আনোয়ারা করেছেনও তাই। পোলাপান হওয়ার সময় হলেই চলে আসেন মেদিনীমণ্ডলে। স্বামী ঢাকায়। সপ্তাহে সপ্তাহে তিনিও আসেন বাড়িতে। স্ত্রীর জন্য না, পোলাপানের জন্য ভীষণ টান তাঁর। বেশিদিন ছেলেমেয়েদের না দেখে থাকতে পারেন না। আর খাওয়া দাওয়ারও অসুবিধা। আনোয়ারা না থাকলে তাকে খেতে হয় আজিজের ঘরে। আজিজ মেদিনীমণ্ডলেরই ছেলে। নিজেদের বাড়ি ছিল না। বুড়ি মা’কে নিয়ে থাকত আমিনুলদের বাড়িতে। বড় একটা ভাই ছিল, নাম পাইন্না। প্রথমে পাইন্না মরেছে তারপর মরেছে তার বাপ। অনেককাল আগে বড়ছেলে মরার পরও আজিজের মা’কে সবাই পাইন্নার মা বলে। ডাকে। মরেও বড়ছেলেটি জড়িয়ে ছিল তার মায়ের সঙ্গে। আজিজকে তেমন করে ঘেঁষতে দেয়নি মায়ের কাছে। তবে আজিজ আর তার মা গিয়াসউদ্দিন সাহেবের খুবই ভক্ত। তিনিই পৌরসভায় ভূঁইমালির চাকরিটা আজিজকে নিয়ে দিয়েছেন, জিন্দাবাহারের ওই বাড়িতে পাঁচ টাকা মাসিক ভাড়ায় একখান ছাপরা ঘরও নিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তার ব্যাপারে আজিজ আর তার বুড়ি মায়ের কৃতজ্ঞতার সীমা পরিসীমা নাই। আনোয়ারা না থাকলে আজিজের ঘরেই খেতে হয়। আজিজ এখনও বিয়ে করেনি, বুড়িমা রাধে খুব খারাপ। দুইবেলা ওই খাবার মুখে রোচে না গিয়াসউদ্দিন সাহেবের। এই কারণেও সপ্তাহে সপ্তাহে শ্বশুরবাড়ি চলে আসেন তিনি।
সেবারও বাড়িতেই ছিলেন। আনোয়ারার আবার পোলাপান হবে। গিয়াসউদ্দিন সাহেব এসেছেন স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে যেতে। অফিস থেকে তিনদিনের ছুটি নিয়ে এসেছেন। চারদিনের দিন পড়বে রোববার। সেদিন দুপুরের ভাত খেয়ে পায়ে হেঁটে রওনা দিবেন শ্রীনগর। সেখান থেকে কেরায়া নৌকোয় করে যাবেন আলমপুর। আলমপুর থেকে লঞ্চে চড়ে রাত আটটা-নয়টায় গিয়ে পৌঁছাবেন ঢাকায়। পরদিন সোমবার সকালে জিন্দাবাহার থেকে হেঁটে চলে যাবেন লক্ষ্মীবাজার, মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে।
এ সময় একদিন ঘটল সেই ঘটনা।
.
নিমের পাতায় পাতায় সেদিন চৈত্র দুপুরের উদাসী হাওয়া। মাঠে মাঠে উঠছিল চৈতালী ঘূর্ণি। ফসল তুলে নেওয়া শূন্য চকমাঠে হঠাত্র ধুলা আর খড়কুটা নিয়ে ঘুরতে থাকে পাগল হাওয়া। ঘুরতে ঘুরতে খড়কুটা আর ধুলা নিয়ে উঠে যায় শূন্যে। বিক্রমপুর অঞ্চলে এই ঘূর্ণিকে বলে ‘বানাডুলি’। বানাড়ুলিকে ভয়ও করে লোকে। কুসংস্কার আছে বানাডুলি আসলে কোনও হাওয়া না, বানাডুলি এক অশুভ শক্তির চলাফিরা। যেদিক দিয়ে বয়ে যাবে, বয়ে যাওয়ার সময় যদি কোনও মানুষ পড়ে এই শক্তির আওতায়, কোনও না কোনও ক্ষতি সেই মানুষের হবেই। এজন্য বানাডুলি দেখলেই গ্রামের মানুষজন দৌড়ে দূরে সরে যায়, বুকে থু থু করে ছিটায় থুতু। মানুষের থুতুর বদগন্ধে নাকি সেই অশুভ শক্তি কাছে ভিড়ে না, ক্ষতি করতে পারে না মানুষের।
