এই বাড়িতে তখন পোলাপানের অভাব নাই। হাফেজের সংসারে ছানা সেন্টুর পরও মিন্টু মাখন শিলি জন্মেছে, সালতাবউদ্দিনের ঘরে আলমগীর, সন্ধ্যা, ইন্তাজউদ্দিনের ঘরে ভানুর পর জন্মেছে খোকন। আর আনোয়ারার ঘরে দুই বছর আগে যমজ ছেলেমেয়ে বাদল আর রওশন, তারপর আরেক মেয়ে খোদেজা। দেলোয়ারার ঘরে জন্মেছে মাফিন। মাফিনের তখন সাত-আট মাস বয়স।
দুপুর তরি এই করে এনামুলরা গেছে নতুন পুকুরে ডুবাডুবি করতে। ওই আরেক মজার কাজ পোলাপানের।
কিন্তু দুপুর ফুরাতে চলল এখনও ফিরছে না এনামুল। ছেলেকে তুলে আনতে বোনকে পাঠিয়েছেন আনোয়ারা। রান্নাবান্না শেষ হয়েছে, পোলাপানরা সব আগে খাবে, তারপর বড়রা। মাফিনকে বারান্দায় ঘুম পাড়িয়ে দেলোয়ারা গেছেন এনামুলকে ডাকতে। স্বামী মজিদকে দেখে গেছেন ছোটকাকার বাংলাঘরে গনি হামিদ ননীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। গিয়াসউদ্দিন সাহেব গেছেন হাবজাদাদার (হাফেজ দাদা) ঘরে। ভাবীছাব তামাক সেজে দিয়েছেন, গুড়ুক গুড়ুক করে তামাক টানছেন আর টুকটাক কথাবার্তা বলছেন। এই অবস্থায় ফকিরবাড়ির সামনের চোয়া খেতে বানাডুলি দেখে বুকটা কেঁপে উঠেছিল দেলোয়ারার। বাড়ি থেকে নামেননি তিনি, নতুন পুকুরের সামনেও যাননি, বারবাড়িতে দাঁড়িয়েই এনামুলকে ডেকেছিলেন। এনামুল, ওই এনামুল, তাড়াতাড়ি উট বাজান। বাইত্তে আয়। তর মায় ডাক পাড়তাছে। ওই এনামুল।
খালার ডাক শুনে একলাফে পারে উঠল এনামুল। আইতাছি আম্মা, অহনঐ আইতাছি। বলে আবার লাফ দিয়ে পড়ল পানিতে।
বানাডুলি দেখার পর থেকে মনটা চাপ ধরে আছে, তার উপর বছরখানেক ধরে মজিদের সঙ্গে তেমন বনিবনা নাই, কাল রাতেও কিছু খ্যাচর ম্যাচর হয়েছে। ততদিনে মজিদের চরিত্র দিনের আলোর মতো পরিষ্কার সবার কাছে। পড়ার কথা বলে মাসের পর মাস টাকা নিয়ে পড়েননি তিনি। দুই দুইবার বিএ পরীক্ষা দেননি। সব জেনে আম্বিয়া খাতুন তার টাকাপয়সা বন্ধ করে দিয়েছেন। তারপর থেকে শ্বশুরবাড়িতে বসে আছেন মজিদ। শাশুড়িকে পটাতে না পেরে কয়দিন ধরে বউর সঙ্গে ঘ্যানঘ্যান করছেন। এইডা আমার শেষ প্রমিজ। এইবার টেকা দিতে কও, পরীক্ষার ফিস জমা দেওনের ডেট পার হইয়া যাইতাছে। টেকা জমা দিয়া পরীক্ষা আমি দিয়াসি।
দেলোয়ারার এক কথা। না, মইরা গেলেও মা’রে আমি টেকার কথা কইতে পারুম না। মায় আরও আগেঐ টেকা বন্ধ কইরা দিত, আমার লেইগা পারে নাই। আমি কইয়া কইয়া টেকা লইয়া দিছি আপনেরে। আর পারুম না।
এই নিয়ে কথা কাটাকাটির ফাঁকে এক রাতে ঠাস করে দেলোয়ারার গালে থাবড়ও মেরেছিলেন মজিদ। নিঃশব্দে সেই থাবড় হজম করেছেন দেলোয়ারা। চুপচাপ কেঁদেছেন, কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছেন। আম্বিয়া খাতুন বা বাড়ির অন্য কাউকে বুঝতে দেননি কিছু।
