরে কমুনে। অহন যা মাইয়া বিচড়া গা (গিয়া)।
দবির-হামিদা বেরিয়ে যাওয়ার পরও একই ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ বসে রইলেন দেলোয়ারা। পালঙ্কে ঢেলান দিয়ে হারিকেনের আলোর দিকে তাকিয়ে আছেন তো তাকিয়েই আছেন। যেন ওইটুকু আলো তাঁর চোখের অনেক ভিতরে ঢুকে দীর্ঘকাল পেছনে ফেলে আসা এক জীবনের প্রায় সবখানি আলোকিত করে ফেলেছে। সেই জীবনটাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন তিনি, সেই জীবন থেকে আজকের জীবনে যেন ফিরতেই পারছেন না।
খাটালের দক্ষিণের জানালাটা খোলা, দরজাটা খোলা। বাইরের ঘুটঘুটা অন্ধকারে নিশ্চিন্তে ডাকছে ঝিঁঝিপোকা। মাঘ মাসের যে শীতে বাঘও কাবু হয়, কথায় বলে মাঘের শীত বাঘের গায়’– সেই মধ্য মাঘের শীত খোলা দরজা জানালা দিয়ে ইচ্ছামতো ঢুকছে, ঘর আর বাইরের মধ্যে এখন কোনও ব্যবধান নাই, তবু শীত যেন টের পাচ্ছেন না। দেলোয়ারা।
এই অবস্থা থেকে তাকে ফিরিয়ে আনল বাদলা। খাওয়াদাওয়া শেষ করে একখান তেল চিটচিটা ল্যাডল্যাড়া বালিশ আর একেবারেই পুরনা, তালির পর তালি পড়তে পড়তে ওজনদার হয়ে গেছে এমন একখান কথা কোনওরকমে বয়ে এনে পালঙ্কের পায়ের দিকটায় ফেলল বাদলা। অবাক হল। হায় হায়, বুজি দিহি অহনও বইয়া রইছে!
খোলা দরজা জানালা চোখে পড়ল বাদলার। গায়ে পুরনা মোটা গেঞ্জি আছে বাদলার, তবু খোলা দরজা জানালা দেখে যেন অযথাই তীব্র শীত টের পেল সে। হাত ভাঁজ করে বুকের কাছে ধরে, যেন শীতে মরে যাচ্ছে এমন ভাব করে বলল, এর লেইগাঐত্তো কই এমুন কাল (শীত) লাগে ক্যা? জিনালা (জানালা) দুয়ার দুইডাইত্তো খোলা।
দেলোয়ারা কথা বললেন কি বললেন না তোয়াক্কা না করে প্রথমে দরজাটা বন্ধ করল সে, যত্ন করে ডাসা লাগাল তারপর লাফিয়ে পালঙ্কে উঠে ঢাকাস চকাস করে বন্ধ করল জানালা। জানালার খিল লাগাবার খুটুর খাটুর শব্দে যেন পিছনের জীবন থেকে ফিরে এলেন দেলোয়ারা। বড় করে একটা শ্বাস ফেললেন।