সেই দুপুরে বারবাড়ির দিকে গিয়ে ফকির বাড়ির সামনের চোয়া জমিতে হঠাই একটা বানাডুলি উঠতে দেখেছিলেন দেলোয়ারা। গিয়েছিলেন এনামুলকে ডাকতে। বাড়ি আসার পর থেকে প্রতি দুপুরেই ছানা সেন্টু তালেব জাহাঙ্গিরের সঙ্গে নতুন পুকুরে ডুবাডুবি করতে যায় এনামুল। ঘণ্টা দু’-ঘণ্টা পানি থেকে ওঠার নাম নাই। বহু ডাকাডাকির পর যখন উঠে আসে, চোখ তখন কোড়াপাখির চোখ। একটু বেশি চঞ্চল হয়েছে ছেলেটা, বেশি দুরন্ত। বাড়ি এলে কী রেখে কী করবে দিশা পায় না। এবার এসেই তো মাওয়ার বাজার থেকে লাল সাদা হলুদ নীল কয়েক তা ঘুড়ির কাগজ কিনে এনেছে, কয়েক কাঠিম ঘুড়ির সুতা, মাঝারি সাইজের লাটাই। ঠাকুরবাড়ির বাঁশঝাড় থেকে কঞ্চি কেটে এনে ছানা সেন্টুর সঙ্গে দুইদিন ধরে ধারালো দা দিয়ে কঞ্চি চেঁছে চেঁছে ঘুড়ির কামিনী বানিয়ে বড়ঘরের বারান্দায় আগিলা দিনের গাবদা গোবদা যে টেবিলটা আছে সেই টেবিলের উপর রেখে দিয়েছে। আজ সকাল থেকে কাঁচের কতগুলি পুরনো শিশি বোতল বহুক্ষণ ধরে ভেঙে গুঁড়া করেছে, তারপর পাটায় সেই গুঁড়া ফেলে পুতা দিয়ে মশলা ফাঁকি করার মতো ফাঁকি করেছে। দুইদিন। ধরে একটা হাঁড়িতে হাজামবাড়ির গাবগাছ থেকে গাব পেড়ে এনে একেকটা গাব কয়েক টুকরা করে ভিজিয়ে রেখেছে। দুইদিন ভিজে গা থেকে সব আঠা ছেড়ে দিয়েছে গাব। গাবের আঠার সঙ্গে তারপর ঘুড়ির কাগজের সঙ্গে কিনে আনা এক পুরিয়া লাল পাউডার রং মিশিয়েছে, কাঁচের ফাঁকি মিশিয়েছে। তার আগে যে কয় কাঠিম সুতা কিনেছিল সেই সুতা একটা লাটাইতে পাচিয়েছে। ছানা সেন্টু দুই ভাইয়ের আছে বড় লাটাই। তিনজন মিলে এইসব জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে বাগানে। তারপর এনামুলের লাটাই থেকে সুতার মাথা বের করে গিঁট দিয়েছে ছানা সেন্টুর লাটাইয়ে। সেন্টুর হাতে তাদের লাটাই, এনামুলের হাতে এনামুলেরটা। বাগানের গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে চৈত্র মাসের রোদ এসে খা খা করছে এমন রোদে দুইজন চলে গেছে দুইদিকে। এনামুল পশ্চিমে কাউয়াঠুইট্টা (কাকটুটো) আমগাছটার কাছে আর সেন্টু পুবদিকে বউন্নাগাছের কাছে। মাঝখানে ছানা গাবের আঠার সঙ্গে রং আর কাঁচের গুড়ার মিশেল দেওয়া ভাণ্ড (পাত্র) হাতে। ভাণ্ড থেকে হাতের মুঠায় পদার্থটা তুলে, সেই মুঠা দিয়ে আলগা করে ধরেছে সুতা, বউম্লাগাছের গোড়া থেকে সেন্টু পটু হাতে তার লাটাইয়ে সুতা প্যাচাতে শুরু করেছে, এপাশ থেকে এনামুলের লাটাই ঘুরে ঘুরে সুতা ছাড়ছে, ওপাশে সেই সুতো গিয়ে প্যাচাচ্ছে সেন্টুর লাটাইতে, মাঝখানে গাবের আঠা রং আর কাঁচের গুঁড়ায় মাঞ্জা হচ্ছে সুতা। রোদে শুকোচ্ছেও একসঙ্গে। বাড়ির পোলাপান সবাই সুতার দুইপাশে দাঁড়িয়ে মাঞ্জা দেওয়া দেখছে। মাঞ্জা দেওয়া সুতা দিয়ে দুই-একদিনের মধ্যেই পুরানবাড়ির মাঠে কাটাকুট্টি খেলা শুরু হবে। আজ বিকাল থেকে ঘুড়ি বানানোর কাজও শুরু করবে এনামুলরা।