সেই দুপুরে বারবাড়ি থেকে ফিরার পথে গনি হামিদদের বাংলাঘর থেকে দেলোয়ারার পিছু নিলেন মজিদ। বড়ঘরের বারান্দায় এসেই বললেন, শেষবারের লাহান তোমারে আমি কইতাছি, আম্মারে তুমি টেকা দিতে কও। এই বাইত্তে আমার আর এক সেকেন্ডও পরান টিকতাছে না। আমি ঢাকা যাইতে চাই, পরীক্ষা দিতে চাই।
স্বামীর মুখের দিকে তাকালেন না দেলোয়ারা। মাফিন শুয়ে আছে বারান্দার চৌকিতে, কাঁথার বিছানায়, পিঠে দুই-চারটা ঘামাচি হয়েছে ওই অত্তটুকু মেয়ের, আনমনে ঘুমন্ত মেয়ের পিঠের ঘামাচি মারতে লাগলেন।
খরচোখে দেলোয়ারার দিকে তাকিয়ে মজিদ বললেন, তুই যুদি আমার কথা না হোনচ তাইলে অহন অন্য একখান কাম করুম আমি।
দেলোয়ারা হতভম্ব। এতদিন কাইজ্জাকিত্তন হয়েছে কিন্তু কোনওদিন মজিদ তাকে তুইতুকারি করেননি। আজ তাও করছেন। কোন অধঃপথে গেছে লোকটা!
দেলোয়ারার মুখে কথা জুটল না। ঘুমন্ত মেয়ের পিঠে হাত রেখে ফ্যালফ্যাল করে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রাগে ক্রোধে মজিদের তখন চোখ ঠিকরে বেরুচ্ছে। কালোকোলো সুন্দর চেহারার মানুষটাকে অসুরের মতন দেখাচ্ছে। চাপা গলায় বললেন, একদিন থাবড় মারছি, আর তরে আমি কিছু কমু না। জেন্টেলম্যানদের পক্ষে ওয়াইফের গায়ে হাত উঠান ঠিক না। তয় তর মাইয়াডারে আমি অহন ফিনিশ কইরা ফালামু। গলায় টিবিদা মাইরা ফালামু।
মজিদের কথা বিশ্বাস করেননি দেলোয়ারা। ভেবেছেন তাঁকে ভয় দেখাবার জন্য এসব কথা বলছেন তিনি। বাপ হয়ে আপন মেয়েকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে কেউ!
তবে পলকেই দেলোয়ারার বিশ্বাস তছনছ হয়ে গেল। সত্যি সত্যি ঘুমন্ত মাফিনের গলা টিপে ধরতে গেলেন মজিদ। সঙ্গে সঙ্গে এতদিনকার নিরীহ নরম দেলোয়ারা একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। লাফিয়ে উঠে প্রচণ্ড এক ধাক্কা দিলেন মজিদকে। আচমকা এমন ধাক্কা ভাবতে পারেননি মজিদ, উলটে গিয়ে পড়লেন চৌকির একপাশে। আর ছো মেরে মাফিনকে কোলে তুলে দেলোয়ারা তখন প্রাণ ফাটানো চিৎকার করছেন। মাইরা হালাইলো, আমার মাইয়ারে মাইরা হালাইলো।
আচমকা এরকম চিৎকারে বাড়ির লোকজন যে যেখানে ছিল ছুটে এসেছিল। ঘুম ভেঙে ভয়ার্ত স্বরে চিৎকার শুরু করেছিল মাফিন। মজিদ তখন উঠে বসেছেন। কাঁদতে কাঁদতে দেলোয়ারা তখন ঘটনা বর্ণনা করছেন সবাইকে। শুনে সবাই হতভম্ব, শুধু ননী ছুটে গিয়ে প্রচণ্ড এক থাবড় মারল মজিদের গালে। সেই থাবড়ে এমন করে আবার চৌকিতে গড়িয়ে পড়লেন মজিদ, যেন অজ্ঞান হয়ে গেছেন।
